ইয়েমেন ইস্যু থেকে সরে আসার বিষয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যে রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমগত শৃঙ্খলা বজায় রাখা হয়েছে, তাতেই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে আমিরাতের প্রজ্ঞা। এই শৃঙ্খলা ও অবস্থান কোনো ক্ষণস্থায়ী বা পরিস্থিতিনির্ভর সিদ্ধান্ত নয়; বরং এর মধ্য দিয়ে সময় ও তাৎপর্যে গভীর, বহুস্তরবিশিষ্ট, যুক্তিবোধসম্পন্ন ও পরিশীলিত বার্তা দেওয়া হয়েছে।
ইয়েমেন সংকট মোকাবিলায় আমিরাতের শান্ত, প্রতিক্রিয়াহীন কৌশল গড়ে উঠেছে প্রজ্ঞা, সতর্কতা, বুদ্ধিমত্তা, স্থিতিশীলতা, রাজনৈতিক সমাধান এবং সন্ত্রাসবিরোধী অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে। সরাসরি সামরিক সম্পৃক্ততা থেকে সরে এসে রাজনৈতিক সমাধানে সহায়তা এবং মিত্রদের—বিশেষ করে সৌদি আরবের—প্রচেষ্টাকে সমর্থন করার দিকে এই কৌশল ঝুঁকেছে। একই সঙ্গে টেকসই নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার জন্য ইয়েমেনি ভাইদের মধ্যে সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার গুরুত্ব জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
ইয়েমেন সংকটে আমিরাতের এই দৃষ্টিভঙ্গি বহু তাৎপর্য বহন করে এবং স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন একাধিক বার্তা দেয়, যার ভিত্তি কৌশলগত দূরদৃষ্টি ও বাস্তবতা। এই অবস্থান দাঁড়িয়ে আছে যুক্তিবোধ, ধারাবাহিক সংলাপ, রাজনৈতিক ঐকমত্য, জনতুষ্টিবাদ পরিহার এবং গণমাধ্যমের অতিরিক্ত শোরগোল—বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেখা ভিড়-মানসিকতা—প্রতিরোধের ওপর। রাজনৈতিক ও সামরিক সিদ্ধান্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কক্ষগুলোতে তৈরি হয় না।

প্রধান প্রজ্ঞাময় বার্তা
এই বার্তাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—ইয়েমেন থেকে আমাদের বাহিনী প্রত্যাহারের ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রজ্ঞাকে পুনরায় নিশ্চিত করা। এর মাধ্যমে কোনো মিত্রের সঙ্গে বেপরোয়া ও অর্থহীন সংঘাতে জড়িয়ে পড়া এড়ানো হয়েছে। এতে সম্ভাব্য উত্তেজনার পথগুলো সম্পর্কে পরিণত উপলব্ধি এবং আবেগী প্রতিক্রিয়া বা একগুঁয়েমির চেয়ে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মনোভাব স্পষ্ট হয়।
ইয়েমেনে চলমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমিরাত যে প্রজ্ঞাময় পথ বেছে নিয়েছে—যা অন্যান্য সংকট ও চ্যালেঞ্জে তার আচরণের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ—তা ইয়েমেনের প্রতি দেশটির সামগ্রিক দর্শন ও নীতির অংশ। এই নীতির লক্ষ্য নিরাপত্তা, শান্তি, স্থিতিশীলতা, সংলাপ, পুনর্গঠন, প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়নে সহায়তা করা।
এই নীতি বাস্তবে প্রতিফলিত হয়েছে মুক্ত ইয়েমেনি শহরগুলোতে পরিচালিত উন্নয়ন ও মানবিক প্রকল্পে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা, পানি, অবকাঠামো ও অর্থনীতি—সব খাতে এসব প্রকল্পের মাধ্যমে আমিরাত স্থায়ী ও দৃশ্যমান ছাপ রেখে গেছে।
টেকসই উন্নয়নের প্রতি অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে গত নভেম্বর মাসে ইয়েমেনের জ্বালানি খাতে সহায়তার জন্য আমিরাত এক বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেয়। আমিরাতি কোম্পানিগুলোর বাস্তবায়িত প্রকল্পের ফলে ইয়েমেনের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে গুণগত অগ্রগতি হয়েছে। আদেন ও শাবওয়ার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আগামী বছরগুলোতে এক মিলিয়নেরও বেশি ঘরে পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য খাতে ধারাবাহিক সহায়তার মাধ্যমে নাগরিকদের দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে এবং বিনা মূল্যে বিস্তৃত চিকিৎসাসেবা প্রদান সম্ভব হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য
দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও যুবসমাজের গুরুত্বে দৃঢ় বিশ্বাস থেকে আমিরাত হুথিদের ধ্বংসযজ্ঞে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষাব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইয়েমেনের শিক্ষা খাতে চলমান ত্রাণ প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে আমিরাতের সহায়তায় বেশ কয়েকটি বিদ্যালয় উদ্বোধন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য জাতীয় পুনরুদ্ধার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অগ্রগতি নিশ্চিত করা।

এই প্রচেষ্টার স্বীকৃতি হিসেবে ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে মানবাধিকার পরিষদের ৫৭তম অধিবেশনের সমাপ্তিতে “মানবাধিকার ক্ষেত্রে ইয়েমেনকে কারিগরি সহায়তা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি” শীর্ষক একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়, যা আরব গ্রুপের পক্ষে সংযুক্ত আরব আমিরাত উপস্থাপন করেছিল।
শান্ততা ও দূরদর্শী কৌশলগত দৃষ্টি
এই প্রজ্ঞাময় কাঠামোর মধ্যেই, বিরোধের সূচনালগ্ন থেকে—যখন অপর মিত্র পক্ষ সংযম ও প্রজ্ঞা থেকে সরে জনতুষ্টিবাদের পথে হাঁটে—আমিরাত রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার অভাবের জবাব দিয়েছে শান্ততা ও দূরদর্শী কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে। প্রথমে একটি আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তথ্য স্পষ্ট করা হয়, এরপর নেওয়া হয় এমন এক সাহসী সিদ্ধান্ত, যা বিভেদের মূল উৎপাটন করে এবং আমিরাতের বিরুদ্ধে ছড়ানো মিথ্যা ও অপপ্রচার খণ্ডন করে।
আমিরাতের নীতির একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো এই উপলব্ধি যে, যেকোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রাথমিক উচ্ছ্বাসের পর আসে দায়ভার সম্পর্কে সচেতনতা—যেখানে জড়িয়ে থাকে বহু ও পরস্পরসংযুক্ত পথ, জটিল অধিকার এবং এক দশক ধরে কঠিন ইয়েমেন ইস্যুতে আরও গভীর সম্পৃক্ততা। এখানে সহজ কোনো পথ নেই। আন্তরিক কোনো মিত্রকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও গণমাধ্যমগতভাবে ব্যয়বহুল হবে এবং সংকট প্রশমনের বদলে আরও জটিল করে তুলবে।
একই সঙ্গে আমিরাত তার বিরুদ্ধে পরিচালিত তীব্র রাজনৈতিক অভিযানের মোকাবিলা করেছে উচ্চমাত্রার পেশাদারিত্বের সঙ্গে, তার বিস্তৃত ও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভর করে। এই নেটওয়ার্ক ভালোভাবেই জানে যে, আমিরাত উন্নয়ন, সংযম ও উদারতার ওপর দাঁড়ানো একটি সফল আরব ও মধ্যপ্রাচ্যীয় মডেল—যা আদর্শিক বাগাড়ম্বর, চরমপন্থা এবং গত কয়েক দশকে অঞ্চলে দেখা অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন ব্যর্থতা থেকে অনেক দূরে।
গণমাধ্যমের পরিণত আচরণ ও দৃঢ় অবস্থান
এই প্রেক্ষাপটে, ভিত্তিহীন গুজব, অস্পষ্ট বর্ণনা এবং আধুনিক প্রযুক্তির অনৈতিক ব্যবহারের মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তু তৈরির যে বেপরোয়া ও অনৈতিক প্রচারণা চালানো হয়েছে, তার মুখেও আমিরাতের গণমাধ্যমগত পরিণত আচরণ ও স্থির বক্তব্য প্রশংসার দাবি রাখে। এসব বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তু জনমতের সামনে খুব দ্রুতই তাদের শূন্যতা প্রকাশ করে। যেকোনো বিতর্কে নৈতিক উচ্চভূমিতে অবস্থান করা অত্যাবশ্যক—আর সেটিই আমিরাতের স্বাভাবিক অবস্থান।
অতিরিক্ত শত্রুতা নতুন নয়
উপসাগরীয় অঞ্চল ও এর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সংকট নতুন কিছু নয়, অতিরিক্ত শত্রুতাও সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। তবুও এই অঞ্চলই আমাদের ভৌগোলিক, ঐতিহাসিক ও সামাজিক পরিসর। সংকটগুলো ধীরে ধীরে প্রশমিত হয়ে সমাধানের পথে গেলে আমিরাতের দৃঢ়তা, যুক্তিবোধ ও প্রজ্ঞা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে যে, দেশটি কাদায় ডুবে যায়নি; বরং রাষ্ট্রচিন্তা, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের ভিত্তিতে দৃঢ় ভূমিতে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
আবদুল্লাহ রশিদ 


















