ট্রাম্পের ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে তার টেফলন-সদৃশ ভাবমূর্তি ব্যতিক্রমী মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। কংগ্রেস, বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য এবং কিছু আদালতে তিনি ক্রমেই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছেন। শক্তিশালী অবস্থান থাকা সত্ত্বেও দেশের ভেতরে ঘটনাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা কমছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের আমলে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব মাইক ম্যাককারি আমাদের বলেন, দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টরা পররাষ্ট্রনীতির দিকে ঝোঁকেন, কারণ ঘরোয়া রাজনীতির কোলাহলের তুলনায় এটি বেশি আকর্ষণীয় এবং সেখানে তারা বেশি রাজকীয় আচরণ পান। তিনি বলেন, ট্রাম্পকে তোষামোদ করতে যেসব বিদেশি নেতা হাজির হন, তারা শেষ পর্যন্ত নিজেদের স্বার্থ আদায়ের চেষ্টাই করেন।
চলতি বছরে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সিকে প্রভাবিত করা প্রণোদনা বদলে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-চীন চুক্তি এবং ব্যক্তিগত সম্পদ বৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে। এর প্রভাব পড়বে এশিয়ার সরকার ও ব্যবসার ওপর। ভেনেজুয়েলায় সাম্প্রতিক আগ্রাসী পদক্ষেপই শেষ নয়।
গত বছর গড়াতে গড়াতে ভোটার, গণমাধ্যম, আদালত এমনকি কিছু রিপাবলিকানও প্রেসিডেন্সির ওপর সীমারেখা টানতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের আপত্তি উপেক্ষা করে এপস্টিন ফাইল প্রকাশের বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। ইন্ডিয়ানার রিপাবলিকান অঙ্গরাজ্য সিনেটররা কংগ্রেসে থাকা দুই ডেমোক্র্যাট সদস্যকে বাদ দিতে তার পুনর্বিন্যাস দাবিও প্রত্যাখ্যান করেন।
একসময়কার ‘ট্রাম্প প্রভাব’ আর রাজনৈতিক সুবিধা নিশ্চিত করে না।
সুপ্রিম কোর্টও পরবর্তী বড় নিয়ন্ত্রণ আনতে পারে। জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে একতরফাভাবে শুল্ক আরোপের ক্ষমতা সীমিত করা বা বাতিল করার প্রস্তুতি সেখানে স্পষ্ট।
দুর্বল হাউস স্পিকার নির্বাহী শাখাকে নিয়ন্ত্রণে আগ্রহী না হওয়ায় ট্রাম্পের ক্ষমতা হয়তো তার পূর্বসূরিদের তুলনায় ধীরে কমবে। কিন্তু কমবেই।

দ্বিতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্টদের ক্ষেত্রে নৈতিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে, কারণ জবাবদিহি দুর্বল হয়। ভোটারদের মুখোমুখি হওয়ার চাপ না থাকায় স্বার্থের সংঘাত ও আত্মস্বার্থে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা শেষ মেয়াদে বাড়ে।
ট্রাম্পের আমলে ব্যবসায়ীদের জন্য ঝুঁকি আরও বড়, কারণ তাকে ও তার পরিবারকে আর্থিকভাবে সুবিধা দিতে চাপ আসার সম্ভাবনা প্রবল।
ট্রাম্প প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরিকে ঘিরে তহবিল সংগ্রহ ও দাতাদের প্রভাব, তার সরকারি সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত ব্যবসার স্বার্থের ধারাবাহিক মিশ্রণ—সব মিলিয়ে এমন একটি আইনি পথ তৈরি করছে, যেখানে অনুদানের অর্থ সরাসরি প্রেসিডেন্ট ও তার পরিবারের উপকারে আসতে পারে। এতে ৩০ কোটি ডলারের হোয়াইট হাউস বলরুম প্রকল্পও তুচ্ছ মনে হবে।
যুক্তরাষ্ট্র কোনো প্রতিষ্ঠানের ওপর যত বেশি প্রভাব রাখে, সেই প্রতিষ্ঠানের তত বেশি প্রস্তুত থাকতে হবে এই খেলায় নামবে কি না, সে সিদ্ধান্ত নিতে।
ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডেস্যান্টিস প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণে পথ পরিষ্কার করেছেন বলে মনে হচ্ছে। ফলে ট্রাম্পের বিশাল আকারের প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরি এবং একটি তহবিল সংগ্রহের অন্ধকার গহ্বর তৈরির দিকেই নজর যাচ্ছে।
এই লাইব্রেরিগুলো এবং জাতীয় আর্কাইভের সঙ্গে তাদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ এবং নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয়বহুল হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগ ছাড়া তহবিল সংগ্রহে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ বা স্বচ্ছতার বাধ্যবাধকতা না থাকায় নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়া দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, বিশেষ করে যখন তার ছেলে এরিক বোর্ডের বেতনভুক্ত সদস্য।
সাম্প্রতিক দশকগুলোতে প্রেসিডেন্সিয়াল লাইব্রেরির তহবিল সংগ্রহ দ্রুত বেড়েছে। ট্রাম্পের লাইব্রেরির লক্ষ্য আগামী বছরের শেষ নাগাদ ১০০ কোটি ডলার তোলা, যা আগের সব রেকর্ড ভাঙবে।
এ জন্য গভীর পকেটের সব স্বার্থগোষ্ঠীর কাছে আক্রমণাত্মক অনুরোধ আসবে, যার মধ্যে থাকবে বাজারে প্রবেশ, চুক্তি অনুমোদন, নিয়ন্ত্রক ছাড় বা যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অন্য সুবিধা চাওয়া বিদেশি কোম্পানিও।
দেশের ভেতরে ট্রাম্পের ক্ষমতা ক্ষয়ের ইঙ্গিত দেখা গেলেও পররাষ্ট্রনীতিতে তার ক্ষমতা কমবে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক নিয়ন্ত্রণ সবচেয়ে দুর্বল।
ভেনেজুয়েলায় হামলার আগে তিনি কংগ্রেসকে জানাননি বা দেশ পরিচালনার অনুমোদন নেননি—এটাই তার উদাহরণ।
কংগ্রেস বাজেট আটকে দিতে বা ঘরোয়া কর্মসূচি বিলম্বিত করতে পারে, কিন্তু সেনা মোতায়েন, চুক্তি প্রত্যাহার, শুল্ক আরোপ, কূটনৈতিক স্বীকৃতি বা হঠাৎ কৌশলগত পরিবর্তনে তাদের নিয়ন্ত্রণ অনেক কম।
ইতিহাসে প্রায়ই প্রেসিডেন্টদের বিচার করা হয় বিদেশে তাদের কর্মকাণ্ড দিয়ে, দেশের ভেতরের আইন পাস দিয়ে নয়। তাই নিজেদের উত্তরাধিকার নির্ধারণে তারা বৈশ্বিক অঙ্গনেই ছাপ রাখতে চান।
বিশ্বের বাকি অংশের জন্য এর মানে হলো আরও আক্রমণাত্মক ট্রাম্পের জন্য প্রস্তুত থাকা, এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সামলানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি আরও ক্ষয়ে যাওয়ার বাস্তবতা মেনে নেওয়া।
ওয়াশিংটনে নতুন কিছু করার খুব কম জায়গা রেখে এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও ‘লিবারেশন ডে’ শুল্কের মাধ্যমে তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্য নীতির বড় অংশ বাস্তবায়নের পর ট্রাম্পের নজর যাবে চীনের দিকে।
ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে যুক্তরাষ্ট্র-চীন চুক্তির ইঙ্গিত স্পষ্ট।
শুল্কের চাপ, অভিবাসন নীতির কারণে চাকরি হারানো এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি চাপে পড়ছে, যা ট্রাম্পের ‘ব্যবসাবান্ধব প্রেসিডেন্ট’ ভাবমূর্তি দুর্বল করে। চীনের সঙ্গে চুক্তি তাকে নতুন বয়ান গড়ার সুযোগ দেবে।
কংগ্রেসের রিপাবলিকানরা মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় পরাজয় এড়াতে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় চীন চুক্তির জন্য চাপ দেবে। এতে কাজ না হলেও তারা দাবি তুলবেই।
চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ সম্মেলনের যে বৈশ্বিক জাঁকজমক, তা ট্রাম্পের বিশেষ আকর্ষণ। এমনকি প্রশাসনের ভেতরের চীন-বিরোধীরাও এতে সায় দিচ্ছেন।
এক বছর আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে শক্তিশালী ও বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী বলেছিলেন। এগারো মাস পর তার অবস্থান বদলায়। তিনি বলেন, চীন এখনো এবং ভবিষ্যতেও ধনী ও শক্তিশালী দেশ থাকবে এবং ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তার মতে, চীনা কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারের সঙ্গে সহযোগিতার সুযোগ খোঁজাই যুক্তরাষ্ট্রের কাজ।
সম্ভাব্য চুক্তিতে শুল্ক কমানো, মালিকানা সীমা ও রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা এবং যুক্তরাষ্ট্রের দাবি পূরণ থাকতে পারে, তবে চীনের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টির ক্ষমতা সীমিত হবে না।
এতে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, বিশেষ করে যদি ওই অঞ্চলে শুল্ক বহাল থাকে এবং ‘চীন প্লাস এক’ বিনিয়োগের কিছু লাভ উল্টে যায়।
ইতিমধ্যে ট্রাম্প কিছু ভোক্তা পণ্যের ওপর শুল্ক ২০২৭ সাল পর্যন্ত স্থগিত করেছেন, যা চলতি বছরের ১ জানুয়ারি কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলো এখন আশা করছে তাদের শুল্ক পুরোপুরি বাতিল হবে। তবে শুল্ক ইতিমধ্যে কার্যকর থাকায় এবং সরাসরি মূল্যস্ফীতিতে প্রভাব না পড়ায় এই আশা খুবই ক্ষীণ।
আগামী তিন বছর ট্রাম্পের পররাষ্ট্রনীতি ক্ষমতা অক্ষুণ্ন থাকা এবং তার সম্পদ বাড়ানোর অদম্য আকাঙ্ক্ষা বিবেচনায় সরকার, ব্যবসা ও বিনিয়োগকারীদের মানতে হবে যে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি উচ্চই থাকবে।
নভেম্বরে ডেমোক্র্যাটরা হাউস পুনর্দখল করলে ট্রাম্পের আরও ক্ষমতা কমবে, কিন্তু তাতেও এই অনিশ্চয়তা দূর হবে না।
পররাষ্ট্রনীতিতে ট্রাম্পের মনোযোগ আরও বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্ব হয়ে উঠবে আরও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও কাঠামোগতভাবে অনিশ্চিত।
এই পরিস্থিতি সামলাতে প্রয়োজন হবে দূরদৃষ্টি, শৃঙ্খলা, প্রস্তুতি এবং এমন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার ক্ষমতা, যা আগে কখনো দরকার হয়নি। বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক দক্ষতা এটিই হবে—এর সঙ্গে তার লাইব্রেরিতে একটি অনুদান দেওয়াও।
লেখক পরিচিতি: স্টিভেন আর ওকুন ও থারগুড মার্শাল জুনিয়র ক্লিনটন প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করেছেন। ওকুন ছিলেন পরিবহন দপ্তরের ডেপুটি জেনারেল কাউন্সেল এবং মার্শাল ছিলেন হোয়াইট হাউসের ক্যাবিনেট সেক্রেটারি। বর্তমানে ওকুন সিঙ্গাপুরভিত্তিক এপ্যাক অ্যাডভাইজার্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং মার্শাল ওয়াশিংটনে আইন পেশায় যুক্ত।
স্টিভেন আর ওকুন ও থারগুড মার্শাল জুনিয়র 



















