সতেরো শতকের ফরাসি নাট্যকার মলিয়েরের ব্যঙ্গ, রসবোধ ও নাট্যগঠন অনুকরণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় লেখা এক নাটক প্যারিসের মঞ্চে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মানব সৃজনশীলতার সীমা আর প্রযুক্তির ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে এই উদ্যোগ।
প্যারিসের এক শিল্পকেন্দ্রে সম্প্রতি প্রদর্শিত হয়েছে ‘জ্যোতিষী বা মিথ্যা লক্ষণ’ নামের এই নাটকের অংশবিশেষ। গল্পে দেখা যায়, এক স্বৈরাচারী পিতা ভুয়া এক জ্যোতিষীর কথায় প্রতারিত হয়ে মেয়ের বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। শেষ পর্যন্ত মেয়ে ও এক বুদ্ধিমান পরিচারকের কৌতুকপূর্ণ কৌশলে সেই প্রতারণা ফাঁস হয়ে যায়। শুনতে মলিয়েরের চিরচেনা ছকের মতো হলেও এই নাটকটি তাঁর লেখা নয়, বরং একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রোগ্রামের সৃষ্টি।

মলিয়েরের সৃজনপ্রক্রিয়া অনুকরণের চেষ্টা
এই প্রকল্পে কাজ করেছে ফ্রান্সের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমষ্টি অবভিয়াস, প্যারিসের থিয়েটার মলিয়ের সোরবোন এবং সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয়। গত দুই বছর ধরে তারা মলিয়েরের নাটকের বিষয়বস্তু, কাঠামো ও কৌতুকধর্মী ভঙ্গি বিশ্লেষণ করে একটি প্রোগ্রামকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। থিয়েটারের পরিচালক মিকায়েল বুফার্ড জানান, তাঁদের লক্ষ্য ছিল ধাপে ধাপে মলিয়েরের সৃজনশীল প্রক্রিয়াকে যতটা সম্ভব ঐতিহাসিকভাবে সঠিকভাবে অনুকরণ করা।
প্রকল্পের ভাবনাটি আসে মানব বিশ্বাসপ্রবণতা নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা থেকে। মলিয়েরের নাটকে এই বিষয়টি বারবার উঠে এসেছে। তাঁর নাট্যজগতে জ্যোতিষ ও ছদ্মবিজ্ঞানের উপস্থিতিও নতুন নয়। সেই ধারাবাহিকতায় এই নাটকে জ্যোতিষীকে কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
কঠিন পথ আর দীর্ঘ সময়
এই নাটক লেখা মোটেও সহজ ছিল না। শুরুতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গল্পের শুরু মনে রাখতে না পেরে মাঝপথে অসংলগ্ন হয়ে পড়ছিল। বিভিন্ন নির্দেশনা আর মডেল বদলে মাসের পর মাস চেষ্টা চালাতে হয়েছে। এক সময় প্রায় হাল ছেড়ে দেওয়ার অবস্থায় পৌঁছেছিলেন নির্মাতারা। যেখানে মলিয়ের মাত্র দুই সপ্তাহে একটি নাটক লিখতে পারতেন, সেখানে এই প্রকল্পে সময় লেগেছে দুই বছর।

পরবর্তীতে প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতিতে দীর্ঘ রচনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখা সম্ভব হয়। মলিয়ের গবেষকরাও নিয়মিত মতামত দিয়েছেন। পনেরোবার সংশোধন করা হয়েছে কাহিনির সারসংক্ষেপ। বিশেষ করে ব্যঙ্গ আর শারীরিক কৌতুকের সূক্ষ্ম ভারসাম্য রক্ষা করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কখনো রস টেনে লম্বা হয়ে যাচ্ছিল, কখনো কৌতুক হয়ে পড়ছিল অতিরিক্ত সরল।
তবু মাঝেমধ্যে এমন সংলাপ এসেছে, যা দেখে নির্মাতারাই অবাক হয়েছেন। অভিনেতাদের প্রতিক্রিয়ায় বোঝা গেছে, কিছু জায়গায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সত্যিই হাসির ঝলক দেখাতে পেরেছে।
প্রশংসা আর বিতর্ক
নির্মাতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, এটিকে নতুন মলিয়ের নাটক হিসেবে দাবি করা হচ্ছে না। তবুও বিতর্ক এড়ানো যায়নি। কেউ কেউ মনে করছেন, মলিয়েরের মতো মহান নাট্যকারকে নিয়ে এমন পরীক্ষা ঝুঁকিপূর্ণ। সামাজিক মাধ্যমে একাধিক নাট্যব্যক্তিত্ব প্রকল্পটির বাজেট ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
তবে অর্থ শুধু লেখায় খরচ হয়নি। মঞ্চসজ্জা, পোশাক ও সংগীত তৈরিতেও আলাদা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সতেরো শতকের শৈল্পিক রীতি বজায় থাকে। এসব নকশা ও সুর পূর্ণাঙ্গভাবে উন্মোচিত হবে মে মাসে ভার্সাইয়ের রাজকীয় অপেরায়, এরপর ফ্রান্সজুড়ে প্রদর্শনের পরিকল্পনা রয়েছে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ
এই প্রদর্শনীকে এককালীন হিসেবেই ভাবা হয়েছিল। তবে ভবিষ্যতে অসম্পূর্ণ নাটক বা সঙ্গীত সম্পূর্ণ করার কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বলছেন নির্মাতারা। তাঁদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিজস্ব রুচি বা অহং নেই। সেই নিরপেক্ষতাই একে অতীতের শৈল্পিক ধারা পুনর্গঠনে কার্যকর করে তুলতে পারে। সবকিছু নির্ভর করবে মানুষ কীভাবে এই প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে তার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















