তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী সি জোসেফ বিজয়ের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান ঘিরে রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক বিতর্ক শুরু হয়েছে। শপথ অনুষ্ঠানে তামিলনাড়ুর ঐতিহ্যবাহী রাজ্য সংগীত ‘তামিল থাই ভালত্তু’কে প্রচলিত নিয়ম ভেঙে তৃতীয় স্থানে পরিবেশন করা হয়। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
তামিল শব্দ ‘வாழ்த்து’-এর বাংলা উচ্চারণ ‘ভালত্তু’। এর অর্থ শুভেচ্ছা, বন্দনা বা সম্মান জ্ঞাপন। ‘তামিল থাই ভালত্তু’ বলতে বোঝায় ‘তামিল মাতার বন্দনা’। তামিলনাড়ুর মানুষের কাছে এটি শুধু একটি গান নয়, বরং ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক।
প্রথম দিনেই বিতর্কে নতুন সরকার

চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু ইনডোর স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত শপথ অনুষ্ঠানে প্রথমে ‘বন্দে মাতরম’, এরপর জাতীয় সংগীত এবং সবশেষে ‘তামিল থাই ভালত্তু’ পরিবেশন করা হয়। অথচ তামিলনাড়ুতে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি অনুষ্ঠান শুরু হয় এই তামিল সংগীত দিয়ে এবং অনুষ্ঠান শেষ হয় জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে।
এই ধারাবাহিকতা বদলে যাওয়ায় অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়। অনেকে প্রশ্ন তোলেন, কেন তামিল ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতীককে পেছনে সরিয়ে দেওয়া হলো।
রাজনৈতিক মহলে ক্ষোভ
রাজ্যের বামপন্থী নেতারা এই ঘটনাকে তামিল সংস্কৃতির মর্যাদাহানির সঙ্গে তুলনা করেছেন। তাদের অভিযোগ, বহু বছরের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম অমান্য করে নতুন এক ধারা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
তাদের মতে, তামিলনাড়ুর মানুষ ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে অত্যন্ত সচেতন ও আবেগপ্রবণ। তাই সরকারি অনুষ্ঠানে ‘তামিল থাই ভালত্তু’কে গুরুত্বহীন করে দেখানো সাধারণ মানুষের মনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
তারা আরও বলেন, স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় থেকেই ‘বন্দে মাতরম’ নিয়ে বিভিন্ন বিতর্ক ছিল। সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই তামিলনাড়ুতে নিজস্ব সাংস্কৃতিক রীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই নতুন এই পরিবর্তনের ব্যাখ্যা সরকারকে স্পষ্টভাবে দিতে হবে।

ক্ষমতাসীন দলের ব্যাখ্যা
বিতর্ক বাড়তে থাকায় ক্ষমতাসীন তামিলাগা ভেট্রি কাজাগমও দ্রুত নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। দলটির নেতারা জানিয়েছেন, তারাও মনে করেন সরকারি অনুষ্ঠানের শুরুতেই ‘তামিল থাই ভালত্তু’ পরিবেশন হওয়া উচিত।
তাদের দাবি, এই সিদ্ধান্ত দলের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। শপথ অনুষ্ঠানের পর গভর্নরের দপ্তরের সঙ্গে আলোচনা করে তারা জানতে পারেন, কেন্দ্রের একটি নতুন নির্দেশনার কারণে অনুষ্ঠানসূচিতে এই পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ভবিষ্যতে আবার আগের নিয়মেই অনুষ্ঠান পরিচালনা করা হবে। অর্থাৎ শুরুতে থাকবে ‘তামিল থাই ভালত্তু’ এবং শেষে জাতীয় সংগীত।
ভাষা শুধু ভাষা নয়

তামিলনাড়ুতে ভাষা কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি মানুষের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। রাজ্যের রাজনীতিতে ভাষা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতির প্রশ্ন বরাবরই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ইতিহাস বলছে, ভাষার মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন থেকেই তামিলনাড়ুতে বহু রাজনৈতিক শক্তির উত্থান হয়েছে। ফলে সরকারি অনুষ্ঠানে ভাষা বা সংস্কৃতির অবস্থান বদলে গেলে তা দ্রুত বড় রাজনৈতিক ইস্যুতে পরিণত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই এমন বিতর্ক তৈরি হওয়া তাদের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। কারণ তামিল জনগণের বড় একটি অংশ মনে করে, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতির সম্মান সব কিছুর আগে থাকা উচিত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















