দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক মানচিত্রে ভিয়েতনাম এখন উচ্চকণ্ঠে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। রাজধানী হ্যানয়-এর উপকণ্ঠে বিশাল ক্রীড়া কমপ্লেক্সের নির্মাণ শুরু হওয়া শুধু একটি প্রকল্প নয়, বরং রাষ্ট্রীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার প্রতীক। প্রাগৈতিহাসিক ঢোলের নামে তৈরি হতে থাকা এই স্টেডিয়াম ভবিষ্যতে বিশ্বের বৃহত্তম আসনসংখ্যার অন্যতম হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। এর কেন্দ্র ঘিরেই পরিকল্পিত বহুবছরের এক মহাপ্রকল্প, যা শেষ হতে সময় লাগবে আরও এক দশকের বেশি।
অবকাঠামোয় রাষ্ট্রের বড় বাজি
এই স্টেডিয়াম একা নয়। গত ডিসেম্বরেই শতাধিক বড় প্রকল্পে অনুমোদন দিয়েছে ক্ষমতাসীন নেতৃত্ব। উত্তরের নদী অববাহিকা ধরে দীর্ঘ সড়ক নির্মাণ, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন মহাসড়ক, আবার দক্ষিণে নতুন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের প্রথম ফ্লাইট—সব মিলিয়ে অবকাঠামোয় রাষ্ট্রের ব্যয় লাফিয়ে বেড়েছে। চলতি বছরে এই ব্যয় মোট উৎপাদনের উল্লেখযোগ্য অংশ ছুঁয়েছে, আর আগামী বছরের বাজেটে আরও বড় বৃদ্ধির ইঙ্গিত রয়েছে। উন্নয়নের এই গতি অনেকের চোখে একসময় চীনের যে পর্ব ছিল, তারই প্রতিচ্ছবি।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ও সংস্কারের আশা
এই বিপুল ব্যয়ের পেছনে রয়েছে উচ্চ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য। কর আদায়ে দ্রুত বৃদ্ধি হওয়ায় অর্থনীতির ভারসাম্য আপাতত চাপে পড়ছে না। রপ্তানি ভর করে গত বছরে অর্থনীতি শক্তিশালী হারে বেড়েছে, যদিও নির্ধারিত লক্ষ্য পুরোপুরি ছোঁয়া যায়নি। চলতি বছরের লক্ষ্য আরও বেশি, যা কঠিন হলেও আশার জায়গা আছে। বেসরকারি খাতকে চাঙ্গা করতে কর ছাড়, প্রশাসনিক জটিলতা কমানো এবং প্রকল্প অনুমোদনে ঝুঁকি নেওয়ার নির্দেশ—এসব সংস্কারের পুরো প্রভাব এখনো আসেনি।

বিনিয়োগকারীর আস্থা, শেয়ারবাজারের উত্থান
এই পরিবর্তনের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে বিনিয়োগে। কয়েক বছর স্থবিরতার পর শেয়ারবাজারে বড় উত্থান হয়েছে। আন্তর্জাতিক সূচকে মর্যাদা পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত বিদেশি তহবিল টানার সম্ভাবনা তৈরি করেছে। তবে আসল শক্তি এসেছে বাস্তব অর্থনীতি থেকে। রপ্তানি বাড়ছে, শিল্প উৎপাদন জোর পাচ্ছে, আর ভোক্তাদের ব্যয়েও ধীরে ধীরে আস্থা ফিরছে।
বড় গোষ্ঠীর ওপর নির্ভরতার ঝুঁকি
তবু এই সাফল্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে দুর্বলতা। বাজারের বড় উত্থানের সিংহভাগ এসেছে কয়েকটি প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠীর হাত ধরে। অবকাঠামো উন্নয়নেও একই চিত্র। রাষ্ট্রীয় নীতিতেই সীমিত সংখ্যক জাতীয় চ্যাম্পিয়ন তৈরির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। এতে দ্রুত ফল মিললেও প্রশ্ন থেকে যায় জবাবদিহির। সম্প্রতি একটি বিশাল রেল প্রকল্প থেকে একটি বড় গোষ্ঠীর সরে দাঁড়ানো দেখিয়েছে, রাষ্ট্রীয় সহায়তা না পেলে ঝুঁকি নিতে তাদের অনীহা কতটা।
শক্তি ও ভঙ্গুরতার সহাবস্থান
সব মিলিয়ে ভিয়েতনামের অর্থনীতি এখন শক্তিশালী গতিতে এগোচ্ছে, কিন্তু সেই গতি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সিদ্ধান্তের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। উন্নয়নের জোয়ার যতই উঁচু হোক, ভিত মজবুত না হলে ঝুঁকির ঢেউ যে কোনো সময় আছড়ে পড়তে পারে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















