‘আমি ইউজুয়ালি বাসা থেকে বের হই না শহিদ ওসমান হাদির শাহাদাতের পরে। কারণ সিকিউরিটি কনসার্ন। আপনারা বলতে পারেন আপনার সঙ্গে সিকিউরিটি কোথায়? সিকিউরিটি কনসার্ন আছে কারণ আমরা সত্য বলেছি এবং এজন্য মন্ত্রণালয়ের শেষ চার মাস আমাকে কোনো কাজ করতে দেওয়া হয়নি।’
ওপরের কথাগুলো মাহফুজ আলমের, ১৩ জানুয়ারি ইত্তেফাকে প্রকাশিত হয়েছে। মাহফুজ আলম একেবারেই তরুণ। এই বয়সেই বর্তমান ইন্টারিম ব্যবস্থার প্রধানের বিশেষ সহকারী ও তথ্য উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করে এসেছেন।
তবে তাকে দেশের যে সকল মানুষ ইতোমধ্যে চিনেছে তার প্রধান কারণ- নিউ ইয়র্কে মুহাম্মদ ইউনূস আয়োজিত ক্লিন্টন ফাউন্ডেশনের অনুষ্ঠানে আমেরিকার সাবেক রাষ্ট্রপতি বিল ক্লিন্টনের উপস্থিতিতে ইউনূস তাকে নতুন পরিচয় করিয়ে দেন।
ইউনূস যখন তাকে বিশেষ অভিধা দিয়ে পরিচয় করিয়ে দেন সে তখন অত্যন্ত খুশি মুখে ছিল। নিতান্ত তরুণ, না চাইতে অতবড় একটা স্বীকৃতি পেয়ে গেলে সে তো খুশি হবেই।
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ অতটা না জানলেও, একটা বড় অংশের মানুষ জানেন, ওই অনুষ্ঠানে মুহাম্মদ ইউনূস প্রথম বলেছিলেন, শেখ হাসিনার পতন হঠাৎ কোনো ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে হয়নি। সেটা ছিল তার ভাষায় অ্যামেজিং মেটিকুলাস ডিজাইনড প্ল্যান। যার মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটানো হয়। আর ইউনূস ওই প্ল্যানের মূল মাস্টার মাইন্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন এই তরুণ মাহফুজ আলমকে।

যারা সচেতন মানুষ তাদের ছেলে বা নাতির বয়সের এই তরুণের জন্য সেদিন অনেকে কষ্ট পেয়েছিলেন। যে তরুণ “জুলাই বিপ্লব” “জুলাই বিপ্লব” করতে করতে নিউ ইয়র্কে গেল- মুহূর্তে সে হয়ে গেল একটি সরকার পতনের “মেটিকুলাস ডিজাইনের মাস্টার মাইন্ড”। এর পরে শুধু তার হিতাকাঙ্ক্ষী হলে বলা যায়, হায় রে বেচারা! বিপ্লবী থেকে মুহূর্তে মেটিকুলাস ডিজাইনের মাস্টার মাইন্ড।
আর যেই বিপ্লব হয়ে গেল মেটিকুলাস ডিজাইন, সঙ্গে সঙ্গে ঢাকার রাজপথে হিযবুত তাহরির মিছিলের সফলতাই সামনে চলে এল। ফলে তারা যেমন “বিপ্লব”-এর ন্যারেটিভ দাঁড় করাতে চেয়েছিল, অন্যদিকে তাদের বিপক্ষ শক্তি যেমন তাদেরকে ধর্মীয় মৌলবাদী হিসেবে প্রমাণিত করার চেষ্টা করছিল- এখানেও ঘটে গেল ভিন্ন ঘটনা। অর্থাৎ তাদের “বিপ্লবের ন্যারেটিভ”-এর পায়ের নিচে থেকে অনেক মাটি সরে গেল- আর তাদের প্রতিপক্ষের “জঙ্গি বা ধর্মীয় মৌলবাদীদের উত্থানের” ন্যারেটিভের পায়ের নিচে স্বাভাবিকভাবে খানিকটা শক্ত মাটি এসে গেল।
যার ফলে বিপ্লব বাঁচিয়ে রাখার জন্য বিপ্লবীদের আন্দোলনের নামে মব ভায়োলেন্সেরও অনেক জায়গায় বৈধতা দেওয়ার ও কাজে লাগানোর প্রয়োজন পড়ল। আর বিপ্লবীদের নিতে হলো “আদর্শ” ও “জনগণের শক্তির” মাধ্যমের বদলে পরাজিত প্রতিপক্ষকে প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে দমন করার পথ।
কোনো বিপ্লব বা মাস-আপরাইজিং-এর পরে যদি প্রতিপক্ষ বিপুল জনসমর্থনের স্রোতে ভেসে না যায়- তাদেরকে ঠেকাতে যদি প্রশাসনকে সর্বক্ষণ উদ্বিগ্ন থাকতে হয়, কঠোর হতে হয়- তখনই সাধারণ মানুষের প্রশ্ন আসে, আসলে ওটা কি মানুষের জন্য কিছু ছিল? বরং কানে কানে তখন কিছু সন্দেহের কথা উচ্চারিত হয়, অনেকে বলে, একি কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তি বিশেষের জন্য কিছু? আর সন্দেহকে আরও বেশি প্রমাণিত করে দিল মাহফুজ আলমের সত্য স্বীকারোক্তি, জীবনের ভয়ে তিনি এখন ঘরের ভেতর থাকেন।
অর্থাৎ যে মানুষেরা রাজপথে ছিল, তারা সরে গেছে। তারা কেউ আর মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ হতে চায়নি। তাই সে এখন নিঃসঙ্গ। ঘরের ভেতর নিজেই নিজেকে বন্দি করেছে।
অথচ যদি সত্য বিচার করা হয় এর জন্য ওই স্বল্প বয়সী অনভিজ্ঞ তরুণটি শতভাগ দায়ী নয়। কারণ তার বয়সটি এমন একটি বয়স- ওই বয়সে প্রতিটি মানুষ প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায়। তার ওই বয়সে যাদেরকে ভয়ানক “কমিউনিস্ট” দেখেছি তাদেরকেই আবার চল্লিশ না পেরুতেই “খোলা হাওয়া” হতে দেখেছি। বাস্তবে বেশিরভাগ মানুষের জীবনই এমনই প্রতি মুহূর্তে পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে যায়।

তবে সচেতন তরুণ, সচেতন হওয়ার মতো পরিবেশে বড় হওয়া তরুণরা একটি বিষয় তারুণ্যেই জেনে যায়- এই পৃথিবীর ওপরে যেমন সবুজ প্রকৃতি তেমনি পৃথিবীর নিচে অন্ধকারে গলিত লাভা প্রবাহিত। রাষ্ট্র ও সমাজের ওপরেও তেমনি একটি সুন্দর প্রকৃতি আছে- আবার রাষ্ট্র ও সমাজের নিচে নানান অন্ধকারের ফাঁদ আছে। যা কুটিল বা মেটিকুলাস স্বার্থে রাষ্ট্র ও সমাজে রয়ে গেছে অনাদি কাল থেকে। যেমন বধূর বিপরীতে বারবনিতা।
এ কারণে রাষ্ট্র ও সমাজের ওপরের সঙ্গে থাকলে জীবনের বাঁকে বাঁকে ভালো-মন্দের ফুল ও ফলের সঙ্গে থাকা যায়। আলোর জীবনে স্বাভাবিকই বধূ থাকে আর অন্ধকার জীবনে তার বিপরীত।
ইত্তেফাকে ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত মাহফুজ আলমের ওই বক্তব্যে- যা শুরুতে উল্লেখ করেছি- সেখানে আরেকটি আক্ষেপ আছে- তার আক্ষেপ তাকে শেষ চার মাস কাজ করতে দেওয়া হয়নি। মাহফুজ আলম শেষ চার মাস কাজ করলে কী হতো- সে আলোচনা অযথা। পৃথিবীতে যা ঘটেনি তা নিয়ে সময় নষ্ট করে না কেউ।
তবে মাহফুজ আলমের এই আক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গে তার দায়িত্বে যাওয়ার শুরুর দিকের একটি বক্তব্য মনে পড়ছে। তার মতামত ছিল সাংবাদিকতার চাকরিতে পারিশ্রমিক খুবই কম। এই দায়িত্বে যাওয়ার কয়েক মাস আগে মাহফুজ আলম কোনো একটা টেলিভিশনে সাংবাদিকতার জন্য গিয়েছিলেন- তাকে মাত্র ১২ হাজার টাকা অফার করা হয়েছিল।
এখানেও কিন্তু মাহফুজ আলম একই পথে হেঁটেছেন বিপ্লব ও মেটিকুলাস ডিজাইনের পার্থক্য যেমন তিনি করতে পারেননি- কমবয়স, অনভিজ্ঞতা এবং একটি বিশেষ ধারণার মধ্যে আবদ্ধ থাকার ফলে। এখানেই তেমনি তার কাছে পৃথিবী চতুষ্কোণ থেকে গেছে। পৃথিবীর গোলাকার রূপটি দেখার প্রান্তে এখনও এসে দাঁড়াতে পারেননি।
কারণ তিনি এখনও জানতে পারেননি সাংবাদিকতা কোনো চাকরি নয়, এটা একটা পেশা। পেশা শব্দটি আজকাল সব ধরনের কাজের সঙ্গে ব্যবহার হয়। আর সাংবাদিকতা ও প্রচার মাধ্যমে কাজ করা এক বিষয় নয়। একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।

প্রথমত সাংবাদিকতা কোনো চাকরি নয়, এটা কিছু মানুষের জীবন-ধর্ম। তাই তো কথাই আছে অমুক “আপাদমস্তক সাংবাদিক”। যে আপাদমস্তক সাংবাদিক তার কিন্তু অন্য কোনো জীবনাচরণ থাকে না, অন্য কোনো ধর্ম থাকে না- সাংবাদিকতাই তার ধর্ম।
এরা হচ্ছে সেই নাবিক, যারা এক সময়ের পৃথিবীতে বিভিন্ন বন্দরে বসে থাকত দিনের পর দিন- কীভাবে একটা জাহাজ পাওয়া যাবে- যাকে নিয়ে সে হয় অজানা পাহাড় থেকে সোনা উদ্ধার করবে, না হয় একটি নতুন ভূখণ্ড, সাগর বা অন্যকিছু আবিষ্কার করবে। আর যদি তা না পারে ওই বন্দরেই একদিন তাকে মৃত অবস্থায় দেখা যেত।
পৃথিবীতে প্রতিদিন যাত্রীবাহী, মালবাহী জাহাজের নাবিক জন্মাচ্ছে, মারা যাচ্ছে এটাই স্বাভাবিক। এদের মধ্য দিয়েই ওই প্রকৃত নাবিকরাই জন্মায়। নাবিক পেশাকে অর্থ দিয়ে নয়- ওই মৃত্যু ও আবিষ্কার দিয়ে তারা পরিচিত ও সম্মানিত করে গেছেন।
আমাদের এই বাংলা সাংবাদিকতায়, বাংলাদেশের সাংবাদিকতায়ও গৌরব করার মতো অনেক ওই রকম নাবিক জন্মে গেছেন। তাদেরকে কিন্তু রাষ্ট্র তৈরি করেনি, এটা তাদের জীবন-সংস্কৃতি ও জীবনাচরণ দিয়েই তারা অর্জন করে গেছেন।
অথচ মাহফুজ আলম ও তার সরকার তাদের “নতুন বন্দোবস্তের” জন্য সাংবাদিকতার কমিশনসহ অনেক কিছু করেছেন। যাক ওই সব নিয়ে কথা বলে লাভ নেই।
বরং তরুণ মাহফুজ আলম যে বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছেন এজন্য তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। তার প্রকাশিত বাস্তবতার মধ্যে একটু গভীর দৃষ্টি দিলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিষ্কার হয়ে যায়।
আর ভবিষ্যতে মাহফুজ আলম হয়তো বলবেন, চার মাস কাজ না করেই তিনি ভালো করেছেন। কারণ, যে সাংবাদিকতায় তিনি পুরোনো সিস্টেম ও কিছু অবাঞ্ছিত কালচারকে বদল করতে চেয়েছিলেন- তার বদলে কী সৃষ্টি হয়েছে সেটা তিনি নিজেই এখন দেখতে পাচ্ছেন।

তারা যে সময়টাকে বদলাতে চেয়েছিল, সে সময়ে কিছু সাংবাদিককে সামাজিক মাধ্যমে “দলকানা” হিসেবে ট্রল করা হতো। তারা মধ্যমাপের সাংবাদিক, বা কোনো কারণে হঠাৎ সাংবাদিক হয়েছিলেন।
কিন্তু মাহফুজ আলম নিশ্চয়ই দেখতে পাচ্ছেন, তার সরকারের আমলে বা তাদের “নতুন বন্দোবস্তের” আমলে শীর্ষ সম্পাদকরাই বলছেন, মত প্রকাশ তো বহু দূরের কথা, বেঁচে থাকাই এখন বড় প্রশ্ন। আর সামাজিক মাধ্যম শীর্ষ সাংবাদিকদের নিয়ে ট্রল করছে, “চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে”। আর সে চরণ সরকারপ্রধানেরও নয়।
বয়স যত বাড়ে মানুষ তত স্মৃতিকাতর হয়ে পড়ে, বিশেষ করে আমাদের মতো সাধারণ মানুষরা। তাই “চরণ ধরিতে দিয়ো গো আমারে” গানটার কথা উঠলেই তারুণ্যের সেই বাণিজ্যিক বাংলা সিনেমা “দাদার কীর্তির” নবাগত তাপস পালের লিপ দিয়ে এই গান আর তার অভিনয়টা মনে পড়ে। শহরের ভদ্র ঘরের ছেলে কিছুটা গ্রাম্যতার মধ্যে- বিশেষ করে ভোম্বলদার হাতে পড়ে গেলে যে কতখানি অসহায় হয়- তার অনেকখানি প্রকাশ নবাগত তাপস পাল এ গানের কলির সঙ্গে তার মুখের ভাষায় ফুটিয়ে তুলেছিলেন।
ওই বয়সে সিনেমাটা দেখে শুধু মজা পেয়েছিলাম, এখন মনে হয়, আসলে ভোম্বলদার হাতে পড়লে শুধু পশ্চিমের একটি ছোট্ট গ্রামীণ শহর নয়, অনেককে অনেক জায়গায় “চরণ ধরিতে দিও গো” বলতে হয়।
লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World.
স্বদেশ রায় 























