তাইওয়ানের রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা আর বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন বিরোধী দল কুওমিনতাংয়ের নতুন নেত্রী চেং লি-ওয়েন। এক সময়ের স্বাধীনতাপন্থী ছাত্রনেত্রী থেকে আজ চীনের সঙ্গে সমঝোতার বার্তা দেওয়া এই নেত্রীর রাজনৈতিক যাত্রা নিজেই ঝুঁকির গল্প। সামরিক মহড়া বাড়ানো চীনের প্রেক্ষাপটে যখন দ্বীপটিকে ঘিরে শঙ্কা তুঙ্গে, তখন তিনি প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ আটকে দিয়ে উল্টো বেইজিংয়ের সঙ্গে কথোপকথনের পথ খুলতে চাইছেন।
ঝুঁকির পথে নতুন নেতৃত্ব
চেং লি-ওয়েনের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে, তাইওয়ানের স্বাধীনতার দাবিতে ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। সে সময় তিনি কুওমিনতাংয়ের কড়া সমালোচক ছিলেন। পরে আচমকাই সেই দলেই যোগ দিয়ে সহকর্মীদের বিস্মিত করেন। আজ তিনি সেই দলের শীর্ষে। নতুন দায়িত্ব নিয়ে তিনি বলছেন, তার মেয়াদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো তাইওয়ান প্রণালিতে শান্তি এগিয়ে নেওয়া।
চীনের সঙ্গে সংলাপে ফেরার উদ্যোগ
দীর্ঘ নয় বছর পর কুওমিনতাং ও চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপ পুনরায় শুরু করার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। ফেব্রুয়ারির শুরুতেই দুই পক্ষের গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে মতবিনিময় দিয়ে এ উদ্যোগ শুরু হবে। চেং লি-ওয়েন আশা করছেন, চলতি বছরের প্রথমার্ধেই তিনি চীন সফরে গিয়ে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। তার ভাষায়, চীন সংশ্লিষ্ট সবকিছুকে ইচ্ছাকৃতভাবে খলনায়ক বানানো বন্ধ করতে হবে।

জনমত ও বাস্তবতার সংঘাত
এই অবস্থান তার দলেই সবাই মেনে নিচ্ছেন না। টানা তিনটি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হেরে যাওয়া কুওমিনতাংয়ের ভেতরেও শঙ্কা রয়েছে। জনমত জরিপ বলছে, তাইওয়ানের অধিকাংশ মানুষ চীনের সরকারের ওপর আস্থা রাখেন না এবং নিজেদের চীনা নয়, তাইওয়ানিজ পরিচয়েই দেখতে চান। যুক্তরাষ্ট্রও উদ্বিগ্ন, কারণ তারা দ্বীপটির আত্মরক্ষায় সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেও চাইছে তাইওয়ান নিজে আরও বেশি প্রতিরক্ষা ব্যয় করুক।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ও ভয়
চেং লি-ওয়েনের বক্তব্যে দুটি বড় ভয় কাজ করছে। একটি হলো, আগামী নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আবার জিতলে বেইজিং শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশা ছেড়ে দিতে পারে। অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন নিয়ে অনিশ্চয়তা। তার দাবি, প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে মার্কিন চাপ আর সেমিকন্ডাক্টর শিল্প সরানোর প্রস্তাব অনেক তাইওয়ানিজকে ভাবাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র বুঝি ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
প্রতিরক্ষা ব্যয় নিয়ে দ্বন্দ্ব
বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও সংসদে তা আটকে আছে। চেং লি-ওয়েনের মতে, প্রস্তাবিত ব্যয় দেশের অন্য প্রয়োজনকে চাপে ফেলবে। তিনি কতটা ব্যয় হওয়া উচিত তা নির্দিষ্ট না করলেও বলেন, চীনের সামরিক শক্তির সঙ্গে পাল্লা দেওয়া সম্ভব নয়। তাই যুক্তিসংগত প্রতিরক্ষা প্রস্তুতির পাশাপাশি আলোচনাই হওয়া উচিত নিরাপত্তার পথ।
ঐকমত্যের প্রশ্ন
তার যুক্তির কেন্দ্রবিন্দু এক হাজার নয়শ বিয়ানব্বই সালের সেই ঐকমত্য, যেখানে দুই পাড়ই এক চীনের অংশ বলে স্বীকার করলেও ব্যাখ্যার সুযোগ রাখা হয়েছিল। তার মতে, এই অবস্থানে ফিরলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি অনেক কমবে। ক্ষমতাসীন দল এই ধারণাকে ফাঁদ হিসেবে দেখলেও চেং লি-ওয়েন মনে করেন, আলোচনার দরজা খুলতেই হবে।
ভবিষ্যৎ লক্ষ্য কী
চীনের শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠকে তার প্রধান লক্ষ্য হবে শান্তি বজায় রাখার প্রকাশ্য অঙ্গীকার আদায় করা। যুদ্ধের পরিণতি যে ভয়াবহ হবে, তা দুপক্ষকেই মানতে হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন। দীর্ঘমেয়াদে একীকরণ হবে কি না, সে প্রশ্ন এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, তার চার বছরের মেয়াদেই শান্তির কাঠামো তৈরি করা বড় সাফল্য হবে।

বদলে যাওয়া রাজনীতির ছবি
এক সময়ের আন্দোলনকারী নেত্রী আজ সমঝোতার প্রতীক হয়ে উঠছেন। তিনি নিজেও স্বীকার করেন, জাতীয় পরিচয় নিয়ে তার অবস্থান জনমতের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তবু তার বিশ্বাস, আগামী রাজনীতিতে সবচেয়ে বড় নিয়ামক হবে প্রণালির দুই পাড়ের সম্পর্ক। স্থানীয় নির্বাচন থেকে শুরু করে ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বার্তাই কুওমিনতাংয়ের পথ নির্ধারণ করবে।
তাইওয়ান, চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের ত্রিমুখী সম্পর্কের সূক্ষ্ম ভারসাম্যে এই অবস্থান বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঝুঁকি যে বিশাল, তা সবারই জানা। তবু চেং লি-ওয়েন যেন সব ঝুঁকি নিয়েই খেলতে প্রস্তুত।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















