২০২৫ সালের মতো ঘটনাবহুল বছর বাংলাদেশের ইতিহাসে আর আসেনি। বছর জুড়েই রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক উভয় কেত্রেই নানা ঘটনা ঘটেছে যা আগে কখনো ঘটেনি। এসব ঘটনা পেরিয়ে নতুন বছর শুরু হয়েছে বড় প্রত্যাশা নিয়ে। তবে এই প্রত্যাশার সঙ্গে আছে চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকির পাহাড়।
দেশের অর্থনীতির কথাই যদি বলি, তবে অর্থনীতির পুরোটা সময়ই কেটেছে নাজুক এবং ভঙ্গুর অব¯’ার মধ্যদিয়ে। যার নজীর আগে দেখা যায়নি। নাজুক ব্যাংকিং খাত, ঋণাত্মক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসং¯’ান সৃষ্টিতে ¯’বিরতা দীর্ঘ হ”েছ। পাশাপাশি রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলা পরি¯ি’তির অবনতিতে ক্ষয়িষ্ণু ব্যবসায়িক আ¯’ার প্রেক্ষাপটে নানান চ্যালেঞ্জ নিয়ে ২০২৬ সালে পা রেখেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি।
পঁচিশের বাস্তবতা:
বছরের শুরুটা হয়েছিল ভীষণ চাপের মধ্যদিয়ে। একদিকে নানা মহল থেকে দাবি, অন্যদিকে টালমাটাল দেশের অর্থনীতি। জনতোষণমূলক সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ বাড়ছিল। বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন বেতন বাড়ানোর দাবিতে জোরালো আন্দোলন করছিল। অথচ সরকারের হাতে টাকা ছিল খুবই সীমিত। তা সত্ত্বেও সরকার চেষ্টা করেছে গুরুতর অসু¯’ রোগীকে জরুরি চিকিৎসা দিয়ে বাঁচিয়ে তোলার মতো ধসে পড়া অর্থনীতিকে বাঁচানোর। তবে অর্থনীতিকে বাঁচাতে গিয়ে বড় মূল্য দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষকে। অর্থনীতি টিকে থাকলেও প্রবৃদ্ধি কমেছে, বিনিয়োগ ¯’বির হয়ে পড়েছে এবং দারিদ্র্য বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে তেমন স্বস্তি আসেনি।
বছরের শুরুর দিকে দেশের বৈদেশিক লেনদেনে বড় ঘাটতি ছিল, ডলারের রিজার্ভ দ্রুত কমছিল, মুল্যস্ফীতি দুই অঙ্কে আটকে ছিল আর ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বোঝায় নুয়ে পড়েছিল। এই অব¯’ায় সরকারের অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ ছিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল- আইএমএফকে সঙ্গে রাখা। কারণ আইএমএফের ঋণ কর্মসূচি অব্যাহত না থাকলে বিশ্বব্যাংক বা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক থেকেও বাজেট অর্থসহায়তা পাওয়া যেত না।
ঢাকা ও ওয়াশিংটনে সরকার ও আইএমএফের আলোচনা ছিল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। একপর্যায়ে মনে হ”িছল, এই আলোচনা বুঝি ভেঙ্গেই যাবে। ফলে সরকার বাজেট সহায়তার জন্য সমঝোতা করে আইএমএফের শর্ত মেনে নেয়। মনোযোগ দেন ডলারের রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং রাজস্ব ঘাটতি কমানো।
এসব শর্তের বিরুদ্ধে দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তারা ধর্মঘটে যান। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যে ভ্যাট বাড়ানোর প্রতিবাদ করেন।
তবে আইএমএফের সঙ্গে সমঝোতার কারণে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সং¯’া থেকে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা আসে। সংকটে থাকা অর্থনীতির জন্য ওই অর্থ ছিল ঠিক অক্সিজেনের মতো। কিš‘ বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার কারণে ডলারের বিনিময় হার ঠেকে ১২২ টাকায়। এতে রেমিটেন্স বেড়ে যায়। ফলে বছর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়ায় ৩২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
এতে দেশের বৈদেশিক লেনদেনের অব¯’াও বদলেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে বাংলাদেশ এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে, যেখানে ঠিক এক বছর আগে একই সময়ে ঘাটতি ছিল ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ এই অর্জনকেই সরকারের সফলতা হিসাবে মনে করছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলছেন, বাইরে থেকে বোঝা না গেলেও দেশের অর্থনীতির ভেতরের ভিত্তি এখন অনেক শক্ত।
তবে ২০২৫ সালজুড়েই বাস্তব অর্থনৈতিক কর্মকা-ের চিত্র মোটেও আশাব্যঞ্জক ছিল না। প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক, বিনিয়োগে ছিল ¯’বির, যেন খরা চলছে। রিজার্ভ এবং বৈদেশিক লেনদেনে যে উন্নতি তা হয়েছে মুলত আবেগের কারণে বৈধ পথে দেশে রেমিটেন্স পাঠানোর কারণে। ওই রেমিট্যান্স এবং দাতাদের দেয়া বাজেট সহায়তার ওপর ভিত্তি করে দেশে রিজার্ভ বেড়েছে এবং বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে উন্নতি হয়েছে।
আর উ”চ মুল্যে ডলারের বিনিময় হারের ¯ি’তিশীলতা কৃত্তিমভাবে ধরে রাখা হয়েছে। বিনিময় হার বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ায় প্রথম ধাক্কায় ডলারের দাম ১২১-১২২ টাকায় গিয়ে ঠেকে। কিš‘ রেমিটেন্স প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বাজারের নিয়মেই ডলারের দাম কমে আসাতে শুরু করে। কিš‘ অন্তর্বতী সরকার বাজার থেকে ডলার কিনে সেই চড়া দাম ধরে রেখেছে। গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত ছয় মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজার থেকে ৩১৩ কোটি ডলার কিনেছে। শুধু ডিসেম্বরেই কিনেছে ১০০ কোটি ডলার। এই ডলার কেনা নতুন বছরেও অব্যাহত আছে এবং রেমিটেন্সের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে বেশি করে ডলার কিনছে। এতে আমদানির ওপর চাপ সৃষ্টি হ”েছ। বাংলাদেশ একটি আমদানি নির্ভর দেশ। ফলে বেশি দামে পণ্য ক্রয়ের কারণে বাজারে বাড়তি দামে ক্রেতাকে তা কিনে খেতে হ”েছ। এতে সাধারণ অনেক ক্রেতা কয় ক্ষমতা হারিয়েছে। আর চড়া পণ্য মুল্যের কারণে তার প্রভাব পড়ছে মুল্যস্ফীতির ওপর।
মূল্যস্ফীতিই ছিল সরকারের জন্য ২০২৫ সালের সবচেয়ে কঠিন সমস্যা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কা কাটার পর দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে জিনিসপত্রের দাম কমতে শুরু করলেও বাংলাদেশে পরি¯ি’তি আলাদা ছিল। ২০২২ সালের মার্চ থেকে মূল্যস্ফীতি দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ২০২৪ সালের অক্টোবরে মূল্যস্ফীতি গড় হিসাবে ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়। টানা নয় মাস ধরে এই উ”চ মূল্যস্ফীতি বজায় থাকে। অবশেষে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দীর্ঘদিনের কড়াকড়ি আর্থিক ও মুদ্রানীতির কারণে মুদ্রাস্ফীতি বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে। কিš‘ জ্বালানি তেলের ও মার্কিন ডলারের উ”চ মূল্যের কারণে সেই কমার ধারা আটকে যায়। গত ছয় মাস ধরেই এই মুল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে আটকে আছে।

ডিসেম্বর মাসে জাতীয় পর্যায়ে সাধারণ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে ৮.৪৯ শতাংশ, নভেম্বরে এই হার ছিল ৮.২৯ শতাংশ। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বরে খাদ্য ও খাদ্য-বহির্ভূত খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে হয়েছে যথাক্রমে শতকরা ৭.৭১ শতাংশ ও ৯.১৩ শতাংশ, যা নভেম্বরে ছিল যথাক্রমে ৭.৩৬ ও ৯.০৮ শতাংশ।
বছর শেষেও সাধারণ মানুষের জন্য জীবনযাত্রার ব্যয় বড় সমস্যা হিসাবেই থেকেছে। মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতি বজায় রেখেছে। কিš‘ তাতে কোন কাজ হ”েছ না। মুল্যস্ফীতির ওপর এই কঠোর মুদ্রানীতি কোন প্রভাব ফেলতে পারছে না।
রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে পুরো বছরই বিনিয়োগ খরায় কেটেছে। এক অর্থনীতিবিদের ভাষায় ‘বিনিয়োগ শুকিয়ে গেছে’। টানা ছয় মাস ধরে ৭ শতাংশের নিচে আটকে রয়েছে বেসরকারি খাতে ব্যাংক ঋণের প্রবৃদ্ধি। ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে এই প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৬.৫৮ শতাংশে, যা বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রারও নিচে এবং দেশের বিনিয়োগ পরি¯ি’তি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
সর্বশেষ ঋণের প্রবৃদ্ধি দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছেছিল ২০২৪ সালের জুলাইয়ে, ১০ দশমিক ১৩ শতাংশ। এরপর ওই বছরের আগস্ট থেকেই প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। কমতে কমতে ২০২৫ সালের অক্টোবরে তা ৬.২৩ শতাংশে নেমে এসেছিল, যা ছিল ইতিহাসের সর্বনি¤œ।
বিনিয়োগ খরার প্রথম প্রভাব পড়েছে কর্মসং¯’ানে। বিনিয়োগের অভাবে ২০২৫ সালে নতুন কোন কর্মসং¯’ান তো হয়-ই নি। উল্টো পট পরিবর্তনের ধাক্কায় অনেক শিল্প কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারি ও বেসরকারি সূত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সারা দেশে প্রায় ৩৫০টির বেশি কারখানা ¯’ায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে, যার অধিকাংশই তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার ও টেক্সটাইল খাতের।
এই শিল্প সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়েছে কর্মসং¯’ানে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথমার্ধেই প্রায় ২১ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ১৮ লাখই নারী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপে দেখা যায়, ত্রৈমাসিক শ্রম শক্তি জরিপ অনুযায়ী জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৪ সময়ের তুলনায় ২০২৫ সালে আরও ১ লাখ ৭৬ হাজার মানুষ বেকার হিসেবে যুক্ত হয়েছে এবং মোট বেকারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখের বেশি। ২০২৫ সালের এই বেকারত্ব সংকট বাংলাদেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক ¯ি’তিশীলতার জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা হয়ে এসেছে।
২০২৫ সালে এসে দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে উল্টো পথে হেঁটেছে বাংলাদেশ। নতুন কর্মসং¯’ানের ¯’বিরতা ও আয় বৈষম্যের ফলে এবছর দেশে দারিদ্র্যের হার অস্বাভাবিক বেড়েছে, যা দেশের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নতুন এক হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ২০২২ সালে ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
আর বিশ্বব্যাংক বলছে, দেশে চার বছর ধরে দারিদ্র্যের হার বাড়ছে। ২০২৫ সালে দারিদ্র্যের হার বেড়ে দাড়িয়েছে ২১ শতাংশের কিছু বেশি। আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬০ লাখ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) তাদের ২০২২ সালের গৃহ¯’ালি আয় ও ব্যয় জরিপ অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
বিনিয়োগ খড়ার প্রভাব দ্বিতীয় পড়েছে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি গত বছরে এসে চার শতাংশের নীচে নেমে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রাথমিক হিসাবে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশে। ২০২০ সালের করোনা মহামারী সংকটের পর এই প্রথম প্রবৃদ্ধি চার শতাংশের নিচে নামল। উ”চ মূল্যস্ফীতি ও ¯’বির প্রবৃদ্ধির কারণে অর্থনীতিবিদদের ভাষায় দেশে এখন স্ট্যাগফ্লেশন পর্যায়ে রয়েছে।
বছরের শুরুতে আশা দেখালেও দ্বিতীয়ার্ধে রপ্তানি খাতেও গতি কমেছে। এ সময়ে রপ্তানি আয় নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। তৈরি পোশাক খাত নিয়ে অর্থ উপদেষ্টা যতটা আশাবাদী ছিলেন তার বিপরীত ঘটনা ঘটেছে রপ্তানি আয়ে। বছরের শুরুতে রপ্তানি ভালো থাকলেও গত টানা ৫ মাস ধরে রপ্তানি নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। এর বড় কারণ বৈশ্বিক হলেও ঘটনাটি ঘটেছে ২০২৫ সালে।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী, চলতি অর্থবছরের ষষ্ঠ মাস ডিসেম্বরেও রপ্তানি আয় কমেছে ১৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। আর জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় কমে দাঁড়িয়েছে ২৩ দশমিক ৯৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের ২৪ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ কম। আর তৈরি পোশাক খাতে বড় ধরনের মন্দা দেখা গেছে। ডিসেম্বরে পোশাক রপ্তানি ১৪ শতাংশের বেশি কমেছে।
২০২৫ সালে আর্থিক খাত ছিল বড় চাপের মধ্যে। খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়ায় ব্যাংক খাতের পরি¯ি’তি কঠিন হয়ে পড়ে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কার্যক্রমে মনে হয়েছে, বড় অঙ্ক দেখানোর জন্য ই”েছকৃতভাবে দেশে বিপুল খেলাপি ঋণ সৃষ্টি করা হয়েছে।
এবছর ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উ”চতায় পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষেও ব্যাংক খাতে খেলাপি হওয়া ঋণের ¯ি’তি ছিল ৩ লাখ ৪৫ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। ওই সময় বিতরণকৃত ঋণের ২০ দশমিক ২ শতাংশ খেলাপি ছিল। সে হিসাবে মাত্র নয় মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলোয় ২ লাখ ৯৮ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ বেড়ে যাওয়া অনেকটা অস্বাভাবিকই মনে হয়েছে। যদিও গত ২৫ বছরের মধ্যে এই হার ছিল সর্বো”চ। তবে দুর্বল পাঁচটি ব্যাংক একীভূত হওয়ায় ২০২৬ সালে ঋণপ্রদান ও আর্থিক ¯ি’তিশীলতার ক্ষেত্রে কিছুটা শক্ত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
সরকারের আরেকটি বড় লক্ষ্য ছিল রাজস্ব শৃঙ্খলা আনা। প্রয়োজনের কারণেই এই কড়াকড়ি। ঋণের সুদ পরিশোধ বেড়েছে ১৭ দশমিক ৩১ শতাংশ। পুরোনো বকেয়া মেটাতে গিয়ে ভর্তুকি বেড়েছে ৪৯ শতাংশ। ফলে মোট ভর্তুকি ব্যয় গত অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮ হাজার ৬৭২ কোটি টাকা।
এত চাপের মধ্যেও বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশে সীমিত রাখা হয়েছে। তবে এটি সম্ভব হয়েছে উন্নয়ন ব্যয় আশংকাজনকভাবে কমে যাওযার কারণে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে (জুলাই-নভেম্বর) বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাস্তবায়নে সরকারি ব্যয় রেকর্ড সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমেছে। এ সময়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ মিলিয়ে এডিপি বরাদ্দের মাত্র ২৮ হাজার ৪৩ কোটি ৬২ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। আইএমইডির তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ইতিহাসে অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে এটিই সর্বনি¤œ এডিপি ব্যয়।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের একই সময়েও এর চেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় করেছিল সরকার। ওই সময়ের প্রথম পাঁচ মাসে এডিপিতে ব্যয় হয়েছিল ৩৪ হাজার ২১৫ কোটি টাকা। আইএমইডির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম পাঁচ মাসে মোট এডিপি বরাদ্দের ১১ দশমিক ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। আগের অর্থবছরে একই সময়ে এ বাস্তবায়ন হার ছিল ১২ দশমিক ২৯ শতাংশ। ২০২৩-২৪ ও ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথম পাঁচ মাসে এডিপি বাস্তবায়ন হার ছিল যথাক্রমে ১৭ দশমিক ০৬ শতাংশ ও ১৮ দশমিক ৪১ শতাংশ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার এডিপির মাধ্যমে মোট ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে রাজস্ব ব্যব¯’ায়। গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজস্ব আয় বেড়েছিল মাত্র ১ দশমিক ৯ শতাংশ, যা জিডিপির ৬ দশমিক ৬ শতাংশের সমান। এই প্রেক্ষাপটে কর্মকর্তাদের তীব্র আন্দোলনের মুখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ভেঙে দুটি আলাদা সং¯’া করা হয়েছে, রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যব¯’াপনা বিভাগ।
শুরুতে ফল ভালোই দেখা যা”েছ। প্রথম তিন মাসে রাজস্ব আদায় বেড়েছে ২০ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে এই উন্নতির মূল্য সাধারণ মানুষকে দিতে হয়েছে বাড়তি ভ্যাট দিয়ে। সাধারণ মানুষের জীবনের এখনো উন্নতি হয়নি। দারিদ্র্য ও বৈষম্য বেড়েছে।
সদ্য সমাপ্ত বছরে দেশের শেয়ারবাজার এক ধরনের ¯’বিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে কেটেছে। সূচকের ওঠানামা থাকলেও সামগ্রিকভাবে বাজারে গতি ছিল না। বরং পুরো বছরে সূচকের ৩২৮ পয়েন্ট পতন ঘটেছে। দীর্ঘ মন্দার কারণে অধিকাংশ সাধারণ বিনিয়োগকারী বড় লোকসানের মধ্যে ছিল। অনেকেই মাসের পর মাস লেনদেনে অংশগ্রহণ করেননি। বছর শেষেও এ অব¯’া থেকে মুক্তি কোনো দিশা পায়নি বিনিয়োগকারীরা। সবমিলিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তায় আটকে ছিল বিনিয়োগকারীরা।
গত বছরের আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে পরিবর্তনের আবহ তৈরি হয়। ফলে বিনিয়োগকারীরা ভেবেছিলেন, বহুদিন ধরে যে সংস্কারের কথা বলা হ”িছল সেগুলো এবার হবে। আর তাতে বাজারে জবাবদিহিতা বাড়বে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিমত্তা বাড়বে, আর বাজার হবে আরও ন্যায্য ও স্ব”ছ।
বাস্তবে কিছু সংস্কারের দেখা মিলেছে। যেমন মিউচুয়াল ফান্ড ও মার্জিন ঋণের নতুন নিয়ম করা হয়েছে। নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার পদ্ধতি সহজ করা হয়েছে। বিও হিসাবের বার্ষিক ফি কমানো হয়েছে। এছাড়া বাজারে অনিয়মের অভিযোগে আগে যাদের ধরা যেত না, তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যব¯’া নেওয়া হয়েছে।

কিš‘ সংস্কারের শুরুটা সুখকর ছিল না। জোর করে শেয়ার বিক্রি, বিনিয়োগ কমে যাওয়া ও শেয়ারের দর পড়তে থাকায় অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির মুখে পড়েন। ফলে বাজারটা এক রকম অ¯ি’রতার মধ্যেই কেটেছে।
সমস্যা কেবল আর্থিক খাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। গত এক দশকে অনেক কোম্পানি বড় আশা নিয়ে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছিল। কিš‘ ২০২৫ সালে এসে দেখা গেল, এর মধ্যে অনেক কোম্পানির পারফরম্যান্স খুবই দুর্বল হয়ে গেছে বা সেগুলোর শেয়ারকে দুর্বল হিসেবে ধরা হ”েছ। এই অবনতি বাজার পরি¯ি’তিকে আরও খারাপ করেছে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পুরো বছরে নতুন কোন কোম্পানি তালিকাভুক্ত না হওয়া। ২০২৫ সালে একটি আইপিও বাজারে আসেনি। তাই দুর্বল শেয়ার ধরে রাখা বিনিয়োগকারীদের সামনে তেমন কোনো বিকল্প ছিল না। ফলে তাদের বিনিয়োগ আটকে থাকে এবং নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ কমে যায়।
এখন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আশায় আছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন বাজারে আ¯’া ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করতে পারে। কারণ রাজনৈতিক দলগুলো প্রকাশ্যে পুঁজিবাজারের পক্ষে থাকার কথাই বলেছে।
ছাব্বিশে কি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে অর্থনীতি?
২০২৬ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এ বছরে দেশ একটি গণতান্ত্রিক ট্রানজিশনের মধ্য দিয়ে যাবে, যা একদিকে ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে। দীর্ঘদিন ধরে যে অনিশ্চয়তা ছিল- বিশেষ করে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তা কিছুটা কাটতে পারে। যদি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হয় তাহলে বিনিয়োগ, কর্মসং¯’ান সৃষ্টি, সাপ্লাই চেইন রেসপন্স এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের মতো বড় বড় ইস্যুতে অগ্রগতি সম্ভব হবে।
তবে নতুন সরকার গঠিত হলে অর্থনৈতিক ব্যব¯’াপনাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। কারণ, তখন নির্বাচনকেন্দ্রিক চাপ কমে আসবে। এটি একটি সম্ভাবনাময় দিক। তবে একই সঙ্গে কিছু পুরোনো চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে—- যেমন প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, ব্যবসার খরচ কমানো ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করা।
টানা কয়েক বছর অর্থনৈতিক চাপ ও অনিশ্চয়তার পর ২০২৬ সাল নিয়ে নতুন করে সতর্ক আশা কথা বলছেন অর্থনীতিবিদরা। তাদের মতে, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় নির্বাচন দেশের অর্থনীতিতে আ¯’া ফেরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নির্বাচন ঘিরে রাজনৈতিক ¯ি’তিশীলতা তৈরি হলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আবারও বিনিয়োগে আগ্রহী হতে পারেন।
এই ¯ি’তিশীলতার সুফল হিসেবে কর্মসং¯’ান বাড়ার পাশাপাশি জিডিপি প্রবৃদ্ধিও গতি পাবে-এমন প্রত্যাশাও করছেন বিশ্লেষকেরা।২০২৫ সালের বেশির ভাগ সময় ধরে যে উ”চ মূল্যস্ফীতি মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়েছে, তা ২০২৬ সালে কিছুটা কমতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, বিশ্ববাজারে খাদ্য ও জ্বালানির দাম কমার প্রবণতা এবং দেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে ¯ি’তিশীলতা ফিরতে শুরু করায় মূল্যস্ফীতির চাপ কমার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
তবে অর্থনীতি পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে সময় লাগবে, কারণ নতুন সরকারকে নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে কয়েক মাস সময় নিতে হবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশিষ্ট ফেলো অধ্যাপক মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০২৫ সালের অনেক সমস্যা ২০২৬ সালেও থেকে যাবে। বিনিয়োগ এখনো ধীরগতির, আর মানসম্মত কর্মসং¯’ান তৈরি করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।
তিনি বলেন, নতুন বছরের সবচেয়ে বড় আশার বিষয় হলো ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন ও গণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর। তার মতে, নতুন সরকারকে এই রাজনৈতিক ম্যান্ডেট কাজে লাগিয়ে ন্যায্য, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে।
এছাড়া বাজার তদারকি ও সরবরাহপক্ষের উদ্যোগের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি সতর্কতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পাশাপাশি বাড়তে থাকা ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দিতে সরকারের অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আদায় বাড়ানো জরুরি। এ জন্য করব্যব¯’াকে ডিজিটাল করা, ভ্যাট ফাঁকি কমানো এবং আরও মানুষকে আয়কর ব্যব¯’ার আওতায় আনার ওপর জোর দেন তিনি।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পণ্য ও রপ্তানি বাজারে বৈচিত্র্য আনার কথা বহুদিন ধরে বলা হলেও বাস্তবে তেমন অগ্রগতি হয়নি। চলতি বছর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পথে থাকায় এসব উদ্যোগ এখন আরও জরুরি হয়ে উঠেছে।
অর্থনীতিবিদ এম মাসরুর রিয়াজ ২০২৬ সালের জন্য চারটি অগ্রাধিকার তুলে ধরেন। প্রথমত, চলমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক সমস্যা মোকাবিলা করা। দ্বিতীয়ত, বিনিয়োগ, রপ্তানি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দেশের ভেতরের চাহিদাসহ যেসব খাতের গতি কমে গেছে, সেগুলো আবার পুনরুজ্জীবিত করা। তৃতীয়ত, ব্যাংক, বিমা, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও পুঁজিবাজারসহ পুরো আর্থিক খাতে সুশাসন ফিরিয়ে আনা। চতুর্থত, একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।
নানা আশংকা সত্ত্বেও বছর শেষে একটি বিষয় কিছুটা পরিষ্কার হয়েছে। তা হলো আওয়ামী লীগ ছাড়া অপর দুই বড় রাজনৈতিক দল কোনো আপত্তি ছাড়াই নির্বাচনের সময়সূচি মেনে নেওয়ায় বিনিয়োগকারীদের আ¯’া ফিরতে পারে। এটা রাজনৈতিক ¯ি’তিশীলতারও ইঙ্গিত দি”েছ।
সব মিলিয়ে, বাংলাদেশ ২০২৬ সালে ঢুকছে একটি ট্রানজিশনাল অব¯’ার মধ্যদিয়ে। যদিও অর্থনীতির গতি এখনো অন্তত্য মš’র। অন্তর্বতী সরকার কিছু সংস্কার শুরু করেছে, কিš‘ কাজ এখনো অনেক বাকি। নতুন সরকার ইতিবাচক সংস্কার কাজগুলো চালিয়ে নিলে হয় তো অর্থনীতি ঘুরে দাড়াতে শুরু করতে পারে।
![]()
রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস
২০২৫ সালের একেবারে শেষ প্রান্তে, ৩০ ডিসেম্বর খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং তার এক মাস আগে আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার মৃত্যুদ-াদেশ- এই দুটি ঘটনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। এসব ঘটেছে এমন এক সময়ে, যখন ফেব্রুয়ারিতে নির্ধারিত জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক রূপান্তর সামনে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে এইচ এম এরশাদের স্বৈরশাসনের পতনের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পর এই প্রথম এমন একটি নির্বাচন হতে যা”েছ, যেখানে গত চার দশক ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিকে নিয়ন্ত্রণ করা দুই প্রভাবশালী নেতা- খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা-কেউই থাকছেন না।
এদিকে এখন ‘মবোক্র্যাসি’ নামে পরিচিত মব সহিংসতার উত্থান, ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়ি ধ্বংস, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যা, লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বৈঠক, ঘনায়মান অনিশ্চয়তার মধ্যেই নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা, তারেক রহমানের দেশে ফেরা-এসবই সদ্য বিগত বছরের বড় ও গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে।
নতুন বছরে প্রত্যাশা ঘুরপাক খা”েছ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে, যেটি রাজনৈতিক রূপান্তরের পাশাপাশি অসু¯’ অর্থনীতির জন্যও গেম-চেঞ্জার হয়ে উঠবে বলে মনে করা হ”েছ।
২০২৬ সাল কার্যত একটি নির্বাচনী বছর, যার শুরু ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন দিয়ে। এরপর সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদসহ হাজারো ¯’ানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন। রাজনৈতিক রূপান্তরের জন্য এটি হতে পারে একেবারে উপযুক্ত বছর।
তবে ভবিষ্যতের সুর বেঁধে দেবে ফেব্রুয়ারির নির্বাচনই। একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন জাতীয় ও তৃণমূল- উভয় পর্যায়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে। এমনকি দলীয় সরকারের অধীনেও ¯’ানীয় সরকার নির্বাচনগুলো তুলনামূলকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে।
ফেব্রুয়ারির নির্বাচনকে ইতোমধ্যে দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন হিসেবে দেখা দি”েছ। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষিত হওয়ার পর বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নজিরবিহীন উত্থান ক্ষমতার দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর একটিতে পরিণত হয়েছে। বছরের শেষ দিকে এসে এনসিপির জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে যোগ দেওয়ায় নির্বাচনের গুরুত্ব ও ঝুঁকি আরও বেড়েছে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট ক্ষমতায় এলে রাজনীতি ও অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়বে- এ নিয়ে অনেকেই অনিশ্চিত, কারণ দলটি কখনোই এককভাবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসেনি।
এদিকে ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে বিএনপিকে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিতে আসা তারেক রহমানের পাশে এবার থাকছেন না তার মা খালেদা জিয়া, যিনি ১৯৯১ সাল থেকে দলকে নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়েছেন।

বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অপেক্ষায় অর্থনীতি
এই প্রেক্ষাপটে ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হয়ে উঠেছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের ধারণা, একটি বিশ্বাসযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আ¯’া ফিরিয়ে আনবে, আটকে থাকা বিনিয়োগের দ্বার উন্মুক্ত করবে এবং পুনরুদ্ধারের পথ তৈরি করবে।
এই প্রত্যাশার ভিত্তিও আছে। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাইক টাচটনের গবেষণাসহ বিভিন্ন গবেষণা দেখায়, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয়ী যেই হোক না কেন, বিনিয়োগ বাড়ে এবং অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স শক্তিশালী হয়। কারণ সুষ্ঠু নির্বাচন প্রাতিষ্ঠানিক ¯ি’তিশীলতা, আইনের শাসন ও নীতির পূর্বানুমেয়তার বার্তা দেয়, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরি¯ি’তি বড় উদ্বেগের বিষয়। তবে মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ দিনটির শান্ত পরিবেশ নির্বাচন কমিশনকে আশাবাদী করেছে যে একটি বিশ্বাসযোগ্য ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব।
২০২৫ সালের শেষভাগের অ¯ি’রতা, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে ব্যবসায়ীরা সমাজের অন্যান্য অংশের মতোই- আশা করছেন, নির্বাচন রাজনৈতিক ¯ি’তিশীলতা ফিরিয়ে আনবে, আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। তারা আশা করছেন, নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিলে নীতিনির্ধারণে ধারাবাহিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক আ¯’া ফিরে আসবে।
আশাবাদের আরেকটি কারণ আছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে ফেব্রুয়ারিতে তিনটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে, আসন্ন নির্বাচনটি হবে চতুর্থ। কোনো একক মাসে এতগুলো জাতীয় নির্বাচন হয়নি। ১৯৭৯, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনগুলো ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনৈতিক রূপান্তরের মাইলফলক। ১৯৭৯ সালের নির্বাচন ১৯৭৫ সালের সামরিক আইন পর্বের অবসান ঘটায়। ১৯৯১ সালের নির্বাচনকে বলা হয় প্রথম সত্যিকারের বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন, যা দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু করে। আর ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন একতরফা ও বিতর্কিত হলেও তা সংবিধান সংশোধনের পথ খুলে দেয় এবং তৎকালীন রাজনৈতিক সংকট নিরসনে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যব¯’ার জন্ম দেয়।
গেল বছরের ৪ ডিসেম্বর প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশের জন্ম হবে। “এই নির্বাচন সেই নতুন বাংলাদেশের দরজা খুলে দেবে।”
এখন দেখার বিষয়, অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে ‘ধাত্রী’র ভূমিকা পালন করে-যেমনটি প্রধান উপদেষ্টা নিজেই বলেছেন, যাতে এই জন্মপ্রক্রিয়া “সুষ্ঠু ও সঠিকভাবে” সম্পন্ন হয়।
একই সঙ্গে ভুলে যাওয়ার সুযোগ নেই -সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া গণভোটের কথাও। ‘হ্যাঁ’ না ‘না’ – যে ফলই আসুক, সেটিই নির্ধারণ করবে জুলাই সনদের বাস্তবায়নের ভবিষ্যৎ, যেখানে নতুন সংসদের জন্য বড় ধরনের সাংবিধানিক সংস্কারের প্রস্তাব রয়েছে।
তবে বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অপেক্ষায় থাকবে অর্থনীতি। বাংলাদেশের জন্য বার্তা স্পষ্ট হ”েছ- অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার এখন আর শুধু রাজস্ব বা মুদ্রানীতির ওপর নির্ভর করছে না, রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই নতুন বছরটি কেবল একটি নির্বাচনী বছর নয়- এটি বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্য সত্যিকারের ‘মেক অর ব্রেক’ তথা ভাঙ্গা-গড়ার বছর।
লেখক: অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
আকিব রহমান 



















