যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আমন্ত্রণে বেইজিং সফরে পৌঁছেছেন। গত বছরের অক্টোবর মাসে বুসানে দুই নেতার বৈঠকের পর এটি তাদের আরেকটি মুখোমুখি সাক্ষাৎ। একই সঙ্গে, গত নয় বছরে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটিই প্রথম চীন সফর। শি জিনপিং ও ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক, বিশ্ব শান্তি এবং উন্নয়ন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে গভীর আলোচনা করবেন। ব্যাপকভাবে “ঐতিহাসিক” হিসেবে বিবেচিত এই বৈঠকে দুই নেতা আবারও করমর্দন করবেন, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে নতুন এক মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ নেতাদের এই বৈঠককে ঘিরে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। কারণ দুই দেশ মিলিয়ে বিশ্বের মোট অর্থনৈতিক উৎপাদনের এক-তৃতীয়াংশের বেশি, বৈশ্বিক জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ প্রতিনিধিত্ব করে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি হিসেবে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের স্থিতিশীল সম্পর্ক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বড় ধরনের স্থিরতা এনে দেয়।
সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক কেবল একটি সাধারণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নয়; এটি বিশ্ব শান্তি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, শিল্প ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশেষ করে বর্তমান অস্থির বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বেইজিং থেকে ইতিবাচক বার্তা প্রত্যাশা করছে এবং দুই নেতা আগামী সময়ের জন্য সঠিক দিকনির্দেশনা দেবেন বলে আশা করছে।

বিশ্ব কেন এত বেশি প্রত্যাশা করছে—তার উত্তরও সম্পাদকীয়তে তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রনেতাদের কূটনীতি চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের জন্য কৌশলগত দিকনির্দেশনা দিতে অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। গত কয়েক বছরে দুই দেশের সম্পর্ক নানা ঝড়-ঝাপটার মধ্য দিয়ে গেলেও সামগ্রিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে পেরেছে, যা সহজ কোনো বিষয় নয়।
বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে সংলাপ আরও সমতাভিত্তিক, যোগাযোগ আরও বাস্তবধর্মী এবং উভয় পক্ষের সীমারেখাও আরও স্পষ্ট হয়েছে। এর ফলে সম্পর্ক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিবর্তনের পেছনে রাষ্ট্রনেতাদের কূটনৈতিক ভূমিকা “দিকনির্দেশক কম্পাস” ও “নোঙর” হিসেবে কাজ করেছে বলেও মন্তব্য করা হয়েছে।
চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হওয়ায় মতপার্থক্য ও উত্তেজনা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। তবে এখন উভয় দেশের বিভিন্ন মহল এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে এই বিশ্বাস বাড়ছে যে, সমতার ভিত্তিতে আলোচনা ও পরামর্শের মাধ্যমে দুই দেশ তাদের মতবিরোধ সমাধান করতে পারবে।
গত বছর থেকে শুল্ক ইস্যু বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তৈরি করলেও দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের ঐকমত্যের ভিত্তিতে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রতিনিধিরা সাত দফা আলোচনা চালিয়েছেন। এসব আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষ মতৈক্য গড়ে তোলা, মতপার্থক্য নিয়ন্ত্রণ এবং সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
গত বছরের বুসান বৈঠকের পর থেকে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক সামগ্রিকভাবে স্থিতিশীল ও ইতিবাচক ধারায় এগিয়েছে, যা দুই দেশের জনগণ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্বাগত জানিয়েছে। ২০২৪ সালের ৭ নভেম্বর ট্রাম্পকে অভিনন্দন জানিয়ে শি জিনপিং বার্তা পাঠানোর পর থেকে দুই নেতা ছয়বার ফোনে কথা বলেছেন এবং একবার সরাসরি সাক্ষাৎ করেছেন।

সম্পাদকীয়তে আরও বলা হয়েছে, রাষ্ট্রনেতাদের কূটনীতি শুধু তাৎক্ষণিক সংকট এড়াতেই সাহায্য করেনি, বরং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের জন্য সুদূরপ্রসারী কৌশলগত দিকনির্দেশনাও দিয়েছে। কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা থেকে শি জিনপিং বারবার পারস্পরিক সম্মান, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
শি জিনপিং বলেছেন, “বিশ্ব এত বড় যে চীন ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়েরই উন্নতির সুযোগ রয়েছে। এক দেশের সফলতা অন্য দেশের জন্যও সুযোগ তৈরি করে।” ইতিহাস, জনগণ এবং বিশ্বের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে চীন সবসময় রাষ্ট্রনেতাদের কূটনীতিকে গুরুত্ব দিয়ে স্থিতিশীল ও গঠনমূলক সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে বলেও সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্পাদকীয়ে দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের সম্পর্কে যেসব সমস্যা তৈরি হয়েছে, তার বেশিরভাগই যুক্তরাষ্ট্রের কিছু মহলের ভুল ধারণা থেকে এসেছে। তারা মনে করে, এক দেশের উন্নতি অন্য দেশের ক্ষতির বিনিময়ে হয়। অথচ দুই দেশের নেতাদের মধ্যে গঠিত ঐকমত্য বাস্তবায়ন করা গেলে সম্পর্ক আরও স্থিতিশীলভাবে এগিয়ে যেতে পারে।
শি জিনপিংয়ের মতে, চীনের উন্নয়ন ও পুনর্জাগরণ ট্রাম্পের “আমেরিকাকে আবার মহান করা” দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়; বরং দুই দেশ পারস্পরিক সফলতা ও যৌথ সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। ট্রাম্পও বলেছেন, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গে কাজ করলে বড় বৈশ্বিক সমস্যাগুলোর সমাধান সম্ভব।
সম্পাদকীয়ের শেষ অংশে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে চীন তাদের ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার প্রথম বছর শুরু করবে এবং একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করবে। সেই প্রেক্ষাপটে অনেকে বিশ্বাস করছেন, রাষ্ট্রনেতাদের কৌশলগত দিকনির্দেশনার মাধ্যমে ২০২৬ সাল দুই দেশের পারস্পরিক সম্মান, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতার নতুন যুগের সূচনা করবে। একই সঙ্গে এটি নতুন যুগে দুই দেশের সহাবস্থানের সঠিক পথ অনুসন্ধানের আরেকটি ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে উঠতে পারে। সম্পাদকীয়ের ভাষায়, “চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।”
সারাক্ষণ ডেস্ক 



















