ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণের মাত্র তিন দিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় শুল্ক চুক্তি সই করতে যাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার। আগামী সোমবার ওয়াশিংটন ডিসিতে এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও এর খসড়া ও শর্তাবলি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। বিষয়টি নিয়ে দেশের ব্যবসায়ী মহলে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের ওপর। অথচ এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের খুঁটিনাটি অজানা থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক জোরালো হচ্ছে।
গোপনীয়তার শর্তে চুক্তি, বাড়ছে অনিশ্চয়তা
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, চুক্তির বিষয়বস্তু গোপন রাখার শর্তে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র এর আগে একটি নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্টে সই করেছে। ফলে চুক্তিতে কী কী শর্ত অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে, তা ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্ট মহলের জানা নেই। এই গোপনীয়তাই মূল উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শুল্ক চুক্তির ফলে রপ্তানিতে কিছু সুবিধা মিলতে পারে। তবে সেই সুবিধার বিনিময়ে কী ধরনের শর্ত মানতে হবে এবং তার প্রভাব দেশের শিল্প, বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাজারে কী হবে, তা স্পষ্ট না হওয়ায় অনিশ্চয়তা বাড়ছে।

রপ্তানিকারক ও ব্যবসায়ীদের প্রতিক্রিয়া
তৈরি পোশাক খাতের শীর্ষ রপ্তানিকারকদের সংগঠনের এক শীর্ষ নেতা বলেন, এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনা হওয়া জরুরি। কারা এতে লাভবান হবেন আর কারা ক্ষতির মুখে পড়বেন, তা না জেনেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি জানান, এই চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের ওপর আরোপিত পাল্টা শুল্ক ২০ শতাংশ থেকে কমে ১৫ শতাংশে নামতে পারে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। তবে নির্বাচনের ঠিক আগে চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ তাকে বিস্মিত করেছে।
শুধু রপ্তানিকারক নয়, অভ্যন্তরীণ বাজারনির্ভর ব্যবসায়ীরাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা চেম্বারের সভাপতি বলেন, চুক্তির খসড়া সম্পর্কে কিছুই জানা না থাকায় এ বিষয়ে মন্তব্য করা কঠিন। তার মতে, এমন সিদ্ধান্ত জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের নেওয়াই যুক্তিসংগত হতো।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে বিশ্লেষকদের সতর্কতা
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এটি শুধু একটি শুল্ক চুক্তি নয়; এর সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক প্রভাবও জড়িত। বেসরকারি গবেষণা সংস্থার এক জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক বলেন, চুক্তিটি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হচ্ছে না। খসড়া গোপন থাকায় এর সুফল ও কুফল বিশ্লেষণের সুযোগও নেই।

তার মতে, চুক্তিটি নির্বাচনের পরে হলে রাজনৈতিক দলগুলো বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে পারত। এখন প্রশ্ন উঠছে, নতুন সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্র সংকুচিত করে দেওয়া হচ্ছে কি না।
তিনি আরও বলেন, সরকার আগে রাখাইন ইস্যুতে মানবিক করিডর চালুর বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখালেও পরে পিছিয়ে এসেছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে, যেমন বন্দরের দায়িত্ব হস্তান্তর, নীরবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শুল্ক চুক্তিটিও যদি নির্বাচনের পরে হতো, তাহলে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা সম্ভব হতো।
চুক্তির সম্ভাব্য শর্ত ও বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়
সরকারি সূত্র অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তিতে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, ডিজিটাল বাণিজ্য ও প্রযুক্তি, উৎস বিধি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং বাণিজ্যসংক্রান্ত নানা শর্ত যুক্ত করতে চায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিপণ্য, উড়োজাহাজ ও যন্ত্রাংশ এবং এলএনজি আমদানির মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ৬০০ কোটি মার্কিন ডলার, বিপরীতে আমদানি প্রায় ২০০ কোটি ডলার। এই ব্যবধান কমাতে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের জন্য বাংলাদেশি বাজার আরও উন্মুক্ত করার শর্ত থাকতে পারে বলে ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সিদ্ধান্তগুলোর ধারাবাহিকতা
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, একটি অস্থায়ী সরকার ভোটের ঠিক আগে এমন চুক্তি করলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠবে। চাইলে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে চুক্তি সইয়ের সময় কিছুটা পিছিয়ে দেওয়ার অনুরোধ জানানো যেত। তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নেওয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক আরও বেড়েছে।

এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার আরও কয়েকটি বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। গত নভেম্বরে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি হয়। একই দিনে বুড়িগঙ্গার তীরে একটি নৌ টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য আরেকটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করা হয়।
এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের একটি কনটেইনার টার্মিনালের দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রক্রিয়াও এগিয়ে চলছে। এসব সিদ্ধান্তের প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ওপর পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শেষ মুহূর্তের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গেলে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কাছে সাংবাদিকেরা অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে চুক্তি প্রসঙ্গে জানতে চান। তিনি বিষয়টিকে চলমান প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ভোটের মাত্র তিন দিন আগে কোনো অস্থায়ী সরকারের এমন চুক্তি করা বিরল ঘটনা। যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সময় চাওয়া যেত। তা না করে দ্রুত চুক্তি সইয়ের উদ্যোগ নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই নানা প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















