চিকিৎসা ব্যবস্থার দীর্ঘসূত্রতা ও উদাসীনতায় হতাশ রোগীরা এখন উত্তর খুঁজছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে। সাশ্রয়ী, সারাক্ষণ পাওয়া যায়, সহানুভূতিশীল ভঙ্গিতে কথা বলে—এই সব কারণেই অনেকের চোখে ঝুঁকির মধ্যেও এ পথ গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠছে।
চিকিৎসকের উত্তরে হতাশ এক রোগীর গল্প
লস অ্যাঞ্জেলেসের ঊনআশি বছরের অবসরপ্রাপ্ত আইনজীবী ওয়েন্ডি গোল্ডবার্গ হাড়ের ঘনত্ব বাড়াতে কতটা প্রোটিন প্রয়োজন—এই সহজ প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর চেয়েছিলেন। চিকিৎসকের কাছ থেকে ফিরে আসে সাধারণ কিছু পরামর্শ, যা তাঁর জীবনযাপনের সঙ্গে মিলেনি। ধূমপান বা মদ্যপানের কথা বলা হলো, যদিও তিনি কোনোটিই করেন না। সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল, প্রোটিনের পরিমাণ নিয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশ না থাকা। হতাশ হয়ে একই প্রশ্ন তিনি করেন চ্যাটজিপিটিকে। কয়েক সেকেন্ডেই গ্রামে হিসাব করা নির্দিষ্ট লক্ষ্য পেয়ে যান। তখনই তাঁর মনে হয়, করপোরেট চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি আস্থা নড়ে গেছে।

চিকিৎসা ব্যবস্থার ফাঁক গুঁজছে চ্যাটবট
চিকিৎসা নীতি গবেষণা সংস্থার জরিপ বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রতি ছয়জন প্রাপ্তবয়স্কের একজন এবং ত্রিশের নিচে বয়সীদের প্রায় এক চতুর্থাংশ মাসে অন্তত একবার স্বাস্থ্য তথ্য খুঁজেছেন চ্যাটবটের কাছে। গবেষকদের ধারণা, এ হার এখন আরও বেশি। অনেকেই বলেছেন, চিকিৎসকের সময়স্বল্পতা, ব্যয়বহুল অ্যাপয়েন্টমেন্ট আর দীর্ঘ অপেক্ষার বিকল্প হিসেবে তারা এই প্রযুক্তির দ্বারস্থ হচ্ছেন।
রোগীর চোখে সহানুভূতির অনুভব
অনেকে জানেন, চ্যাটবট ভুলও করতে পারে। তবু এটি সব সময় পাওয়া যায়, প্রায় বিনা খরচে কথা বলে এবং এমন ভাষায় সাড়া দেয়, যাতে ব্যবহারকারী নিজেকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে মনে করেন। প্রশ্নের শুরুতেই দুঃখ প্রকাশ, আশ্বস্ত করা—এই ভঙ্গিই অনেকের কাছে বড় আকর্ষণ। আগে মানুষ ইন্টারনেট ঘেঁটে তথ্য খুঁজত, এখন চ্যাটবট সেই তথ্যকে ব্যক্তিগত বিশ্লেষণের ছাঁচে তুলে ধরছে, যা মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের মতো এক অনুভূতি তৈরি করছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানেই ঝুঁকি। চ্যাটবট অনেক সময় অতিরিক্ত সম্মতিসূচক হয়, ব্যবহারকারীর ভুল ধারণাকেও সমর্থন করে বসে। কোথাও কোথাও এর পরামর্শ ভয়াবহ পরিণতির দিকে নিয়ে গেছে। তবু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো বলছে, তারা চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করে তথ্যের মান উন্নত করছে এবং এটি কখনোই চিকিৎসকের বিকল্প নয়।
ডাক্তার ও চ্যাটবটের পার্থক্য
অনেক রোগীর অভিজ্ঞতায়, চিকিৎসকের নির্দিষ্ট সময়ের চাপ থাকে, কিন্তু চ্যাটবট কখনো তাড়া দেয় না। উইসকনসিনের এক নারী জানান, ঘণ্টার পর ঘণ্টা তিনি উপসর্গ জানিয়ে প্রশ্ন করেন, দিন ধরে আপডেট দেন, আর উত্তর পান ধৈর্য ধরে। ক্যালিফোর্নিয়ার এক চিকিৎসক নিজেই বলেন, নিজের রোগ নিয়ে বারবার আশ্বাস চাইতে তিনি মানুষের কাছে যেতে পারেন না, কিন্তু চ্যাটবট বারবার শুনতে রাজি।

ভুলের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে
তবে চিকিৎসা নৈতিকতা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট বাদ পড়লে বা ভুল প্রশ্ন করলে চ্যাটবট বিপজ্জনক পরামর্শ দিতে পারে। হার্ভার্ডের এক গবেষণায় দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই এটি অসংগত প্রশ্ন চ্যালেঞ্জ না করে ভুল উত্তর দেয়। রোগীর আত্মবিশ্বাস বাড়লেও, তা কখনো কখনো সঠিক সিদ্ধান্ত থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
ঝুঁকি জেনেও কেন ভরসা
অনেক রোগী এসব সীমাবদ্ধতা জানেন। তবু তারা মনে করেন, বর্তমান ব্যবস্থায় যখন বিকল্প নেই, তখন এই ঝুঁকিটুকু নেওয়াই ভালো। এক রোগী অধিকারকর্মীর ভাষায়, প্রশ্নটা আদর্শ ব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা নয়, বরং কিছু না থাকার চেয়ে এটা কি ভালো নয়—এই বিবেচনাই এখন অনেককে চালিত করছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















