বিশ্বজুড়ে থাকা ভারতীয় প্রবাসীদের উদ্দেশে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে ভারতের বাজেট দুই হাজার ছাব্বিশ। দেশের শেয়ারবাজারে প্রবাসী ভারতীয়দের অংশগ্রহণ বাড়াতে বিনিয়োগের সীমা শিথিল করা হয়েছে, নিয়ম সহজ করা হয়েছে এবং সীমান্ত পেরোনো অর্থপ্রবাহে জটিলতা কমানোর ঘোষণা এসেছে। বৈদেশিক প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ যখন সতর্ক অবস্থানে, তখন প্রবাসীদের অর্থকেই দীর্ঘমেয়াদি পুঁজির ভরসা হিসেবে দেখছে দিল্লি।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের পেশ করা বাজেটে বলা হয়েছে, এখন প্রবাসী ভারতীয়দের জন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠানে বড় অংশীদারি নেওয়া সহজ হবে। শেয়ারবাজারের মাধ্যমে আরও নমনীয়ভাবে বিনিয়োগ করা যাবে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত দীর্ঘমেয়াদি সম্পদ গঠনের সুযোগ বাড়বে।
বিনিয়োগ সীমা বাড়ল
এই বাজেটের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত হলো দেশের বাইরে বসবাসকারী ব্যক্তিদের জন্য তালিকাভুক্ত ভারতীয় কোম্পানিতে ব্যক্তিগত বিনিয়োগ সীমা দ্বিগুণ করা। আগে যেখানে এই সীমা ছিল মোট শেয়ারের পাঁচ শতাংশ, এখন তা বাড়িয়ে করা হয়েছে দশ শতাংশ। একই সঙ্গে এই শ্রেণির বিনিয়োগকারীদের জন্য মোট বিদেশি মালিকানার সীমা দশ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে চব্বিশ শতাংশে নেওয়া হয়েছে।

এর ফলে প্রবাসী ভারতীয়রা এখন আর সহজে নিয়ন্ত্রক বাধায় আটকে পড়বেন না। সাধারণ প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের জন্য পছন্দের পরিধি বাড়বে এবং বড় অঙ্কের বিনিয়োগকারীরা দেশের শীর্ষ কোম্পানিতে অর্থবহ মালিকানা নিতে পারবেন। বাজারসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে ভারতের শেয়ারবাজার বৈশ্বিক মানের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ হবে এবং বাজারে তারল্য বাড়বে।
পোর্টফোলিও ব্যবস্থায় গতি
বাজেটে পোর্টফোলিও বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কথাও বলা হয়েছে। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রবাসীরা অনুমোদিত ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে ভারতীয় শেয়ার কেনাবেচা করতে পারেন। সময়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ভারতীয় শেয়ারবাজার থেকে বড় অঙ্কের অর্থ তুলে নিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ বাড়লে অস্থির প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের জায়গায় অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল ও ধৈর্যশীল পুঁজি আসবে। মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপে থাকা ভারতীয় প্রবাসীরা দীর্ঘমেয়াদে বাজারকে সহায়তা করতে পারেন।

নিয়ম সহজ করার প্রতিশ্রুতি
বাজেটে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা আইনের অধীনে অঋণভিত্তিক বিনিয়োগ ও বিদেশে বিনিয়োগ সংক্রান্ত নিয়ম সহজ করার ঘোষণা এসেছে। সরকারের লক্ষ্য নিয়ন্ত্রণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সরে এসে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা। এর ফলে প্রবাসীরা দ্রুত অনুমোদন, কম কাগজপত্র এবং সহজ অর্থ প্রত্যাবাসনের সুবিধা পাবেন।
বিশেষ করে নতুন উদ্যোগ, তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানি ও বিকল্প সম্পদে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে অনিশ্চয়তা ছিল, তা কমবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, স্পষ্ট ও স্থিতিশীল নিয়ম বিনিয়োগকে আরও টেকসই করে।
গিফট সিটির গুরুত্ব
বাজেটে গুজরাটের আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রযুক্তি নগরীকে বৈশ্বিক আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকারও পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে। কর সুবিধা, আন্তর্জাতিক মানের বিধিনিষেধ এবং সহজ সীমান্ত পারাপারের কাঠামোর কারণে এই নগরী প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। এতে তাঁরা আন্তর্জাতিক আর্থিক পণ্য ব্যবহার করেও ভারতের বাজারের সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারবেন।

বাজারে প্রভাব
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংস্কারের ফলে ভারতীয় শেয়ারবাজারে বিদেশি অংশগ্রহণের ধরণ বদলাতে পারে। বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি ব্যক্তিগত প্রবাসী বিনিয়োগকারীর সংখ্যা বাড়লে বাজার আরও ভারসাম্যপূর্ণ হবে। দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির বিনিয়োগ বাজারের অস্থিরতা কমাতে এবং সঠিক মূল্য নির্ধারণে সহায়ক হবে।
এ ছাড়া বিদেশি পুঁজি প্রবাহ বাড়লে মুদ্রার স্থিতিশীলতা, তারল্য এবং কোম্পানিগুলোর পুঁজির খরচ কমতেও সাহায্য করবে বলে মত বিশ্লেষকদের। ব্যাংকিং, আর্থিক সেবা, শিল্পপণ্য ও প্রযুক্তি খাত এতে সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।
প্রবাসীদের লাভ কী
নতুন সিদ্ধান্তের ফলে প্রবাসী ভারতীয়রা এখন আরও বেশি অঙ্কে, দ্রুত এবং কম জটিলতায় বিনিয়োগ করতে পারবেন। তাঁদের বিদেশে সঞ্চিত অর্থ ভারতের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মিলিয়ে নেওয়ার সুযোগও বাড়বে।

বড় চিত্র
প্রবাসীবান্ধব এই সংস্কারের পাশাপাশি বাজেটে অবকাঠামো ব্যয়, উৎপাদন খাতের প্রণোদনা এবং ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থার প্রসারের কথাও বলা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য এমন এক বিনিয়োগভিত্তি তৈরি করা, যা আবেগ ও অর্থনীতির দিক থেকে ভারতের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত। বাজেট দুই হাজার ছাব্বিশে সেই পথে প্রবাসী ভারতীয়দের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















