ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে যেমন করা হয়েছে, তেমনি নিষেধাজ্ঞা ভেঙে তেল বহনকারী ট্যাংকার জব্দ করার নির্দেশ দিতে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি তেহরানকে সতর্ক করে বলেছেন, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর যদি দমন–পীড়ন চালানো হয়, তবে ওয়াশিংটন ‘লকড অ্যান্ড লোডেড’। ইরান এই হুমকিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। অন্তত ৪২ জনের মৃত্যুর পর ট্রাম্পের এই সতর্কবার্তা এখন নীতিগত এক বড় পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। প্রশ্ন হলো, যুক্তরাষ্ট্র কি সত্যিই তার লাল রেখা কার্যকর করবে?
ইরান নীতিতে ট্রাম্প যে বারাক ওবামা নন, তা তিনি আগেই প্রমাণ করেছেন। ওবামা যেখানে একটি পারমাণবিক চুক্তির মাধ্যমে তেহরানের ধর্মতান্ত্রিক শাসকদের সমৃদ্ধ করেছিলেন, সেখানে ট্রাম্প সেই ত্রুটিপূর্ণ চুক্তি থেকে সরে এসে কঠোর নিষেধাজ্ঞার পথ নেন, যার ফলে শাসকগোষ্ঠী তেল আয়ের বড় অংশ হারায়। ২০১৭ সাল থেকে ইরানে যখন মানুষ রাস্তায় নেমেছিল, তখন ২০০৯ সালের মতো নীরব না থেকে ট্রাম্প প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের রাজনৈতিক সমর্থন জানান। ওয়াশিংটনের প্রচলিত ধারণা ছিল, এমন সমর্থন দিলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে। ট্রাম্প সেই ধারণাকে ভেঙে দেন।
বর্তমানে শাসকগোষ্ঠী হাসপাতালেও গুলি চালাচ্ছে এবং কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দিচ্ছে। ট্রাম্পের প্রতিশ্রুতি থেকে অনুপ্রাণিত বিক্ষোভকারীরা তাঁর কাছে সহায়তা চাইছে, এমনকি তাঁর নামে রাস্তার নামকরণও করছে। প্রশ্ন উঠছে, ট্রাম্প কি সিরিয়ায় ২০১৩ সালে ওবামার ঘোষিত ‘লাল রেখা’ অমান্যের পুনরাবৃত্তি করবেন? সেই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক প্রতিরোধক্ষমতাকে দুর্বল করেছিল, একটি টালমাটাল শাসনকে এক দশকের বেশি সময় টিকিয়ে রেখেছিল এবং মধ্যপ্রাচ্যকে রক্তক্ষয়ী সংঘাত ও শরণার্থী সংকটে ঠেলে দিয়েছিল।
ইসলামি প্রজাতন্ত্র ধারণা করছে, পশ্চিমা বিশ্ব তাকিয়ে থাকলেও তারা প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করে এই বিদ্রোহ দমন করতে পারবে। ট্রাম্প চাইলে এই ধারণা ভুল প্রমাণ করতে পারেন। উপায় হলো, ইরানি তেল বহনকারী ট্যাংকার শনাক্ত ও জব্দ করা—যেমনটি যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে করেছে।
এই ট্যাংকারগুলো ‘শ্যাডো ফ্লিট’ নামে পরিচিত। এগুলো অবৈধভাবে ইরানি তেল চীনে নিয়ে যাচ্ছে এবং ট্রাম্পের সর্বোচ্চ চাপ নীতিকে দুর্বল করছে। এই কৌশল ইরানের ভূখণ্ডে সরাসরি সামরিক হামলা না চালিয়েই শাসকগোষ্ঠীর ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একই সঙ্গে এটি বিক্ষোভকারীদের রাস্তায় আরও শক্তিশালী হওয়ার সময় এনে দেবে।
বাস্তব অর্থে, এসব জাহাজ জব্দ করা হলে তা হবে শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা এবং দমনযন্ত্র চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব থেকে তাদের বঞ্চিত করবে। রাজনৈতিকভাবে এতে ট্রাম্পের বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় থাকবে এবং সহিংসতার জন্য তাৎক্ষণিক মূল্য আদায় করা সম্ভব হবে।
ট্রাম্পের প্রতি তেহরানের উপহাসমূলক প্রতিক্রিয়া ছিল একটি ভুল হিসাব। ইরানের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা সংস্থার সচিব আলী লারিজানি মার্কিন সেনাদের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্ক থাকার কথা বলেন। তিনি ভুলে গেছেন, ছয় বছর আগে ইরানের শীর্ষ সন্ত্রাসী কাসেম সোলেইমানিকে হত্যার পেছনে মূল কারণ ছিল ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনা ও ঠিকাদারদের ওপর ধারাবাহিক হামলা। শাসকগোষ্ঠীর সহিংসতার মুখে উদাসীনতা কেবল সংকটকে দীর্ঘায়িত করবে। সম্প্রতি ইরানে গঠিত একটি নতুন প্রতিরক্ষা পরিষদ ইঙ্গিত দিয়েছে, তারা বাহ্যিক হুমকি মনে করলে আগাম সামরিক পদক্ষেপ নিতেও পারে।
শাসকগোষ্ঠী যখন সহিংসতার পথেই এগোচ্ছে, তখন তাদের আত্মবিশ্বাস ভেঙে দেওয়ার সময় এসেছে। ভেনেজুয়েলার মাদুরো সরকারের বিরুদ্ধে নেওয়া সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি প্রদর্শনের উদাহরণ হতে পারে। তবু ইসলামি প্রজাতন্ত্র মনে করছে, মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটন শেষ পর্যন্ত সংঘাতে জড়াবে না।
ট্রাম্প এই ধারণা বদলাতে পারেন শাসকগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক রক্তনালীতে আঘাত হেনে এবং সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনেয়িকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে যে নিজের জনগণকে হত্যা করার মূল্য হবে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার সম্পূর্ণ ধস।
ইরান ইতোমধ্যে চরম অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে। তাদের মুদ্রার মূল্য কমেছে এবং দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। তবুও তেহরান প্রতিদিন দুই মিলিয়নের বেশি ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে, যা দিয়ে তারা প্রক্সি বাহিনী চালায়, জনগণকে দমন করে এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক কর্মসূচি এগিয়ে নেয়। যুক্তরাষ্ট্রের শক্তি ও শাসকগোষ্ঠীর টিকে থাকার এই অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে কারণ ওয়াশিংটন তা হতে দিচ্ছে। শাসকদের মনোবল ভাঙতে হলে কাগজে-কলমে জাহাজ তালিকাভুক্ত করা নয়, বাস্তবে ট্যাংকার জব্দ করা শুরু করতে হবে।

এর জন্য কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন নেই। যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখনই এই বহরকে অচল করার আইনি ক্ষমতা রয়েছে। দেওয়ানি বাজেয়াপ্তকরণ আইনের মাধ্যমে অবৈধ তেল ও পুরো ট্যাংকার জব্দ করা যায়। তেল পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদ হলেও বিশেষায়িত ট্যাংকার একটি কৌশলগত সম্পদ। নিষেধাজ্ঞা মানে জরিমানা, আর জব্দ মানে কার্যত সম্পত্তি দখল।
জাহাজগুলো কোথায় আছে, তা যুক্তরাষ্ট্র জানে। প্রয়োজন কেবল রাজনৈতিক সদিচ্ছা। শ্যাডো ফ্লিট ও রাস্তায় চলমান আন্দোলনের মধ্যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। প্রতিটি ট্যাংকার ভিড়লে তা শাসকগোষ্ঠীর জন্য জীবনরেখা। প্রতিটি ট্যাংকার জব্দ হলে তা বিরোধীদের জন্য বিজয়। ইরানে যারা জীবন ঝুঁকিতে রেখে লড়াই করছে, তাদের জন্য এসব জাহাজ জব্দ করা হবে বড় শক্তিবর্ধক। দেউলিয়া শাসনব্যবস্থা অনির্দিষ্টকাল ধরে ঘরোয়া আধাসামরিক বাহিনী বা বিদেশি শিয়া যোদ্ধাদের বেতন দিতে পারবে না। আয় বন্ধ হলে নিরাপত্তা বাহিনীর আনুগত্যও মিলিয়ে যাবে।
এই আন্দোলনকে সমর্থনের সুযোগ এখনো আছে, তবে তা চিরকাল থাকবে না। রাস্তাকে শক্তিশালী করতে প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ট্রাম্পের উচিত তেহরানের শ্যাডো ফ্লিট জব্দ করা। তাতেও যদি খামেনেয়ি নিরস্ত না হন, তবে ওয়াশিংটনের হাতে চাপ আরও বাড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
লেখক পরিচিতি: দুজনেই ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্র্যাসিজের ইরান–সংক্রান্ত গবেষক
সাঈদ ঘাসেমিনেজাদ ও বেহনাম বেন তালেবলু 

















