দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে রংপুর ছিল জাতীয় পার্টির অটল ঘাঁটি। এরশাদ পরিবারের ছায়ায় গড়ে ওঠা এই রাজনৈতিক বলয় এবার বড় চ্যালেঞ্জের মুখে। গণঅভ্যুত্থান–পরবর্তী নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রংপুরের রাজনীতি নতুন সমীকরণে প্রবেশ করেছে, যেখানে সরাসরি লড়াইয়ে নেমেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
৫ আগস্ট ২০২৪–এর রাজনৈতিক পালাবদলের পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনী মাঠে নেই। ফলে রংপুরের ছয়টি আসনে এবার লড়াই অনেক বেশি খোলা ও অনিশ্চিত। কোথাও ত্রিমুখী, কোথাও সরাসরি দ্বন্দ্ব—সব মিলিয়ে জাতীয় পার্টি, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে শক্তি পরীক্ষার মঞ্চে পরিণত হয়েছে গোটা জেলা।
সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, দুটি আসনে জামায়াতের প্রকাশ্য শক্তি প্রদর্শন। রংপুর–১ ও রংপুর–৫ আসনে দলটি যে আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছে, তা এই অঞ্চলের রাজনীতিতে আগে কখনও এত স্পষ্টভাবে দেখা যায়নি।

রংপুর–১: জামায়াতের জন্য সুযোগের জানালা
গঙ্গাচড়া উপজেলা ও রংপুর সিটি করপোরেশনের অংশ নিয়ে গঠিত রংপুর–১ আসনে ঐতিহাসিকভাবে জাতীয় পার্টিই এগিয়ে থেকেছে। তবে এবার চিত্র বদলে গেছে। জাতীয় পার্টির প্রার্থী মনজুর আলীর দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি জটিলতায় প্রার্থিতা বাতিল হওয়ায় এই আসনে দলটি প্রার্থীশূন্য। ফলে লড়াই গিয়ে দাঁড়িয়েছে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে।
বিএনপির প্রার্থী মুকাররম হোসেন সুজনের বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী রংপুর মহানগরের সেক্রেটারি রায়হান সিরাজী। ভোটারদের মতে, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির পুরনো ভোটব্যাংক কোন দিকে ঝুঁকবে, সেটিই এখানে ফল নির্ধারণ করবে।
রংপুর–২: ত্রিমুখী শক্তি পরীক্ষা
বদরগঞ্জ ও তারাগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত রংপুর–২ আসনে অতীতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির আধিপত্য ছিল। এবার সেই শূন্যতায় ত্রিমুখী লড়াই স্পষ্ট। জাতীয় পার্টি এগিয়ে থাকার দাবি করলেও বিএনপি সরকার গঠনের আশ্বাস দিয়ে মাঠে সক্রিয়। জামায়াত এখানে তাদের জ্যেষ্ঠ নেতা এটিএম আজহারুল ইসলামকে প্রার্থী করেছে, যা লড়াইকে আরও উত্তপ্ত করেছে।
রংপুর–৩: জাতীয় পার্টির সবচেয়ে শক্ত ঘাঁটি
সদর উপজেলা কেন্দ্রিক রংপুর–৩ আসনকে এখনও জাতীয় পার্টির ব্যক্তিগত এলাকা বলেই মনে করেন অনেক ভোটার। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ থেকে শুরু করে তার পরিবার ও দলীয় নেতৃত্ব বারবার এই আসন দখল করেছে। এবারও দলের চেয়ারম্যান জিএম কাদের এখানে প্রার্থী। বিএনপি ও জামায়াত প্রচারে সক্রিয় হলেও সাধারণ ধারণা, এই আসনে জাতীয় পার্টিই এখনও এগিয়ে।

রংপুর–৪: শিল্পপতি অধ্যুষিত আসনে নতুন মুখ
পীরগাছা ও কাউনিয়া নিয়ে গঠিত রংপুর–৪ আসন দীর্ঘদিন ধরে ব্যবসায়ী প্রার্থীদের দখলে। এবার বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পাশাপাশি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটের তরুণ মুখ আখতার হোসেন এখানে আলাদা আলোচনায়। তরুণ ভোটারদের আগ্রহ এই আসনকে করেছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
রংপুর–৫: দুই গোলাম রব্বানীর লড়াই
মিঠাপুকুরের এই আসনে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে হিসাব ওলটপালট। বিএনপি ও জাতীয় পার্টির পাশাপাশি জামায়াত সংগঠিতভাবে মাঠে নেমেছে। কৌতূহলের বিষয়, এখানে বিএনপি ও জামায়াত—উভয় দলের প্রার্থীর নামই গোলাম রব্বানী। ভোটারদের মতে, জামায়াত যদি পূর্ণ শক্তি নিয়ে ভোটে নামে এবং প্রতিদ্বন্দ্বীরা ভোট ভাগাভাগিতে জড়ায়, তাহলে ইতিহাস বদলাতে পারে।
রংপুর–৬: ভিআইপি আসনে টানটান উত্তেজনা
পীরগঞ্জের রংপুর–৬ আসনকে বলা হয় ভিআইপি আসন। সাবেক রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও স্পিকার—সবাই এখান থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। এবার এখানে মূল লড়াই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে। জুলাই আন্দোলনের প্রথম শহীদ আবু সাঈদের বাড়ি হওয়ায় এই আসনের প্রতীকী গুরুত্বও অনেক বেশি।
সব পক্ষের আত্মবিশ্বাস
জাতীয় পার্টি বলছে, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে হারানো আসন পুনরুদ্ধার সম্ভব। বিএনপি দাবি করছে, রংপুরের সব আসনেই তারা জয় পাবে। জামায়াত তরুণদের শক্তিকে সামনে রেখে পরিবর্তনের বার্তা দিচ্ছে।
দীর্ঘদিনের পরিচিত রাজনৈতিক মানচিত্রে রংপুরে এবার স্পষ্ট ফাটল। এই নির্বাচন শুধু আসন নয়, বদলে দিতে পারে কয়েক দশকের রাজনৈতিক আনুগত্য।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















