গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন গাজা শান্তি পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ শুরুর ঘোষণা দেয়, যা জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ গত নভেম্বরেই অনুমোদন করেছিল। গত বছরের অক্টোবরে কার্যকর হওয়া প্রথম ধাপে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠিত হয়। এর মাধ্যমে জীবিত ও নিহত সব জিম্মির প্রত্যাবর্তন, প্রায় দুই হাজার ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি এবং মানবিক সহায়তা পুনরায় চালু হয়। দ্বিতীয় ধাপে একটি টেকনোক্র্যাটিক ফিলিস্তিনি শাসনব্যবস্থা গঠন, আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী মোতায়েন, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, গাজার পুনর্গঠন এবং ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রত্যাহারের নির্দেশনা রয়েছে। এই ধাপের সাফল্য সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করছে হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি হয় কি না তার ওপর। নিরস্ত্রীকরণ হলে পুনর্গঠন ও ইসরায়েলি প্রত্যাহার সম্ভব হবে, আর তা না হলে কোনোটিই হবে না। মূল প্রশ্নটি হলো, বহু বছর ধরে সন্ত্রাস ও যুদ্ধ সৃষ্টি করা পরিস্থিতি কি সত্যিই ভেঙে ফেলা সম্ভব।
বর্তমানে কার্যত দুটি গাজা রয়েছে, যেগুলোকে একীভূত না করলে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। ইসরায়েল নিয়ন্ত্রণ করছে তথাকথিত সবুজ অঞ্চল, যা মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৫৩ শতাংশ এবং মূলত পূর্ব অংশে অবস্থিত। হামাস নিয়ন্ত্রণ করছে লাল অঞ্চল, অবশিষ্ট ৪৭ শতাংশ, যা প্রধানত পশ্চিম অংশে। অক্টোবরে দেওয়া এক বিবৃতিতে হামাস আনুষ্ঠানিকভাবে গাজার প্রশাসন স্বাধীন টেকনোক্র্যাটদের নিয়ে গঠিত একটি ফিলিস্তিনি সংস্থার হাতে তুলে দিতে সম্মত হয়। কিন্তু তারা অস্ত্র নামিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার পথ ছেড়ে দেবে কি না, সে বিষয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে। এই লক্ষ্য অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে একাধিক পক্ষকে তাদের প্রভাব ও চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বিশেষ করে তিনটি দেশ—মিসর, কাতার ও তুরস্ককে—স্পষ্ট করে জানাতে হবে যে, তাদের দায়িত্ব হামাসের নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা। অন্যথায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই তিন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানই ট্রাম্পের শান্তি বোর্ডে যুক্ত হয়েছেন এবং তার গাজা শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন দিয়েছেন। হামাসের অর্থায়ন, বৈধতা, রাজনৈতিক অবস্থান এবং অভ্যন্তরীণ ঐক্যের ওপর এই দেশগুলোর প্রভাব রয়েছে। সম্মিলিতভাবে তারা হামাসকে অস্ত্র ত্যাগে চাপ দিতে পারে। তারা প্রকাশ্যে পুনর্গঠনে বাধা দেওয়ার জন্য হামাসকে দোষারোপ করতে পারে এবং তাদের নেতাদের নিজ নিজ দেশে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ বন্ধ করার হুমকি দিতে পারে।
যদি নিরস্ত্রীকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়, তবে ট্রাম্পের শান্তি পরিকল্পনা, যার মধ্যে ফিলিস্তিনি আত্মনিয়ন্ত্রণ ও রাষ্ট্র গঠনের পথ রয়েছে, তা আর কেবল উচ্চাকাঙ্ক্ষী ধারণা নয়, বরং বাস্তবসম্মত লক্ষ্য হিসেবে দেখা যাবে। আজ তা অবাস্তব মনে হলেও, দ্বিতীয় ধাপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ইসরায়েলি ও ফিলিস্তিনি উভয়ের মানসিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় বড় পরিবর্তন আসবে।
এর বিপরীতে, হামাস যদি নিরস্ত্রীকরণে অস্বীকৃতি জানায় এবং গাজা একীভূত না হয়, তবে ভবিষ্যৎ অত্যন্ত অন্ধকার। তখন গাজা বিভক্তই থেকে যাবে—কোথাও হামাসের দমননীতি, কোথাও ইসরায়েলি দখলদারত্ব। আর সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতিতে অঞ্চলটি আবারও যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হবে।
লাল অঞ্চলের বাস্তবতা

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাব ২৮০৩ অনুযায়ী, আগামী দুই বছরের জন্য গাজার শাসনব্যবস্থার একচ্ছত্র দায়িত্ব শান্তি বোর্ডের হাতে থাকবে, প্রয়োজনে যার মেয়াদ বাড়ানো যেতে পারে। বোর্ডের নির্বাহী কমিটি ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে গাজার প্রশাসনের জন্য গঠিত জাতীয় কমিটির সঙ্গে, যেখানে ১৫ জন ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাট রয়েছেন। এই কমিটি সবুজ ও লাল উভয় অঞ্চলের দৈনন্দিন প্রশাসন পরিচালনা করবে। মিসর ও জর্ডানে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি পুলিশ বাহিনীকে সহায়তা করবে আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী, যারা আইনশৃঙ্খলার দায়িত্ব নেবে। তবে এই বাহিনীর চূড়ান্ত ম্যান্ডেট ও অংশগ্রহণকারী দেশের সংখ্যা এখনো নির্ধারিত হয়নি।
দ্বিতীয় ধাপের ভাগ্য নির্ভর করছে হামাস-নিয়ন্ত্রিত লাল অঞ্চলে কী ঘটে তার ওপর। কারণ গাজার জনসংখ্যার ৯৫ শতাংশের বেশি এবং অধিকাংশ শহর এই এলাকায় অবস্থিত, রাফাহ ব্যতীত। গাজা থেকে আসা জাতীয় কমিটির সদস্যরা বলেছেন, তাদের লক্ষ্য পুরো গাজায় স্থিতিশীলতা ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন আনা। লাল অঞ্চল উপেক্ষা করলে তারা নিজেদের কর্তৃত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হবেন।
তবে লাল অঞ্চলে কাজ করতে হলে জাতীয় কমিটির নিরাপত্তা প্রয়োজন, আর তা সম্ভব নয় যদি হামাস নিরস্ত্রীকরণে রাজি না হয় এবং আন্তর্জাতিক বাহিনীর সহায়তাপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনি পুলিশ নির্বিঘ্নে কাজ করতে না পারে। অক্টোবরে হামাস শান্তি পরিকল্পনাকে সমর্থন করলেও তারা স্পষ্টভাবে অস্ত্র ত্যাগের অঙ্গীকার করেনি। তারা বলেছিল, কিছু বিষয় পরবর্তীতে একটি বিস্তৃত ফিলিস্তিনি জাতীয় কাঠামোর মধ্যে আলোচনা হবে। কিন্তু পরিকল্পনার ত্রয়োদশ দফা স্পষ্ট করে জানায়, সব সামরিক ও সন্ত্রাসী অবকাঠামো, সুড়ঙ্গ ও অস্ত্র উৎপাদন কেন্দ্র ধ্বংস করা হবে এবং পুনর্নির্মাণ করা যাবে না। অর্থাৎ নিরস্ত্রীকরণ ও সামরিক ক্ষমতা বিলোপ অপরিহার্য।

হামাস প্রশাসনিক ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হওয়ায়, তাত্ত্বিকভাবে তারা গাজার পুনর্গঠনের বিরোধিতা করতে পারে না। তবুও আশঙ্কা রয়ে গেছে যে তারা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়বে না, জাতীয় কমিটিও পূর্ণ কর্তৃত্ব পাবে না, এবং দুই পক্ষের অস্বস্তিকর সহাবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস দেখিয়েছে, যাদের হাতে অস্ত্র থাকে, সিদ্ধান্তের ক্ষমতাও শেষ পর্যন্ত তাদের হাতেই থাকে।
উপায়ের প্রশ্ন
হামাস নিরস্ত্রীকরণ না করলে ইসরায়েল গাজার পরিধিতে সরে যাবে না বা পুনর্গঠনের অনুমতি দেবে না। ইসরায়েলিদের আশঙ্কা, হামাস সিমেন্ট, তার ও স্টিল ব্যবহার করে সুড়ঙ্গ পুনর্নির্মাণ করবে। পাশাপাশি সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত স্পষ্ট জানিয়েছে, হামাস নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া তারা পুনর্গঠনে বিনিয়োগ করবে না।
জানুয়ারিতে এক মন্ত্রিসভা বৈঠকে ট্রাম্প আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, হামাস সম্ভবত নিরস্ত্রীকরণ করবে। তার দূত স্টিভ উইটকফও বলেন, তাদের আর বিকল্প নেই। কাতার ও তুরস্ক নাকি ওয়াশিংটনকে জানিয়েছে, হামাস অস্ত্র প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া শুরু করবে।
কিন্তু ইসরায়েলি কর্মকর্তারা এতটা আশাবাদী নন। তারা মনে করেন, হামাস আদর্শগতভাবেই ইসরায়েলের অস্তিত্ব অস্বীকার করে। জানুয়ারির শেষদিকে আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হামাস নেতা মুসা আবু মারজুক বলেন, নিরস্ত্রীকরণের কোনো সম্মতি হয়নি এবং অস্ত্র সমর্পণের প্রশ্নই ওঠেনি।
কয়েক সপ্তাহ আগে মার-আ-লাগোতে নেতানিয়াহুর পাশে দাঁড়িয়ে ট্রাম্প সতর্ক করে বলেন, হামাস নিরস্ত্রীকরণ না করলে তাদের জন্য পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে। তিনি সময়সীমা নির্ধারণের হুমকিও দিয়েছেন। সেই সময়সীমা পেরিয়ে গেলে ইসরায়েল সামরিক পদক্ষেপের সবুজ সংকেত পাবে।

সমন্বিত চাপের প্রয়োজন
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল হামাস নিরস্ত্রীকরণে একমত হলেও পদ্ধতি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ট্রাম্প বিষয়টি শান্তিপূর্ণভাবে পরীক্ষা করতে চান, নেতানিয়াহু তা নিয়ে সন্দিহান। ট্রাম্প যদি সময়সীমা ঘোষণা করেন, তবে তা স্পষ্ট করবে যে ওয়াশিংটনের ধৈর্যেরও সীমা আছে।
এই কৌশল সফল করতে যুক্তরাষ্ট্রকে মিসর, কাতার ও তুরস্কের ওপর চাপ বাড়াতে হবে। এই দেশগুলোর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ রয়েছে। তারা হামাসের ওপর বাস্তব চাপ প্রয়োগ করতে পারে—রাফাহ সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক হিসাব বন্ধ, আশ্রয় প্রত্যাহারসহ নানা উপায়ে। তারা হামাসকে বুঝিয়ে দিতে পারে যে নিরস্ত্রীকরণ না হলে দায় তাদের নেতৃত্বেরই।
নিরস্ত্রীকরণ শুরু হওয়া উচিত ইসরায়েলের জন্য সরাসরি হুমকি সৃষ্টি করা ভারী অস্ত্র দিয়ে—রকেট, মর্টার, ট্যাংকবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র, মেশিনগান ও রকেটচালিত গ্রেনেড। এমনকি একে-৪৭ রাইফেলও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে হামাস গাজার জনগণের ওপর জোরজবরদস্তি চালিয়ে যেতে না পারে।

সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে
হামাস যদি নিরস্ত্রীকরণে অগ্রগতি দেখায়, তবে ইসরায়েলকেও পর্যায়ক্রমে বাহিনী প্রত্যাহার করতে হবে এবং পুনর্গঠনের অনুমতি দিতে হবে। নেতানিয়াহুর জন্য এটি রাজনৈতিকভাবে কঠিন হলেও ট্রাম্পের চাপ উপেক্ষা করা তার পক্ষে সহজ নয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হলো, কার জন্য সময় বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল স্পষ্ট করেছে, স্বেচ্ছা নিরস্ত্রীকরণ ব্যর্থ হলে সামরিক অভিযান আসবে। মার্চ মাসকে সিদ্ধান্তের সময় হিসেবে দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ মিসর, কাতার ও তুরস্কের হাতে সময় খুবই সীমিত।
চাপ প্রয়োগ না করলে কৌশলগত সুবিধা নষ্ট হয়ে যায়। আসন্ন সপ্তাহগুলোই নির্ধারণ করবে, কূটনীতি হামাসের নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে যুদ্ধ এড়াতে পারে কি না এবং গাজায় রূপান্তরের সূচনা ঘটাতে পারে কি না। যদি ট্রাম্প চান শান্তি বোর্ড ভবিষ্যতে অন্য সংঘাতেও ভূমিকা রাখুক, তবে তাকে আগে গাজায় সাফল্য প্রমাণ করতে হবে।
ডেনিস রস ও ডেভিড মাকোভস্কি 



















