ভারতের সেমিকন্ডাক্টর বাজার দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। ইন্ডিয়া ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যেখানে এই বাজারের আকার ছিল প্রায় ৫২ বিলিয়ন ডলার (৪.৫ ট্রিলিয়ন রুপি), ২০৩০ সালের মধ্যে তা বেড়ে ১০৩.৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে।
গুজরাটের ধোলেরা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বর্তমানে যে নির্মাণকাজ চলছে, তা ভারতের বহুদিনের স্বপ্নের বাস্তব রূপ। টাটা ইলেকট্রনিক্স দেশটির প্রথম বড় সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট স্থাপনে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। পাশাপাশি, জাপানের রেনেসাস ইলেকট্রনিক্স ও থাইল্যান্ডের স্টারস মাইক্রোইলেকট্রনিক্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সিজি সেমির একটি কারখানা প্রতিদিন দেড় কোটি ইউনিট উৎপাদনের সক্ষমতায় পৌঁছানোর লক্ষ্য নিয়েছে, যা মূলত অটোমোটিভ, প্রতিরক্ষা ও শিল্প খাতে ব্যবহার হবে।
বর্তমানে ভারতের প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সেমিকন্ডাক্টর আমদানিনির্ভর। সেই প্রেক্ষাপটে এসব উদ্যোগ কেবল শিল্পনীতির অংশ নয়, বরং বৈশ্বিক প্রযুক্তি কাঠামোতে নিজেদের অবস্থান বদলে দেওয়ার দৃঢ় সংকেত।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতে সেমিকন বাণিজ্য মেলার আয়োজন করা হয়। বৈশ্বিক হার্ডওয়্যার শিল্পে ভারতের নতুন উত্থানের সম্ভাবনায় আগ্রহী বহু বিদেশি প্রতিষ্ঠান সেখানে অংশ নেয়। তবে মেলার ঠিক এক সপ্তাহ আগে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কসংক্রান্ত ঘোষণার কারণে মার্কিন কোম্পানিগুলোর অনুপস্থিতি চোখে পড়ে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, নেদারল্যান্ডস ও জার্মানির কোম্পানিগুলো কৌতূহল ও উচ্চাশা—দুয়োটাই নিয়ে উপস্থিত ছিল।
ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন এশিয়ার অন্যতম আকর্ষণীয় বিনিয়োগ কাঠামো ঘোষণা করেছে। এর লক্ষ্য নকশা, উৎপাদন, পরীক্ষা, প্যাকেজিং ও যন্ত্রপাতি নির্মাণ—পুরো চিপ ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা। বিশেষ করে ইলেকট্রনিক কম্পোনেন্ট ম্যানুফ্যাকচারিং স্কিম উল্লেখযোগ্য, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ৫০ শতাংশ এবং রাজ্য সরকারের ২৫ শতাংশ সহায়তায় মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৭৫ শতাংশ ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে।
তবে এত বড় ভর্তুকি সত্ত্বেও বৈশ্বিক চিপ নির্মাতাদের সাড়া এখনো সতর্ক। শোনা যায়, গ্লোবালফাউন্ড্রিজ ভারতকে ফ্যাব স্থাপনের সম্ভাব্য স্থান হিসেবে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছিল, কিন্তু উচ্চমানের নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, বিপুল পরিমাণ অতিশুদ্ধ পানি ও অত্যাধুনিক ক্লিনরুমের মতো কঠোর অবকাঠামোগত চাহিদার কারণে সরে আসে। এসব সুবিধা ভারতে এখনো সমানভাবে সহজলভ্য নয়।
তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীন যখন তাদের সেমিকন্ডাক্টর ভিত্তি গড়ে তোলে, সেই সময়গুলোতে ভারত পিছিয়ে পড়েছিল। ফলে আজ ভারতকে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে বহু দশকের অভিজ্ঞতা, পরিপক্ব সরবরাহ শৃঙ্খল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাসম্পন্ন প্রতিষ্ঠিত খেলোয়াড়দের সঙ্গে।
তবে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতা এখন ভারতের পক্ষে কাজ করছে। সম্পূর্ণ আত্মনির্ভরতার বদলে নয়াদিল্লি বাস্তববাদী কৌশল নিয়েছে। রাজ্য সরকারগুলোকে বিনিয়োগ আকর্ষণে প্রতিযোগিতায় নামানো, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব গড়া এবং বড় অঙ্কের মূলধন বিনিয়োগ করে ফ্যাবের পাশাপাশি পুরো সরবরাহ অবকাঠামো নির্মাণ—এই পথেই এগোচ্ছে দেশটি।
৭৫ শতাংশ ভর্তুকির সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। সুবিধাভোগীদের অবশ্যই বাধ্যতামূলক প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে। যৌথ উদ্যোগ, কৌশলগত জোট বা অধিগ্রহণের মাধ্যমে সরবরাহ শৃঙ্খল ও চিপ প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার দেখাতে হবে। জাপানে আইবিএম ও র্যাপিডাসের সহযোগিতা দেখিয়েছে, কীভাবে সরকারি অর্থায়ন অত্যাধুনিক প্রযুক্তিতে পৌঁছানোর সেতু হতে পারে। ভারতে টাটা ইলেকট্রনিক্স তাইওয়ানের পাওয়ারচিপ সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং কর্পোরেশন থেকে প্রযুক্তি পেয়েছে সরকারি সহায়তায়। তবে এত বড় ভর্তুকি সত্ত্বেও প্রতিক্রিয়া খুব উষ্ণ নয়, যা ইঙ্গিত দেয়—শুধু আর্থিক প্রণোদনা দিয়েই অবকাঠামো, বাস্তবায়ন ঝুঁকি ও পরিচালন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ দূর করা যায় না।
আউটসোর্সড সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং খাতই আপাতত ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি। ফ্যাবের তুলনায় কম পুঁজি লাগে এবং দেশের বিপুল প্রকৌশল দক্ষতাকে কাজে লাগানো যায়। ২০২৫ সালের অক্টোবরে কায়েন্স সেমিকন তাদের প্রথম বাণিজ্যিক চিপ পাঠিয়েছে। ওডিশা, আসাম, পাঞ্জাব ও তামিলনাড়ুতে চারটি নতুন ইউনিট নির্মাণাধীন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় একটি থ্রিডি গ্লাস সেমিকন্ডাক্টর প্যাকেজিং ইউনিট অনুমোদন পেয়েছে।
বর্তমানে অ্যাপল তাদের প্রায় ২০ শতাংশ স্মার্টফোন ভারতে সংযোজন করছে। এর ফলে ভারত এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ হার্ডওয়্যার উৎপাদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। স্থানীয় সংযোজন শিল্পের পাশে প্যাকেজিং ও টেস্টিং সুবিধা গড়ে তুলে রপ্তানির সুযোগও বাড়ছে। ভোক্তা ইলেকট্রনিক্সের চাহিদা ও প্যাকেজিং প্রযুক্তির বিবর্তন এই খাতে নতুন গতি আনছে।
ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশনের ডিজাইন লিংকড ইনসেনটিভ স্কিমের লক্ষ্য মূল্যশৃঙ্খলের আরও ওপরে ওঠা। নিজস্ব মেধাস্বত্ব উন্নয়নে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে। এলঅ্যান্ডটি সেমিকন্ডাক্টরস ব্যয়বহুল ফ্যাব এড়িয়ে ডিজাইনকেন্দ্রিক পথে এগোচ্ছে, যেখানে বিশ্বব্যাপী আইপি লাইব্রেরি ব্যবহার করা যায়। ২০২৫ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ২৩টি চিপ ডিজাইন প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে এবং ৭২টি কোম্পানি উন্নত ইডিএ সরঞ্জাম ব্যবহার করছে। ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ ধীরে ধীরে ‘ইনোভেট ইন ইন্ডিয়া’তে রূপ নিচ্ছে।

তবে একটি তীব্র বৈপরীত্য রয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ার ভারতে কাজ করলেও, প্রতিবছর পাশ করা ছয় লাখ ইলেকট্রনিক্স গ্র্যাজুয়েটের মাত্র ১ শতাংশের কাছে ফ্যাব্রিকেশন ও উন্নত প্যাকেজিং দক্ষতা আছে। ২০২৭ সালের মধ্যে দুই লাখ পঞ্চাশ হাজার থেকে তিন লাখ পেশাদারের ঘাটতির আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা শুধু প্রণোদনা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
তবু বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলো বড় বাজি ধরছে। ল্যাম রিসার্চ কর্ণাটকে সেমিকন্ডাক্টর যন্ত্রপাতি ও প্রশিক্ষণে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। এএমডি বেঙ্গালুরুতে তাদের সবচেয়ে বড় ডিজাইন সেন্টার চালু করেছে। এনএক্সপি লক্ষ্য নিয়েছে ভারতের বাজার থেকে বৈশ্বিক আয়ের ১০ শতাংশ অর্জনের।
ভারতের গবেষণা ও উন্নয়নে ব্যয় জিডিপির মাত্র ০.৬৫ শতাংশ, যা যুক্তরাষ্ট্রের ৩.৬ শতাংশ ও চীনের ২.৪ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। এতে উদ্ভাবন ও প্রতিযোগিতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো বেঙ্গালুরুতে গবেষণা কেন্দ্র রাখলেও উদ্ভাবন বাণিজ্যিকীকরণের জন্য দেশে ফেরত নিয়ে যায়। ফলে ভারতের সামনে চ্যালেঞ্জ হলো—পরিমাণভিত্তিক সক্ষমতাকে কীভাবে উচ্চমানের উদ্ভাবনে রূপ দেওয়া যায় এবং মেধা দেশে ধরে রাখা যায়।
আগামী ১২ থেকে ১৮ মাস হবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চলতি বছর ভারতের প্রথম বাণিজ্যিক ফ্যাব উৎপাদন শুরু করলে, সেগুলোকে বৈশ্বিক বাজারের কঠোর মানদণ্ড—উৎপাদন হার, ব্যয় ও গুণগত মান—পূরণ করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তব্য, কঠিন সময়ে ভারতের ওপর ভরসা করা যায়—এই কথার বাস্তব পরীক্ষা হবে এই শিল্পেই।
ভারত এখন সবচেয়ে উন্নত নোডের পেছনে ছুটছে না। বরং পরিপক্ব ফ্যাব, বিস্তৃত অ্যাসেম্বলি ও টেস্টিং সক্ষমতা এবং শক্তিশালী ডিজাইন দক্ষতার ভিত্তি গড়ে তুলছে। লক্ষ্য একটি শক্তিশালী স্বনির্ভর বাজার এবং দক্ষিণ এশিয়ার সেমিকন্ডাক্টর কেন্দ্রে পরিণত হওয়া।
প্রতিটি সেমিকন্ডাক্টর শক্তিধর দেশই কোথাও না কোথাও থেকে শুরু করেছিল। ভারত এখন সেই শুরুর অধ্যায় লিখছে।
আর্থি সিভানন্দ 


















