আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের তথ্যমতে, ২০২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি কমে দাঁড়িয়েছে ৩.৭ শতাংশে। এর পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির জন্য বড় চাপ হয়ে উঠেছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং কিছু সময়ে তা আরও বাড়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাম্প্রতিক অবস্থা
আইএমএফ জানায়, ২০২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ছিল ৫.৮ শতাংশ, যা ২০২৪ অর্থবছরে কমে ৪.২ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫ অর্থবছরে সেই প্রবৃদ্ধি আরও কমে ৩.৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। জনপ্রিয় গণঅভ্যুত্থানের সময় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া, নীতিগত কড়াকড়ি এবং বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এই নিম্নমুখী প্রবণতার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

মূল্যস্ফীতি ও অর্থপ্রবাহের চাপ
২০২৫ অর্থবছরের শুরুতে দুই অঙ্কের কাছাকাছি থাকা মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও এখনও তা উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। অক্টোবর মাসে বার্ষিক হিসাবে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২ শতাংশ। আইএমএফের হিসাবে, ২০২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ৮.৯ শতাংশে পৌঁছাতে পারে এবং কিছু সময়ের জন্য এর চেয়েও বেশি চাপ তৈরি হতে পারে। এতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিতে অর্থপ্রবাহের ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে।
রাজস্ব আদায় ও বাজেট পরিস্থিতি
আইএমএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ অর্থবছরে কর রাজস্ব আদায় উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। কর-জিডিপি অনুপাত দ্রুত কমে যাওয়ায় সরকারের রাজস্বভিত্তি সংকুচিত হয়েছে। তবে উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় প্রত্যাশার তুলনায় কম হওয়ায় সামগ্রিক বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে।

বৈদেশিক খাত ও রিজার্ভ
চলতি হিসাবের ভারসাম্যে উন্নতি আসায় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আইএমএফের মতে, বিনিময় হার ব্যবস্থায় ধারাবাহিক সংস্কার এবং কঠোর মুদ্রানীতি বজায় থাকলে এই রিজার্ভ পরিস্থিতি আরও শক্তিশালী হতে পারে।
মধ্যমেয়াদি পূর্বাভাস
সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে ২০২৬ ও ২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ৪.৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। পরবর্তী সময়ে মধ্যমেয়াদে এই প্রবৃদ্ধি প্রায় ৬ শতাংশের কাছাকাছি যেতে পারে। একই সঙ্গে ২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি কমে প্রায় ৬ শতাংশে নামার সম্ভাবনাও দেখানো হয়েছে।

ঝুঁকি ও সতর্কতা
তবে আইএমএফ সতর্ক করে বলেছে, নীতি বাস্তবায়নে বিলম্ব, বিনিময় হার সংস্কারে পিছিয়ে যাওয়া এবং আর্থিক শৃঙ্খলা দুর্বল হলে এই পূর্বাভাস বাস্তবায়ন ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা ও রাজস্ব সংগ্রহের সীমাবদ্ধতা দ্রুত সমাধান না হলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।
নীতিগত করণীয়
আইএমএফের মতে, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কর সংস্কার, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, কঠোর মুদ্রানীতি এবং কাঠামোগত সংস্কার জরুরি। পাশাপাশি সুশাসন জোরদার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রপ্তানি বৈচিত্র্য বাড়াতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরও শক্ত হবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















