ব্রিটেনের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে শান্ত মনে হলেও ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের সংকটের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। সরকারের সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বড় কোনো নতুন সিদ্ধান্ত না থাকলেও এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে বেশ কিছু উদ্বেগজনক সংকেত, যা আগামী সময়ে ব্রিটেনের অর্থনীতি ও রাজনীতিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।
প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক নাটকীয়তা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেই প্রতিশ্রুতির প্রতিফলনই দেখা গেছে সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বিবৃতিতে। অর্থমন্ত্রী র্যাচেল রিভস সংসদে নতুন অর্থনৈতিক পূর্বাভাস তুলে ধরলেও এতে বড় কোনো নীতিগত পরিবর্তনের ঘোষণা দেননি। তবে তিনি দাবি করেন, সরকারের আগের সিদ্ধান্তগুলো সঠিক ছিল এবং বর্তমান পূর্বাভাস সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করছে।
শান্ত বিবৃতির আড়ালে অর্থনৈতিক উদ্বেগ
অর্থমন্ত্রীর এই সংযত অবস্থান অনেকের কাছে স্বস্তির হলেও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ কমেনি। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে করব্যবস্থা নিয়ে নানা জল্পনা-কল্পনা ব্যবসা ও ভোক্তা উভয়ের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিল। নতুন ঘোষণায় বড় কোনো পরিবর্তন না থাকায় অন্তত স্বল্পমেয়াদে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরে এসেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবে সরকারি অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার নতুন পূর্বাভাস খুব আশাব্যঞ্জক নয়। দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন বৃদ্ধির সম্ভাবনা প্রায় আগের মতোই রয়েছে। কিন্তু স্বল্পমেয়াদে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
২০২৬ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আগের পূর্বাভাস ১ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১ দশমিক ১ শতাংশ ধরা হয়েছে। একই সময়ে বেকারত্বের হার বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নতুন হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালে বেকারত্বের হার ৫ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব
অর্থনীতির ওপর সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা। ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। তেল ও গ্যাসের দাম বাড়ার আশঙ্কায় ব্রিটেনের সরকারি বন্ডের সুদের হারও বেড়েছে।
যদি এই সংঘাত দীর্ঘায়িত হয় এবং জ্বালানি ব্যয় বেশি থাকে, তাহলে তা আবার মূল্যস্ফীতি বাড়িয়ে দিতে পারে। এতে সরকারের বাজেট পরিকল্পনাও চাপের মুখে পড়তে পারে।
এদিকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রশ্নেও সরকারের ভেতরে মতভেদ দেখা যাচ্ছে। সামরিক মহল দ্রুত প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর দাবি তুলছে। অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানো হলে দশকের শেষে প্রতি বছর অতিরিক্ত বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হতে পারে।
অভিবাসন কমে যাওয়ার নতুন চাপ
ব্রিটেনের অর্থনীতির জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় অভিবাসন। আগে ধারণা করা হয়েছিল নির্দিষ্ট সময়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ ব্রিটেনে আসবে। কিন্তু বাস্তবে সেই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে।
যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে আগামী কয়েক বছরে ব্রিটেনের জনসংখ্যা পূর্বাভাসের তুলনায় কম হবে। এর ফলে করদাতার সংখ্যা কমে যেতে পারে এবং সরকারের রাজস্ব আয়েও প্রভাব পড়তে পারে।
তরুণদের বেকারত্ব বাড়ছে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যাচ্ছে তরুণদের চাকরির বাজারে। সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী ১৬ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার ১৬ শতাংশের বেশি হয়েছে, যা ইউরোপের গড় হার থেকেও বেশি।
বিশ্লেষকদের মতে, তরুণদের জন্য ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো এবং করের চাপ বৃদ্ধির ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান নতুন কর্মী নিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছে। ফলে তরুণদের কর্মসংস্থান আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
মজুরি বাড়লেও স্বস্তি নেই মানুষের
সরকার দাবি করছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রকৃত মজুরি বেড়েছে। কিন্তু অনেক সাধারণ মানুষ নিজেদের আর্থিকভাবে আগের তুলনায় ভালো অবস্থায় মনে করছেন না।
এর বড় কারণ হলো কয়েক বছর আগে উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময় যে আয় কমে গিয়েছিল, বর্তমান মজুরি বৃদ্ধি মূলত সেই ক্ষতি পুষিয়ে দিচ্ছে। ভবিষ্যতেও মজুরি বৃদ্ধির হার খুবই ধীর হবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে আগামী নির্বাচনে ভোটারদের সামনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে একটি বিষয়—তারা কি সত্যিই আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছেন? অনেকের আশঙ্কা, বাস্তব পরিস্থিতি সেই প্রশ্নের ইতিবাচক উত্তর দিতে পারবে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















