বাংলাদেশের সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংকের আমানতকারীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক ধাক্কার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। একীভবনের আগে ব্যাংকগুলোকে স্থিতিশীল করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক দুই বছরের জমাকৃত মুনাফা বাতিলের নির্দেশ দিয়েছে। এর ফলে এসব ব্যাংকের গ্রাহকরা ২০২৪ ও ২০২৫ সালের কোনো মুনাফা পাবেন না, বরং তাদের হিসাবে জমা টাকার পরিমাণও কমে যাবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, সংকটাপন্ন ব্যাংক পুনর্গঠনে আন্তর্জাতিক রেজুলেশন পদ্ধতির আলোকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশ অনুযায়ী ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত যেসব মুনাফা হিসাবভুক্ত করা হয়েছিল, তা সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাহার করতে হবে। অর্থাৎ ওই সময়ের মুনাফা হিসেবে যে টাকা যোগ হয়েছিল, তা হিসাব থেকে বাদ যাবে।
এই নির্দেশনা বুধবার চিঠির মাধ্যমে জানানো হয়েছে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক ও সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসকদের কাছে। পাঁচটি ব্যাংক ইতোমধ্যে একীভূত হয়ে নতুন নাম পেয়েছে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক পিএলসি’।

হিসাব পুনর্গণনার নির্দেশ
বাংলাদেশ ব্যাংক স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, সব আমানত হিসাব ২০২৫ সালের ২৮ ডিসেম্বরের অবস্থান অনুযায়ী নতুন করে গণনা করতে হবে। মুনাফা বাদ দেওয়ার পর যে পরিমাণ থাকবে, সেটিকেই চূড়ান্ত ব্যালান্স হিসেবে দেখাতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, রেজুলেশন স্কিম সঠিকভাবে বাস্তবায়নের স্বার্থে এই কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।
ব্যাংকগুলোর আর্থিক অবস্থার চিত্র
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, গত দুই বছরে এই পাঁচটি ব্যাংক ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়ে। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে মুনাফা বিতরণ করার মতো সক্ষমতা তাদের ছিল না। এর আগে এসব ব্যাংক আমানতের ওপর প্রায় ৭ থেকে ৯ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিল।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, এই পাঁচটি ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারী রয়েছেন। মোট আমানতের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৯৩ হাজার কোটি টাকা, যার বড় অংশই খেলাপি হিসেবে শ্রেণিভুক্ত।

অস্বাভাবিক সিদ্ধান্ত ও শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতি
এই সিদ্ধান্তের ফলে আমানতকারীরা শুধু দুই বছরের সম্ভাব্য আয় হারাচ্ছেন না, তাদের মূল জমার টাকাও কমে যাচ্ছে। বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এমন কঠোর পদক্ষেপ খুবই বিরল। এর আগে কেন্দ্রীয় ব্যাংক পাঁচটি ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেছিল, যার ফলে উদ্যোক্তা ও শেয়ারহোল্ডারদের সব বিনিয়োগ কার্যত বিলুপ্ত হয়ে যায়।
এক্সিম ব্যাংক আগে নিয়ন্ত্রিত ছিল বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের সাবেক চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের হাতে। বাকি চারটি ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করতেন এস আলম গ্রুপের প্রধান সাইফুল আলম। দুজনকেই ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত বলা হতো এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

ব্যাংক খাতে বড় পুনর্গঠন
পাঁচটি ইসলামী ব্যাংকের একীভবনকে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম বড় পুনর্গঠন উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের লক্ষ্য হলো ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঝুঁকি কমানো এবং ইসলামী ব্যাংকিং খাতে আস্থা ফিরিয়ে আনা। তবে এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ আমানতকারীদের, যাদের সঞ্চয়ের ওপর দুই বছরের মুনাফা এক ঝটকায় মুছে গেল।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















