ইরানের ভেতরে চলমান ব্যাপক সরকারবিরোধী বিক্ষোভের মুখে যুক্তরাষ্ট্র কোনো ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নিলে কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে তেহরান। একই সময়ে ইসরায়েলি সূত্রগুলো জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় ইসরায়েল সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।
ইরানি সংসদের স্পিকারের হুঁশিয়ারি
রোববার ইরানের সংসদে দেওয়া বক্তব্যে স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ভুল হিসাব’ না করার সতর্কবার্তা দেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইরানের ওপর হামলা হলে ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সব সামরিক ঘাঁটি ও নৌযান বৈধ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হবে। সাবেক বিপ্লবী গার্ড কমান্ডার গালিবাফের এই বক্তব্যে ওয়াশিংটনের প্রতি কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভ ও প্রাণহানির চিত্র
গত ২৮ ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ অভিযান জোরদার করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানিয়েছে, এ পর্যন্ত অন্তত ১১৬ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই বিক্ষোভকারী হলেও নিরাপত্তা বাহিনীর অন্তত ৩৭ জন সদস্যও রয়েছেন।
প্রথমে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে আন্দোলন শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর থেকে ক্ষমতায় থাকা ধর্মীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিস্তৃত আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ইরান সরকার এই অস্থিরতার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করছে।
ইসরায়েলের সতর্ক অবস্থান
ইসরায়েলের নিরাপত্তা সংক্রান্ত আলোচনায় যুক্ত তিনটি সূত্র জানিয়েছে, দেশটি বর্তমানে উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। তবে এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি। ইসরায়েলি সরকারের মুখপাত্র এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন এবং দেশটির সামরিক বাহিনীও তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেয়নি।
এর আগে গত বছরের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের সংঘাত হয়, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের ওপর বিমান হামলা চালায়। জবাবে ইরান কাতারে অবস্থিত একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করেছিল।
ইন্টারনেট বন্ধ, তথ্যপ্রবাহে বাধা
বৃহস্পতিবার থেকে ইরানে ইন্টারনেট প্রায় পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণ সংস্থা নেটব্লকস জানিয়েছে, দেশজুড়ে সংযোগ স্বাভাবিক অবস্থার মাত্র এক শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা গেছে, তেহরানের পুনাক এলাকায় রাতে বিপুল মানুষ জড়ো হয়ে সেতুর রেলিং ও ধাতব বস্তুতে তাল মিলিয়ে শব্দ করছে, যা প্রতিবাদের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রচার
ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন পশ্চিমাঞ্চলের গাচসারান ও ইয়াসুজ শহরে নিহত নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জানাজার দৃশ্য প্রচার করেছে। কতজন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছেন, সে বিষয়ে সরকার আনুষ্ঠানিক সংখ্যা জানায়নি।
রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইসফাহানে ৩০ জন নিরাপত্তা সদস্যকে দাফন করা হবে এবং পশ্চিমের কেরমানশাহে ‘দাঙ্গাকারীদের’ হাতে ছয়জন নিরাপত্তা সদস্য নিহত হয়েছে। এছাড়া উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাশহাদে একটি মসজিদে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিপ্লবী গার্ড ও পুলিশের বক্তব্য
ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী নিরাপত্তা স্থাপনায় হামলার জন্য ‘সন্ত্রাসীদের’ দায়ী করেছে। পুলিশপ্রধান আহমদ রেজা রাদান জানিয়েছেন, তথাকথিত দাঙ্গাকারীদের মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা আরও বাড়ানো হয়েছে।
এর আগেও ইরান সরকার বিক্ষোভ কঠোর হাতে দমন করেছে। সর্বশেষ ২০২২ সালে পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক এক নারীর হেফাজতে মৃত্যুকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ও কূটনৈতিক তৎপরতা
শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরান হয়তো আগে কখনো না দেখা স্বাধীনতার দিকে তাকিয়ে আছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করতে প্রস্তুত।
একই দিনে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ফোনালাপে ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হস্তক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করেন বলে একটি ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা ফোনালাপের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও আলোচনার বিষয়বস্তু প্রকাশ করেননি।
‘সহনশীলতার লড়াই’ হিসেবে পরিস্থিতি
এক জ্যেষ্ঠ মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ইরানের পরিস্থিতিকে ‘সহনশীলতার খেলা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, বিরোধীরা চাপ ধরে রাখতে চাইছে, যাতে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা দেশ ছাড়তে বা পক্ষ বদলাতে বাধ্য হন। অন্যদিকে সরকার এমন ভয় সৃষ্টি করতে চাইছে, যাতে রাস্তাঘাট ফাঁকা হয়, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে সরাসরি হস্তক্ষেপের অজুহাতও না দেওয়া হয়।
ইসরায়েল এখনো সরাসরি হস্তক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়নি। তবে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু ইরান ইসরায়েলে হামলা চালালে ভয়াবহ পরিণতির হুঁশিয়ারি দেন এবং বলেন, ইরানের ভেতরের পরিস্থিতিও সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















