দশকের পর দশক ধরে বিশ্বজুড়ে মেধাবী বিজ্ঞানীদের প্রধান গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। গবেষণার বিপুল তহবিল, স্বাধীন পরিবেশ এবং উন্নত গবেষণা অবকাঠামোর কারণে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে বিজ্ঞানীরা সেখানে কাজ করতে যেতেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। গবেষণা বাজেট কমানো, অনুদান বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং ভিসা নীতির অনিশ্চয়তার কারণে অনেক তরুণ বিজ্ঞানী এখন নতুন গন্তব্য খুঁজছেন ইউরোপসহ অন্য অঞ্চলে।
গবেষণা তহবিল কমতেই অনিশ্চয়তা
ফরাসি জীববিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েলা লোবিনস্কা ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের একটি শীর্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল মানুষের শরীরে সুস্থ কোষ কীভাবে সময়ের সঙ্গে অসুস্থ কোষে পরিণত হয়, সেই জটিল প্রক্রিয়া নিয়ে গবেষণা করা।
কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যায়। যে গবেষণা অনুদান তাঁর বেতন দিচ্ছিল, সেটি বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে জীববৈজ্ঞানিক গবেষণার সবচেয়ে বড় অর্থদাতা সংস্থার বাজেট কমানোর প্রস্তাব আসে। আন্তর্জাতিক গবেষকদের জন্য ভিসা অনুমোদন নিয়েও দেখা দেয় অনিশ্চয়তা।
এই পরিস্থিতিতে লোবিনস্কা ভাবতে শুরু করেন, বিজ্ঞানচর্চার জন্য যুক্তরাষ্ট্রই কি একমাত্র জায়গা। খুব দ্রুতই তিনি ইউরোপে একটি নতুন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজের প্রস্তাব পান এবং সেখানে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
ইউরোপে নতুন সুযোগের দরজা
অস্ট্রিয়ার বিজ্ঞান একাডেমি সম্প্রতি এমন একটি বিশেষ কর্মসূচি চালু করেছে, যার লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র ছেড়ে আসা বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করা। চার বছর পর্যন্ত গবেষণা তহবিল দেওয়ার এই কর্মসূচির মাধ্যমে ইতিমধ্যেই অনেক গবেষক ইউরোপে কাজ শুরু করেছেন।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশও একই পথে এগোচ্ছে। গবেষণা ও উদ্ভাবনে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের টানতে বড় অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ করা হয়েছে। নতুন গবেষণা কর্মসূচি ও ফেলোশিপ চালু করে তারা বৈশ্বিক মেধাকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছে।

বিজ্ঞানীদের নতুন গন্তব্য খোঁজ
সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, গত কয়েক বছরে বিদেশে চাকরির জন্য যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিজ্ঞানীদের আবেদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর চাকরির বিজ্ঞপ্তিতে বিদেশি সুযোগের প্রতি আগ্রহ দ্রুত বাড়ছে।
ইতালীয় পদার্থবিদ আন্দ্রেয়া উরু যুক্তরাষ্ট্রে গবেষণা করলেও পরে ইউরোপে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তাঁর মতে, গবেষণা তহবিল অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘমেয়াদি ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা কমে গেছে।
অন্যদিকে জিনতত্ত্ববিদ অড্রি লিনও একই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে গবেষণার প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি মনে করেন, বিজ্ঞানচর্চা চালিয়ে যেতে হলে যেখানে সুযোগ থাকবে, সেখানেই যেতে হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র হওয়ার ইতিহাস
আজকের আগে যুক্তরাষ্ট্র সব সময় বৈজ্ঞানিক কেন্দ্র ছিল না। উনিশ শতকের শেষ ভাগে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ইউরোপ, বিশেষ করে জার্মানি ছিল এগিয়ে।
পরবর্তীতে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বহু ইউরোপীয় বিজ্ঞানী যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান। সেই সময় যুক্তরাষ্ট্রের সরকার গবেষণায় বড় বিনিয়োগ শুরু করে এবং আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানীদের জন্য উন্মুক্ত পরিবেশ তৈরি করে।
এর ফলে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে বিশ্ব বিজ্ঞানচর্চার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র।
বৈশ্বিক গবেষণার মানচিত্র কি বদলাচ্ছে
বর্তমানে পরিস্থিতি আবার পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। গবেষণা অনুদান কমে যাওয়া এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে অনেক বিজ্ঞানী বিকল্প পথ খুঁজছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এর ফলে বিশ্বজুড়ে বৈজ্ঞানিক মেধার বিস্তরণ ঘটতে পারে। একটি নির্দিষ্ট দেশ বা অঞ্চলের পরিবর্তে বিভিন্ন দেশে গবেষণা কার্যক্রম ছড়িয়ে পড়তে পারে।
তবে এই পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানচর্চার অবকাঠামো ও তহবিল এখনো বিশ্বে অন্যতম বড়। তাই ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আবারও বদলে যেতে পারে।
অনিশ্চয়তার মধ্যেই সিদ্ধান্ত
বর্তমান বাস্তবতায় বিজ্ঞানীদের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—গবেষণার জন্য কোথায় সবচেয়ে ভালো পরিবেশ পাওয়া যাবে। অনেকেই নতুন সুযোগের সন্ধানে ইউরোপে যাচ্ছেন, আবার কেউ কেউ অপেক্ষা করছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ার।
বিশ্বের বৈজ্ঞানিক ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে গবেষণার কেন্দ্র পরিবর্তিত হয়েছে। তাই অনেকের মতে, এই পরিবর্তনও হয়তো সেই দীর্ঘ ইতিহাসের আরেকটি অধ্যায় মাত্র।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 

















