২০২৬ সালকে ঘিরে উত্তর এশিয়ায় যখন অস্বাভাবিক অনিশ্চয়তা ঘনীভূত হচ্ছে, তখন এই অঞ্চলকে মোকাবিলা করতে হতে পারে তিনটি নির্দিষ্ট ঝুঁকির—ট্রাম্প, ট্রাম্প এবং ট্রাম্প। এই তিন ঝুঁকিই এমন নীতিগত প্রতিক্রিয়া দাবি করে, যা হতে হবে অত্যন্ত দক্ষ, দ্রুত ও সৃজনশীল।
চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্য মূল সমস্যা হলো—যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কোন রূপের মুখোমুখি তারা হবে, তা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। একদিকে আছেন লেনদেনকেন্দ্রিক ট্রাম্প, অন্যদিকে ঘরোয়া প্রবৃদ্ধিতে মনোযোগী ট্রাম্প, আবার কখনো সবকিছু ওলটপালট করে দেওয়ার মানসিকতার ট্রাম্প। বাস্তবতা হলো, বেইজিং, টোকিও ও সিউলের সামনে তিনি কোন দাঁত দেখাবেন, তা হয়তো ট্রাম্প নিজেও এখনো ঠিক জানেন না। এমনকি তিন দেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন কৌশল পালাক্রমে প্রয়োগ করলেও তা অস্বাভাবিক হবে না।
যদি ট্রাম্প ঘরোয়া অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে অতিমাত্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন, তাহলে তা এশিয়ার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে তার জনপ্রিয়তা যখন টালমাটাল এবং যুক্তরাষ্ট্রে বেকারত্বের হার চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ দশমিক ৬ শতাংশে পৌঁছেছে, তখন ট্রেড ওয়ার থ্রি পয়েন্ট জিরোর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এর একটি কারণ হতে পারে নিজের সমর্থক গোষ্ঠীর কাছে আবারও অর্থনৈতিক বয়ান দখলে আনার চেষ্টা—বাণিজ্যিক আগ্রাসনের মাধ্যমে এক ধরনের ধাক্কা সৃষ্টি করা। একই সঙ্গে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহল হয়তো বুঝতে শুরু করবে যে, চীনের নেতা শি জিনপিং সেই বহু কাঙ্ক্ষিত বড় সমঝোতা বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে তাকে সময়ক্ষেপণ করাচ্ছেন।
অক্টোবরে ট্রাম্প যে এক বছরের যুদ্ধবিরতি শি জিনপিংকে দিয়েছিলেন, তার ফলে যুক্তরাষ্ট্র–চীন চুক্তি বাস্তবায়িত হতে হলে ২০২৭ সালের শুরুর আগে হওয়ার সম্ভাবনা কম। নভেম্বর মাসে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, শুল্ক আরোপ সত্ত্বেও চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত প্রথমবারের মতো এক ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে—এই খবর ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে নিশ্চয়ই তীব্র আলোড়ন তুলেছে।

ট্রাম্প কি অধৈর্য হয়ে পড়বেন এই ভেবে যে, জাপান এখনো তার কথিত ৫৫০ বিলিয়ন ডলারের সাইনিং বোনাস দেয়নি? কিংবা দক্ষিণ কোরিয়া কেন তার দাবি করা ৩৫০ বিলিয়ন ডলারের বোনাস দিতে গড়িমসি করছে? অথবা এশিয়ার যেসব অর্থনীতি এখনো বড় বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ধরে রেখেছে, তাদের প্রতি কি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরক্তি বাড়বে?
চীন, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার বাইরে ট্রাম্পীয় ক্ষোভের সম্ভাব্য লক্ষ্য হতে পারে তাইওয়ান, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম। খাতভিত্তিক আঘাতও আসতে পারে—সেমিকন্ডাক্টর, ইস্পাত, অ্যালুমিনিয়াম ও ওষুধ শিল্পে। এর অর্থ হতে পারে নতুন করে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে ব্যাঘাত।
এমনকি ভালো খবরও এ অঞ্চলের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে কোনো বড় বাণিজ্য চুক্তি। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া নিজেদের বাইরে পড়ে যাওয়া দর্শক হিসেবেই থাকতে পারে। এমন চুক্তিতে তাইওয়ানকে কার্যত উপেক্ষা করার ঝুঁকিও রয়েছে।
সামনের বছর যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘরোয়া প্রবৃদ্ধি বাড়াতে মরিয়া ট্রাম্প ডলার দুর্বল করার পথে হাঁটতে পারেন। তার ঘনিষ্ঠ মহলে দীর্ঘদিন ধরেই মার-আ-লাগো চুক্তির কথা আলোচিত হচ্ছে, যার লক্ষ্য হবে প্রধান মুদ্রাগুলোর বিপরীতে, বিশেষ করে চীনা ইউয়ানের তুলনায়, ডলারের মান কমানো।
এর মধ্যেই মে মাসে ট্রাম্প ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েলের জায়গায় নিজের পছন্দের একজনকে বসানোর সুযোগ পাবেন। ওই ব্যক্তির কাজ হবে মূল্যস্ফীতি প্রায় তিন শতাংশে থাকলেও সুদের হার কমানো। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের প্রতি আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার বড় অংশ জাপানের হাতে রয়েছে।
২০১৬ সাল থেকে ট্রাম্প একাধিকবার প্রতিপক্ষদের চাপে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ পরিশোধে খেলাপের ইঙ্গিত দিয়েছেন। ২০২০ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি চীনের হাতে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের অংশবিশেষ বাতিল করার কথাও ভেবেছিলেন।
এখানে উদ্দেশ্য সম্ভাব্য সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির তালিকা তৈরি করা নয়। বরং আগামী বারো মাসে এশিয়া যেসব বাস্তব মাইনফিল্ডের মুখোমুখি হতে পারে, সেগুলো তুলে ধরা। বিশেষ করে এমন এক সময়ে, যখন উত্তর এশিয়ার কোনো বড় অর্থনীতিই পুরোপুরি সুস্থ অবস্থায় নেই।
২০২৫ সালের শেষে চীন প্রবেশ করছে গভীর সম্পত্তি সংকটজনিত মূল্যপতনের সঙ্গে লড়াই করে। তরুণদের বেকারত্ব প্রায় রেকর্ড উচ্চতায়, স্থানীয় সরকারগুলো বিপুল ঋণের চাপে নুয়ে পড়ছে এবং গড় মজুরি মহামারি-পরবর্তী সময়ের পর সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে।
ভোক্তাদের বেশি খরচে উৎসাহিত করতে যে শক্ত সামাজিক নিরাপত্তা কাঠামো দরকার, তা এখনো গড়ে তুলতে পারেননি শি জিনপিং। প্রায় বাইশ ট্রিলিয়ন ডলারের পারিবারিক সঞ্চয় বাজারে আনাই মূল্যপতন কাটিয়ে ওঠার অন্যতম চাবিকাঠি।

জাপান ২০২৬ সালে ঢুকছে এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে—স্থবিরতার সঙ্গে মূল্যস্ফীতির যুগল চাপে। তৃতীয় প্রান্তিকে অর্থনীতি যেখানে বার্ষিক ভিত্তিতে দুই দশমিক তিন শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদের হার বাড়িয়ে ত্রিশ বছরের সর্বোচ্চে নিয়েছে। একই সময়ে নতুন প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি সরকারি ব্যয়ের দরজা আবার খুলছেন।
এই দ্বন্দ্বের ফলেই ইয়েন দুর্বল হয়েছে, বন্ডের সুদ বেড়েছে এবং শেয়ারবাজার চাঙ্গা হয়েছে। বাজার স্পষ্টতই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আরও কড়াকড়ির আশ্বাস বিশ্বাস করছে না। যদি সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যে সংঘাত বাড়ে, তাহলে ইয়েন ক্যারি ট্রেড বড় ধাক্কা খেতে পারে, যার প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক বাজারে।
দক্ষিণ কোরিয়া তুলনামূলক ভালো অবস্থানে রয়েছে। প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ং প্রায় সাত মাস ধরে অর্থনীতিতে স্থিতি ফিরিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের উত্থানও শেয়ারবাজারে রেকর্ড উত্থান ঘটিয়েছে।
তবু বাণিজ্যনির্ভর এই অর্থনীতি বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবর্তনের প্রথম ধাক্কা খায়। ওয়াশিংটনে কোনো বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু হলে, তার প্রভাব সবার আগে ও সবচেয়ে তীব্রভাবে সিউলে পড়তে পারে।
এ ছাড়াও নজরে রাখার মতো ঝুঁকি কম নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বুদবুদ কীভাবে ফাটে, তা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের ভিন্ন মুদ্রানীতি, অতিরিক্ত ঋণ ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনাও বড় বিষয়। ট্রাম্প প্রশাসন কি ভেনেজুয়েলার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করবে? ইউক্রেন থেকে কি যুক্তরাষ্ট্র সরে দাঁড়াবে, যা রাশিয়াকে আরও আগ্রাসী করবে এবং তাইওয়ান ইস্যুতে চীনকে আত্মবিশ্বাস দেবে?
চীনের সামরিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জাপানে পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ে আলোচনা আবার জোরালো হতে পারে।
সব মিলিয়ে, ট্রাম্প—ট্রাম্প—ট্রাম্পই এ অঞ্চলের নীতিনির্ধারকদের সতর্ক রাখবে। ২০২৬ সাল সম্পর্কে একমাত্র নিশ্চিত বিষয় হলো—এটি হবে সিটবেল্ট বেঁধে চলার বছর।
উইলিয়াম পেসেক 



















