প্রভাবশালী বন্ধুদের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, বিপুল সম্পদ এবং যৌন অপরাধের অভিযোগ—সব মিলিয়ে জেফ্রি এপস্টেইনের নাম আধুনিক সময়ের অন্যতম আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়। নিউইয়র্কের একটি কারাগারে বিচার শুরুর আগেই তাঁর মৃত্যু এই অধ্যায়কে আরও রহস্যময় করে তোলে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে প্রকাশিত সরকারি নথি তাঁর জীবন ও সংযোগ নিয়ে নতুন করে আলো ফেলেছে।
কারাগারে মৃত্যু ও অভিযোগের প্রেক্ষাপট
২০১৯ সালের ১০ আগস্ট নিউইয়র্কের একটি কারাগারে জেফ্রি এপস্টেইনের মৃত্যু হয়। তখন তিনি নাবালিকাদের যৌন পাচারের গুরুতর অভিযোগে বিচার অপেক্ষমাণ ছিলেন এবং জামিনের কোনো সুযোগ ছিল না। এর এক দশকেরও বেশি আগে তিনি এক নাবালিকার কাছ থেকে যৌন সেবা নেওয়ার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে আজীবনের জন্য যৌন অপরাধী হিসেবে নিবন্ধিত হন। সর্বশেষ মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি নাবালিকাদের নিয়ে একটি বিস্তৃত যৌন শোষণ চক্র পরিচালনা করতেন, যদিও তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছিলেন।

এপস্টেইন ফাইলস ও নথি প্রকাশ
২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ‘এপস্টেইন ফাইলস স্বচ্ছতা আইন’ অনুমোদন করে, যার ফলে বিচার বিভাগকে এপস্টেইন সংক্রান্ত তদন্তের নথি প্রকাশ করতে বাধ্য করা হয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এতে স্বাক্ষর করেন। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কিছু নথি প্রকাশ করা হয় এবং পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে আরও দলিল প্রকাশ পায়। কর্তৃপক্ষ দাবি করে যে জানুয়ারির শেষ দিকে এই পর্যালোচনা প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে, তবে সমালোচকদের মতে এখনো অনেক গুরুত্বপূর্ণ নথি গোপন রাখা হয়েছে। প্রকাশিত কাগজপত্র এপস্টেইনের জীবন ও তাঁর প্রভাবশালী যোগাযোগের চিত্র স্পষ্ট করেছে।
শৈশব, শিক্ষা ও সম্পদের উত্থান
নিউইয়র্কে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এপস্টেইন ১৯৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ডাল্টন স্কুলে গণিত ও পদার্থবিজ্ঞান পড়াতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসব বিষয়ে পড়াশোনা করলেও তিনি স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেননি। শিক্ষকতার সময়ই তাঁর পরিচয় হয় ওয়াল স্ট্রিটের এক অংশীদারের সঙ্গে, যার সূত্র ধরে তিনি বেয়ার স্টার্নসে যোগ দেন এবং মাত্র চার বছরের মধ্যেই অংশীদার হন। ১৯৮২ সালে তিনি জে এপস্টেইন অ্যান্ড কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন, যা এক সময় এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি সম্পদ পরিচালনা করত।

বিলাসী জীবন ও প্রভাবশালী মহল
এপস্টেইনের জীবন ছিল অত্যন্ত বিলাসবহুল। ফ্লোরিডা, নিউ মেক্সিকো ও নিউইয়র্কে তাঁর একাধিক সম্পত্তি ছিল। তিনি রাজনীতিক, শিল্পী ও তারকাদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। একসময় ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে প্রশংসা করে মন্তব্য করেছিলেন, যদিও পরে ট্রাম্প দাবি করেন, তাঁর ক্লাবে নারীদের প্রতি অনুচিত আচরণের কারণে তিনি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন। এপস্টেইনের পরিচিত মহলে ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, অভিনেতা কেভিন স্পেসি ও ক্রিস টাকার, এবং যুক্তরাজ্যের রাজনীতিক পিটার ম্যান্ডেলসন। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি কখনো বিয়ে করেননি, তবে সুইডেনের সাবেক সুন্দরী প্রতিযোগী ইভা অ্যান্ডারসন ডুবিন ও গিসলেন ম্যাক্সওয়েলের সঙ্গে সম্পর্কে ছিলেন।
ফৌজদারি দণ্ড ও বিতর্কিত সমঝোতা
২০০৫ সালে ফ্লোরিডা পুলিশ এক ১৪ বছর বয়সী কিশোরীর অভিযোগের ভিত্তিতে এপস্টেইনের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। তাঁর পাম বিচের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে অল্পবয়সী মেয়েদের বহু ছবি পাওয়া যায়, যা থেকে দীর্ঘদিনের নির্যাতনের ইঙ্গিত মেলে। তবু ২০০৮ সালে একটি বিতর্কিত সমঝোতার মাধ্যমে তিনি মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড পান এবং কর্মস্থলে যাওয়ার বিশেষ সুবিধা ভোগ করেন। এর ফলে ফেডারেল পর্যায়ে এমন অভিযোগ এড়ানো যায়, যা হলে তাঁর আজীবন কারাবাস হতে পারত। দণ্ডভোগের পরও তিনি সম্পদ ও প্রভাব বজায় রাখেন।

শেষ গ্রেপ্তার ও রহস্যজনক মৃত্যু
২০১৯ সালের ৬ জুলাই প্যারিস থেকে ফেরার পর এপস্টেইন আবার গ্রেপ্তার হন। তাঁর নিউইয়র্কের বাসভবন বাজেয়াপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা অভিযোগের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল। জামিন নামঞ্জুর হওয়ায় তাঁকে নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটন কারেকশনাল সেন্টারে রাখা হয়। জুলাই মাসে তিনি স্বল্প সময়ের জন্য হাসপাতালে ভর্তি হলেও কখনো বিচারের মুখোমুখি হননি।
গিসলেন ম্যাক্সওয়েল মামলা
এপস্টেইনের মৃত্যুর পর তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী গিসলেন ম্যাক্সওয়েল ২০২০ সালের জুলাইয়ে গ্রেপ্তার হন। নাবালিকাদের যৌন শোষণে সহায়তার অভিযোগে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০ বছরের কারাদণ্ড পান। ম্যাক্সওয়েলই এপস্টেইনকে বহু ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন এবং তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক শেষ হলেও পেশাগত সহযোগিতা দীর্ঘদিন চালু ছিল।
জেফ্রি এপস্টেইনের জীবন একদিকে অর্থ, ক্ষমতা ও প্রভাবের গল্প, অন্যদিকে গুরুতর অপরাধ ও বিচারহীনতার প্রতীক। প্রকাশিত নথি তাঁর কর্মকাণ্ডের কিছু দিক উন্মোচন করলেও, তাঁর মৃত্যু ও অপ্রকাশিত দলিল ঘিরে প্রশ্ন এখনো রয়ে গেছে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















