উত্তরাঞ্চলে এখন শীতল ঢেউ বইছে। ভোর নামলেই কুয়াশা ঘন হয়ে আসে, আলো ফোটার পরও দৃশ্যমানতা কম থাকে। ঠান্ডা বাতাসে শরীর কেঁপে ওঠে, দৈনন্দিন জীবনের গতি ধীর হয়ে যায়। এই বাস্তবতা এখন প্রতিদিনের—রংপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী ও লালমনিরহাট জুড়ে একই চিত্র দেখা যাচ্ছে।
ভোরের কুয়াশা, আগুনের খোঁজ
ভোরে ঘর থেকে বেরোতেই মানুষ আগুনের খোঁজে জড়ো হয়। রাস্তার মোড়ে, উঠানে কিংবা খেতের ধারে খড়কুটো জ্বলে ওঠে। হাত বাড়িয়ে সবাই উষ্ণতা নেয়, মুখে নিঃশ্বাসের ধোঁয়া দেখা যায়। চায়ের দোকানে ভিড় জমে, গরম চায়ের কাপে ঠান্ডা কিছুটা গলে যায়। কুয়াশা তখনও কাটে না, সূর্য উঠলেও আলো ম্লান থাকে।

শ্রমজীবনের চলমান লড়াই
এই ঠান্ডার মধ্যেই দিনমজুর, রিকশাচালক আর ক্ষেতের শ্রমিকরা কাজে বের হয়। কাজ থামে না, কারণ থামলে সংসার থেমে যায়। মোটা চাদর গায়ে দিয়েই তারা রাস্তায় নামে। নদীর ধারে কিংবা ইটভাটার পথে কুয়াশা আরও ঘন, হাঁটতে হাঁটতে শ্বাস ভারী হয়। তবু জীবিকার তাগিদে পথ চলা চলতেই থাকে।
শিশু ও বৃদ্ধদের বাড়তি ঝুঁকি
চলমান শীতল ঢেউ শিশু আর বৃদ্ধদের বেশি কাবু করছে। অনেক শিশুর গায়ে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র নেই, স্কুলে যাওয়ার পথে তারা কাঁপতে থাকে। বৃদ্ধদের শরীরে ব্যথা বাড়ছে, শ্বাসকষ্ট ও জ্বরের মতো উপসর্গ দেখা দিচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে চিকিৎসা পেতে দেরি হচ্ছে, পরিবারগুলো দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছে।
কৃষিজীবনে কুয়াশার চাপ
উত্তরের কৃষিজীবনে এই শীত বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। কুয়াশায় ঢেকে থাকা বোরো ধান ও শাকসবজির ক্ষেতে রোগের আশঙ্কা বাড়ছে। ভোরের শিশিরে ভেজা জমিতে নামলে পা অবশ হয়ে আসে। তবু কৃষকেরা মাঠ ছাড়ছে না, সূর্যের অপেক্ষায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, ফসল বাঁচানোর চেষ্টা চলছে।

শহরের নীরব গতি
শীতল ঢেউ শহরেও প্রভাব ফেলছে। সকালে বাসস্ট্যান্ডে যাত্রী কম, দোকানপাট দেরিতে খুলছে। কুয়াশার কারণে যানবাহন ধীরে চলছে, অফিসপাড়ায় উপস্থিতি কম দেখা যাচ্ছে। দুপুরে সূর্য একটু উঁকি দিলে শহর কিছুটা চাঙা হয়, কিন্তু বিকেল নামতেই ঠান্ডা আবার জাঁকিয়ে বসে।
সহমর্মতার উষ্ণতা
এই কঠিন সময়েও সহমর্মতার দৃশ্য চোখে পড়ে। কোথাও শীতবস্ত্র বিতরণ চলছে, কেউ আগুন পোহাতে ডেকে নিচ্ছে অপরিচিত মানুষকে। একটি কম্বল, এক কাপ গরম চা—এই ছোট সহায়তাই অনেকের জন্য বড় ভরসা হয়ে উঠছে।
চলমান শীতল ঢেউ উত্তরাঞ্চলের জীবনকে এখন প্রতিদিন নতুন করে পরীক্ষা নিচ্ছে। কুয়াশা আর কনকনে ঠান্ডার ভেতর দিয়েই মানুষ বাঁচার পথ খুঁজছে, কাজ চালিয়ে যাচ্ছে, একে অপরের পাশে দাঁড়াচ্ছে। এই জনপদে জীবন থামে না—শীতের মধ্যেও লড়াই চলছেই।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















