বিশ্বজুড়ে শুল্ক বাড়ার প্রবণতা আর বৈশ্বিকায়নের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেই চীন তুলে ধরছে তার দক্ষিণ উপকূলের উষ্ণ দ্বীপ হাইনানকে। বেইজিংয়ের ভাষায়, এটি বিশ্বের সঙ্গে দ্বিমুখী বাণিজ্যের প্রতীক। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, শুল্কমুক্ত এই দ্বীপ একদিকে যেমন আকর্ষণ, অন্যদিকে তেমনি কঠোর নিয়ন্ত্রণের বেড়াজালে বাঁধা এক পরীক্ষাগার।
দক্ষিণ চীনের সাগরতীরে অবস্থিত হাইনান প্রদেশ আকারে সিঙ্গাপুরের প্রায় পঞ্চাশ গুণ বড়। গত মাসে দ্বীপটি অধিকাংশ আমদানিতে শুল্ক প্রত্যাহার করেছে, কর্পোরেট ও ব্যক্তিগত কর কমিয়েছে এবং নিজেকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় মুক্ত বাণিজ্য বন্দর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছে। চীনের শীর্ষ নেতা শি জিনপিং একে নতুন যুগে চীনের উন্মুক্ত তার গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সানিয়া শহরের সৈকতে আতশবাজির আলোয় নববর্ষ উদযাপনের দৃশ্য এখন আন্তর্জাতিক পর্যটনের প্রতীক। ইউরোপে নিষেধাজ্ঞা আর কটাক্ষের মুখে রাশিয়ান পর্যটকেরা এখানে খুঁজে পাচ্ছেন স্বস্তির আশ্রয়। একই সঙ্গে কাজাখস্তানসহ বিভিন্ন দেশের পর্যটকেরা জঙ্গলের ওপর কাচের সেতু পার হয়ে উপভোগ করছেন দ্বীপের প্রকৃতি। কিন্তু এই উন্মুক্ততার আড়ালে লুকিয়ে আছে ভিন্ন বাস্তবতা।

মাও সেতুংয়ের মৃত্যুর পর চীনের সংস্কার যুগে যেমন নির্দিষ্ট এলাকায় বাজারমুখী নীতি পরীক্ষা করা হয়েছিল, হাইনানকেও তেমন এক প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। তবে আজকের চীনের অবস্থান ভিন্ন। দেশটি এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন শক্তি এবং গত বছর প্রায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। শি জিনপিং বারবার আত্মনির্ভরতার কথা বলেছেন এবং উচ্চ শুল্ক ও রপ্তানিনির্ভর নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেননি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইনানকে জাতীয় অর্থনীতির ব্যাপক উন্মুক্ততার অগ্রদূত বলা কঠিন। তাদের বিশ্লেষণে, দ্বীপটির শুল্কমুক্ত সুবিধা মূল ভূখণ্ডে ছড়িয়ে পড়তে না দেওয়ার জন্যই কঠোর শর্ত আর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। হাইনানের প্রায় এক কোটি মানুষ চীনের মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও কম। এখানে শুল্কমুক্ত পণ্য ঢুকলেও সেগুলো মূল ভূখণ্ডে নিতে হলে অন্তত ত্রিশ শতাংশ মূল্য সংযোজন এর শর্ত পূরণ করতে হয়।
এই নীতির কড়াকড়ি স্পষ্ট হয়েছে সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্তে। হাইনান মুক্ত বাণিজ্য বন্দর চালুর কয়েক দিনের মধ্যেই ইউরোপীয় দুগ্ধ পণ্যে বড় মাত্রার শুল্ক আরোপ করেছে চীন। আমদানি করা গরুর মাংসে কোটার পাশাপাশি উচ্চ শুল্ক বসানো হয়েছে। একই সঙ্গে জাপানে দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য পণ্য রপ্তানিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা এসেছে।

হাইকৌ বন্দরে রাতদিন জাহাজ চলাচল করলেও, যা একসময় অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের কেন্দ্র ছিল, এখন কার্যত তা আন্তর্জাতিক সীমান্তের মতো আচরণ করছে। শুল্ক বিভাগ কড়াভাবে পরীক্ষা করছে যাতে শুল্কমুক্ত পণ্য অবৈধভাবে মূল ভূখণ্ডে ঢুকে না পড়ে।
তবু সীমিত সুযোগের মধ্যেই কিছু বিদেশি ব্যবসায়ী আগ্রহ দেখাচ্ছেন। ইথিওপিয়ার কফি ব্যবসায়ী নেসরেদিন হুসেইন হাইনানে শুল্কমুক্ত কফি এনে প্রক্রিয়াজাত করে মূল ভূখণ্ডে পাঠানোর পরিকল্পনা করছেন। তার মতে, সরাসরি মূল ভূখণ্ডে গেলে যে বাড়তি শুল্ক দিতে হতো, এখানে তা শূন্য।
সবাই অবশ্য আশাবাদী নন। থাইল্যান্ডের এক ব্যবসায়ী মনে করেন, চীনের বাজার এত বড় ও জটিল যে হাইনানের নতুন নীতিও বড় পরিবর্তন আনবে না।
হাইনান নিজেকে প্রায়ই হাওয়াইয়ের সঙ্গে তুলনা করে। পাম ঘেরা সৈকত আর বিলাসবহুল রিসোর্টের পাশাপাশি এখানে রয়েছে বড় সামরিক ঘাঁটি। সানিয়ার কাছে বিশাল নৌঘাঁটি দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের কৌশলগত অবস্থানের অংশ। শি জিনপিং সাম্প্রতিক সফরে শুল্কমুক্ত নীতির প্রশংসা করলেও স্পষ্ট করেছেন, নিরাপত্তা স্বার্থই এখানে সর্বাগ্রে।

দ্বীপজুড়ে নতুন যুগের উন্মুক্ততার প্রশংসায় লাল ব্যানার ঝুললেও সরকারি কর্মকর্তারা মুখ খুলতে নারাজ। অতীত দুর্নীতির ইতিহাসও উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। সম্প্রতি হাইনানের সাবেক শীর্ষ নেতা দীর্ঘ কারাদণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার ঘটনাও এই অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
১৯৮৮ সালে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল ঘোষণার পর থেকে হাইনান বহু বড় পরিকল্পনার সাক্ষী হলেও প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা আর অবকাঠামো উন্নয়ন সত্ত্বেও দ্বীপটি শেনঝেনের মতো সাফল্য পায়নি। দুই হাজার দশকের শেষ দিকে শুল্কমুক্ত বিপণিকেন্দ্র চালু হলেও তা অর্থনৈতিক গতি ফেরাতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, হাইনান এখনও কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে এটি পিছিয়ে আছে। তবে অন্যদের চোখে, এই দ্বীপ চীনের জন্য এক নিরাপদ পরীক্ষাগার, যেখানে মূল ভূখণ্ডের কাঠামো অক্ষুণ্ন রেখে নতুন আর্থিক, শিক্ষা ও করনীতি পরীক্ষা করা যাবে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















