হাতে কালো চামড়ার ব্যাগ, কাঁধে আত্মবিশ্বাস—নিজেকে লোহার নারীর আদলে গড়ে তুলছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি সানায়ে। ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচারের মতোই তাঁর ব্যক্তিত্বে দৃঢ়তা আর প্রদর্শনীমূলক শৈলী। ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই তাঁর হাতে দেখা যাওয়া বিশেষ নকশার ব্যাগ ঘিরে দেশে আলাদা এক উন্মাদনা তৈরি হয়েছে। শতবর্ষী জাপানি প্রতিষ্ঠান সেই ব্যাগের চাহিদা সামাল দিতে অপেক্ষমাণ তালিকা চালু করেছে।

জনপ্রিয়তার উত্তাপ আর নির্বাচনী হিসাব
এই ব্যাগ–উন্মাদনা আসলে তাকাইচির জনপ্রিয়তারই প্রতীক। সেই আবেগকে ভোটে রূপ দিতে ফেব্রুয়ারির আট তারিখ আকস্মিক নিম্নকক্ষ নির্বাচন ডেকেছেন তিনি। তবে হিসাবটা সহজ নয়। জোটসঙ্গীসহ তাঁর দল সংসদে মাত্র এক আসনের ব্যবধানে এগিয়ে আছে। আগের নির্বাচনের পর থেকে দলটির জনপ্রিয়তায় বড় কোনো লাফও দেখা যায়নি। ফলে প্রশ্নটা এখন জনপ্রিয়তার বিস্তৃতি নয়, গভীরতা কতটা—সেটাই মুখ্য।
সানাকাতসু নামের ভক্তি
দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক মাসে জনসমর্থনের হার অনেক জরিপে সত্তর শতাংশের ওপরে ছিল। এই সংখ্যা জাপানের সাম্প্রতিক ইতিহাসে বিরল, একসময়কার সংস্কারপন্থী নেতার জনপ্রিয়তার স্মৃতি ফিরিয়ে আনে। সামাজিক মাধ্যমে তাকাইচিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে বিশেষ ভক্তি সংস্কৃতি, যাকে অনেকে সানাকাতসু নামে ডাকছেন। এই ভক্তির উৎস তাঁর কাজের চেয়েও তিনি কী প্রতিনিধিত্ব করেন, সেটির সঙ্গে বেশি জড়িত।

পরিবর্তনের প্রতীক
রক্ষণশীল মূল্যবোধে বিশ্বাসী হয়েও তাকাইচি অনেকের চোখে পরিবর্তনের নাম। জাপানের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হওয়াই তাঁর প্রতি মানুষের আলাদা টান তৈরি করেছে। নারীর পরিচয় তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি এনে দিয়েছে—এমন অনুভূতি প্রকাশ করেন তাঁর নিজ শহরের বাসিন্দারাও। যদিও কিছু সামাজিক ইস্যুতে তাঁর অবস্থান নারীবাদীদের একাংশকে ক্ষুব্ধ করেছে, তবু নারীদের স্বাস্থ্য আর পরিচর্যার অসম বোঝা নিয়ে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে এনেছেন বাস্তব অভিজ্ঞতা। স্ট্রোকের পর হুইলচেয়ারে থাকা স্বামীর প্রধান দেখভাল নিজে করায় বয়স্ক সমাজের বহু মানুষ নিজেদের গল্প খুঁজে পান তাঁর জীবনে।
মঞ্চের আলোয় আলাদা উপস্থিতি
সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক ও একসময়কার ভারী ধাতব সঙ্গীতের ড্রামার তাকাইচির মধ্যে আছে আলাদা মঞ্চমুখী ঔজ্জ্বল্য। সাম্প্রতিক এক সম্মেলনে তিনি প্রতিবেশী দেশের নেতার সঙ্গে ড্রামে সুর তুলেছেন জনপ্রিয় অ্যানিমেশনের গানে। বইপড়া ধাঁচের আগের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এই দৃশ্যের ফারাক স্পষ্ট।
দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকার চেষ্টা
দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা দলের অস্বচ্ছ অর্থায়ন আর গোপন সমঝোতায় বিরক্ত ভোটারদের কাছে তাকাইচি নিজেকে আলাদা করে তুলেছেন। পারিবারিক উত্তরাধিকার নয়, নিচ থেকে উঠে আসা নেতা হিসেবে তাঁর গল্প অনেকের মন ছুঁয়েছে। বিলাসী নৈশভোজ এড়িয়ে ভোরে অফিসে এসে কাজ শুরু করার অভ্যাস আর বারবার উচ্চারিত কাজ করার অঙ্গীকার তাঁকে ভিন্ন রকম ভাবমূর্তি দিয়েছে।
আকস্মিক নির্বাচনের ঝুঁকি
তবে হঠাৎ নির্বাচন ডেকে সেই ভিন্নতার দাবিই প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনেক জাপানি মনে করছেন, এটি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার চেনা কৌশল। ঘোষণার পর একাধিক জরিপে তাঁর প্রশাসনের সমর্থন কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। এই ওঠানামা দেখাচ্ছে, ভক্তি কতটা স্থায়ী আর কতটা ক্ষণস্থায়ী। ভোটের দিনে যদি দল হোঁচট খায়, দায়টা শেষ পর্যন্ত তাকাইচির কাঁধেই পড়বে—ব্যাগ হাতে তাকেই দাঁড়াতে হবে ফলাফলের সামনে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















