ইউএনবি
দেয়ালের এজুড়ে ফাটল, ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি চুইয়ে পড়া এবং জায়গায় জায়গায় পলেস্তারা খসে পড়া—এসবই এখন সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতালের দৈনন্দিন বাস্তবতা। এতে রোগীদের নিরাপত্তা ও চিকিৎসার মান নিয়ে ক্রমেই উদ্বেগ বাড়ছে।
১৩৫ বছরের পুরোনো এই হাসপাতালটি বাংলাদেশে সরকারের অধীনে থাকা মাত্র তিনটি বিশেষায়িত কুষ্ঠ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের একটি। বর্তমানে হাসপাতালটির অবস্থা চোখে পড়ার মতো জরাজীর্ণ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দরজাবিহীন টয়লেট, অপরিচ্ছন্ন বাথরুম ও নষ্ট চিকিৎসা সরঞ্জামের কারণে রোগী ও কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেরই আশঙ্কা, এই ভবনের ভেতরে চিকিৎসা নেওয়া দিন দিন আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

১৮৯০ সালে প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালটি ৪ দশমিক ৭২ একর জমির ওপর অবস্থিত। এর অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা ৮০ হলেও বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য রয়েছে মাত্র ৪৮টি।
হাসপাতালের নথি অনুযায়ী, চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনটি ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন ১৯ জন রোগী। প্রতিদিন বহির্বিভাগে গড়ে ১৫ থেকে ২০ জন রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন।
সাম্প্রতিক এক পরিদর্শনে দেখা গেছে, তিনটি রোগী টয়লেটের কোনো দরজা নেই, ওয়ার্ডের টেলিভিশনগুলো নষ্ট, আর ভবনের বিভিন্ন অংশে স্পষ্ট ফাটল।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা মো. মনিরুল ইসলাম জানান, বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষায়, বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি ঢুকে পড়ে, এতে রোগী ও কর্মী—দু’পক্ষই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিলেট অঞ্চলে শনাক্ত কুষ্ঠ রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০২০ সালে ছিল ২০ জন, ২০২১ সালে ৩৭ জন, ২০২২ সালে ৩৫ জন, ২০২৩ সালে ৭৯ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে এখন পর্যন্ত ৫৮ জন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।
চিকিৎসকদের মতে, কুষ্ঠ রোগ সামান্য সংক্রামক এবং হাঁচি-কাশির মাধ্যমে জীবাণু ছড়ায়। এর প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবে ত্বকে হালকা বা লালচে দাগ দেখা যায়, যেগুলোতে চুল গজায় না, ঘাম হয় না এবং চুলকানিও থাকে না। এছাড়া মুখ, গলা, বুক বা পিঠে ব্যথাহীন গাঁট, কানের লতি ফুলে যাওয়া এবং হাত-পা বা চোখে অনুভূতি কমে যাওয়াও সতর্ক সংকেত।
সিলেটের উপসিভিল সার্জন জনমেজয় দত্ত বলেন, শনাক্ত রোগীর সংখ্যা বাড়লেও তা রোগের বিস্তার বেড়ে যাওয়ার প্রমাণ নয়। আগে অনেক রোগী শনাক্তই হতেন না, এখন সচেতনতা বেড়েছে এবং মানুষ চিকিৎসার জন্য এগিয়ে আসছে।
তিনি জানান, স্বাস্থ্য বিভাগ ২০৩০ সালের মধ্যে কুষ্ঠ রোগ নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলো একসঙ্গে কাজ করছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি, ভবনটির অবনতি বহু দশক ধরেই চলছে। মনিরুল ইসলাম বলেন, ১৯৬৩ সালে মূল ভবনের ওপর একতলা যুক্ত করা হয় এবং পরে ধীরে ধীরে তিনতলা ভবন নির্মাণ করা হয়। ভবনটি অত্যন্ত পুরোনো ও নাজুক অবস্থায় রয়েছে। একাধিকবার কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কর্মীদের উদ্বেগের প্রতিধ্বনি শোনা যায় রোগীদের কণ্ঠেও। হাসপাতালের প্রধান সহকারী সাব্বির আহমেদ বলেন, ভবনটি খুবই বিপজ্জনক, যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বর্ষাকালে দেয়াল থেকে প্রায়ই পলেস্তারা খসে পড়ে।
৭০ বছর বয়সী এক রোগী, যিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি, বলেন, তাঁর হাতের অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে এবং হাসপাতালের ভেতরে উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাঁকে সব পরীক্ষা বাইরে করাতে হয়েছে।
আরেকজন ৬৫ বছর বয়সী রোগী, যিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে ভর্তি আছেন, জানান, চিকিৎসক দিনে মাত্র একবার আসেন। ভবনের ভেতরে থাকা খুবই ভয়ংকর মনে হয়, যেকোনো সময় কিছু পড়ে যেতে পারে।
বহির্বিভাগের রোগী আখতার হোসেন বলেন, চিকিৎসার অপেক্ষায় থাকা রোগীরা সব সময় ছাদ থেকে কিছু পড়ে যাওয়ার আশঙ্কায় থাকেন।
এদিকে হাসপাতালটি তীব্র জনবল সংকটেও ভুগছে। অনুমোদিত ৫০ জনের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২৯ জন। কুষ্ঠ রোগীদের জন্য বিশেষ জুতা তৈরির একটি পদ ২০২১ সাল থেকেই শূন্য রয়েছে।

একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী জানান, আগে ছয়জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী দিয়েও কাজ সামলানো কঠিন ছিল, এখন মাত্র চারজন কাজ করছেন।
আরেকজন কর্মী বলেন, জনবলের অভাবে রোগীদের সব ধরনের পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে এবং অধিকাংশ চিকিৎসা সরঞ্জামই ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
জুনিয়র কনসালটেন্ট ডা. নাহিদ রহমান বলেন, সিলেট কুষ্ঠ হাসপাতাল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কুষ্ঠ চিকিৎসা কেন্দ্র হলেও এর অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















