ভারতে নিরাপদ পানির সংকট বহুদিনের। নলকূপ বা কলের পানি পানযোগ্য নয়—এ বাস্তবতায় বোতলজাত পানির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এই প্রয়োজন ধীরে ধীরে রূপ নিচ্ছে বিলাস ও সুস্থতার প্রতীকে। ধনী ও উচ্চবিত্তদের মধ্যে ‘প্রিমিয়াম মিনারেল পানি’ এখন নতুন স্ট্যাটাস সিম্বল।
ভারতে পানযোগ্য পানির বাস্তবতা
একশো চল্লিশ কোটির বেশি মানুষের দেশে পরিষ্কার পানি এখনও সবার নাগালে নয়। গবেষকদের মতে, দেশের প্রায় সত্তর শতাংশ ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত। অধিকাংশ শহরে কলের পানি পানযোগ্য নয়। গত ডিসেম্বরে ইন্দোর শহরে দূষিত কলের পানি পান করে ষোলো জনের মৃত্যু হয়। ফলে বোতলজাত পানির চাহিদা নিত্যপ্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে।
বোতলজাত পানির বাজার ও প্রবৃদ্ধি

ভারত বর্তমানে বিশ্বের দ্রুত বর্ধনশীল বোতলজাত পানির বাজারগুলোর একটি। বছরে প্রায় পাঁচ বিলিয়ন ডলারের এই বাজারের প্রবৃদ্ধি হার প্রায় চব্বিশ শতাংশ। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনে বোতলজাত পানির বাজার বিশাল হলেও সেখানে বার্ষিক প্রবৃদ্ধি মাত্র চার থেকে পাঁচ শতাংশ।
প্রিমিয়াম পানির উত্থান
সাধারণ বোতলজাত পানির পাশাপাশি প্রিমিয়াম পানির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ২০২১ সালে যেখানে এই খাতের অংশ ছিল মাত্র এক শতাংশ, সেখানে গত বছর তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে আট শতাংশে। প্রিমিয়াম ভারতীয় মিনারেল পানির দাম এক লিটার বোতলে প্রায় এক ডলার, আর আমদানিকৃত পানির দাম তিন ডলারেরও বেশি—যা সাধারণ পানির তুলনায় প্রায় পনেরো গুণ।
ওয়েলনেস ট্রেন্ড ও স্বাস্থ্য সচেতনতা
বিশেষজ্ঞদের মতে, শহরাঞ্চলে পৌরসভার পানির ওপর অনাস্থা এবং সুস্থতার প্রতি আগ্রহ বাড়ায় মিনারেল পানির কদর বেড়েছে। অনেক বাড়িতে পানি পরিশোধক থাকলেও সেগুলো পানির প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানও সরিয়ে ফেলে। ফলে ধনী পরিবারগুলো খনিজসমৃদ্ধ প্রিমিয়াম পানির দিকে ঝুঁকছে।

ভোক্তাদের অভিজ্ঞতা
নয়াদিল্লির রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী বি এস বাত্রা জানান, তার পরিবার শুধু প্রিমিয়াম পানি ব্যবহার করে। তার মতে, এতে শরীর বেশি চনমনে থাকে এবং স্বাস্থ্যের জন্যও ভালো। এমনকি বাসায় হুইস্কি বা স্মুদি তৈরিতেও তারা মিনারেল পানি ব্যবহার করেন।
তারকাদের আগ্রহ ও করপোরেট বিনিয়োগ
এই বাজারে আগ্রহ দেখাচ্ছেন বলিউড তারকারাও। অভিনেত্রী ভূমি পেডনেকার ও তার বোন যৌথভাবে মিনারেল পানির ব্র্যান্ড চালু করেছেন। বড় করপোরেট গোষ্ঠীও পিছিয়ে নেই। টাটা গ্রুপ তাদের প্রিমিয়াম পানির পরিসর বাড়াচ্ছে এবং প্রাকৃতিক পানির নতুন উৎস খুঁজছে। প্রতিষ্ঠানটির মতে, ধনী ও স্বাস্থ্যসচেতন ভোক্তারা দামের কথা না ভেবেই এই পানি কিনছেন।
উৎপাদন ও নতুন পরিকল্পনা

টাটার ‘হিমালয়ান’ মিনারেল পানির কারখানা হিমাচল প্রদেশের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থিত। প্রাকৃতিক ভূগর্ভস্থ জলাধার থেকে সংগৃহীত পানি আধুনিক যন্ত্রের মাধ্যমে বোতলজাত করা হয়। ভবিষ্যতে তারা স্পার্কলিং পানিও বাজারে আনতে চায়।
খুচরা বাজারের অভিজ্ঞতা
ভারতের কিছু গুরমে খাদ্যপণ্যের দোকানে প্রিমিয়াম পানির বিক্রি ২০২৫ সালে তিন গুণ বেড়েছে। উচ্চমূল্যের বিদেশি পানিও দ্রুত বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, যদিও দাম অনেকের কাছে দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য ব্যয়বহুল।
দাম ও সীমাবদ্ধতা
আমদানিকৃত পানির ওপর ত্রিশ শতাংশের বেশি কর থাকায় সেগুলোর দাম বেশি। তবু নির্দিষ্ট এক শ্রেণির ক্রেতার কাছে এসব পানি বিশেষ আকর্ষণ। তবে অনেকেই স্বীকার করছেন, প্রতিদিনের ব্যবহারে এই পানি পকেটের ওপর বড় চাপ সৃষ্টি করে।
ভারতে যেখানে নিরাপদ পানি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, সেখানে প্রিমিয়াম মিনারেল পানি ধনীদের কাছে বিলাস ও সুস্থতার প্রতীক হয়ে উঠেছে। এটি একদিকে ক্রমবর্ধমান বাজার, অন্যদিকে দেশের পানিসংকটের বৈষম্যকেও স্পষ্ট করে তুলছে।




সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















