ডাভোসে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কারনির ভাষণ ছিল ভাঙাচোরা বিশ্বব্যবস্থায় কোনো দাপুটে পরাশক্তির মুখোমুখি হলে রাষ্ট্রগুলোর—বিশেষ করে মধ্যম শক্তিধর দেশগুলোর—কী ধরনের কৌশলগত পুনর্বিন্যাস প্রয়োজন, তার সবচেয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যাগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্রের নাম না করেই তিনি জোর দিয়ে বলেন, শক্তিশালী দেশগুলোর অর্থনৈতিক চাপ মোকাবিলায় মধ্যম শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। কারণ তারা যদি তা না করে, তাহলে তারা ‘আলোচনার টেবিলে থাকবে না, বরং মেনুতেই পরিণত হবে’।
কারনি অভিযোজনের প্রয়োজনীয়তার কথা স্পষ্টভাবে তুলে ধরলেও বাস্তবে দেশগুলো ইতোমধ্যেই নতুন ভূ-কৌশলগত বাস্তবতা ও ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে শুরু করেছে। এই পুনর্বিন্যাস নানা ধরনের—বাণিজ্যিক অংশীদার বৈচিত্র্য করা থেকে শুরু করে ভূরাজনৈতিক অবস্থান বদলানো পর্যন্ত। এর কিছু প্রবণতা সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির কারণে দ্রুততর হয়েছে, তবে এগুলো আগেই দৃশ্যমান ছিল একটি ক্রমবর্ধমান বহুমুখী বিশ্বে, যেখানে কাঠামোগত পরিবর্তন, নতুন শক্তির ভারসাম্য এবং পশ্চিম থেকে অন্যদের দিকে অর্থনৈতিক ক্ষমতার সরে যাওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও অন্যান্য দেশের চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানো এবং বেইজিংয়ের বাজার বৈচিত্র্য করার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। ২০২০ সালে চীন যুক্তরাষ্ট্রকে পেছনে ফেলে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হয়। একই সঙ্গে ইউরোপীয় ইউনিয়নও চীনের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার—যা অনেকের ধারণার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র নয়। ওয়াশিংটন যখন চীনকে ঘিরে নিয়ন্ত্রণ কৌশল ও শুল্কযুদ্ধ চালাচ্ছে, তখন বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে রপ্তানি বাজার বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিয়েছে, যা ট্রাম্পের পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর আরও জোরদার হয়। এর সুফলও মিলেছে। আজ চীনের রেকর্ড এক ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্তের পেছনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও ইউরোপে রপ্তানি বৃদ্ধির বড় ভূমিকা রয়েছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে চীনা রপ্তানি কমেছে। কানাডা ও চীনের মধ্যে ‘কৌশলগত’ বাণিজ্য ও জ্বালানি অংশীদারত্বও বাণিজ্য পুনর্বিন্যাসের একটি উদাহরণ। একইভাবে সাম্প্রতিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন–ভারত মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিও তা-ই নির্দেশ করে। গত সপ্তাহে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের চীন সফরও দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নত করার প্রচেষ্টার প্রতিফলন।
এদিকে দক্ষিণ–দক্ষিণ বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং এখন বৈশ্বিক বাণিজ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ জুড়ে রয়েছে। ২০০৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে এটি দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, গ্লোবাল সাউথ বহুমুখী বিশ্বপরিবেশকে কাজে লাগিয়ে নিজস্ব পথ তৈরি করতে চায়। এই বাণিজ্য বৃদ্ধির কতটা যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কনীতির কারণে? ধারণা করা হয়, ২০১৮ সালের পর থেকে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কজনিত বিঘ্নের ফল। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো এখন একে অপরের সঙ্গে বেশি বাণিজ্য করছে এবং তাদের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির সংখ্যাও বাড়ছে। পারস্পরিক বিনিয়োগও বৃদ্ধি পেয়েছে। চীনের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য দ্রুতগতিতে বেড়ে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যকে ছাড়িয়ে গেছে।
বিশ্বের পরিবর্তিত গতিপ্রকৃতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে দেশগুলো বাণিজ্যিক সম্পর্ক বৈচিত্র্য করছে এবং রাজনৈতিক অবস্থানও বদলাচ্ছে।

ভূরাজনৈতিক দিক থেকে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো—যাদের অনেকই মধ্যম শক্তিধর—বৃহত্তর প্রভাব ও শক্তিশালী কণ্ঠস্বরের জন্য বিভিন্ন জোটের দিকে ঝুঁকছে। ১১ সদস্যের ব্রিকস জোট এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সমন্বয়ের একটি মাধ্যম। একইভাবে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ বা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার মতো আঞ্চলিক সংগঠনের মাধ্যমেও তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মিলিত প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। পাশাপাশি গ্লোবাল সাউথের মধ্যম শক্তিগুলো বহু-মুখী কূটনীতি অনুসরণ করছে এবং চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। এতে তুরস্কের মতো দেশগুলো আরও প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে ইউরোপকে ভিন্নধরনের এক পুনর্বিন্যাসে বাধ্য করেছে ট্রাম্পের নীতিগত অবমূল্যায়ন, যা তার জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলে, ইউরোপীয় নেতাদের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যে, ন্যাটোর প্রতি অবজ্ঞায় এবং গ্রিনল্যান্ড দখলের হুমকিতে প্রতিফলিত হয়েছে। ট্রান্সঅ্যাটলান্টিক জোট কার্যত ভেঙে পড়েছে এবং পারস্পরিক আস্থার অবক্ষয় নজিরবিহীন। প্রথমে ইউরোপীয় নেতারা ট্রাম্পকে তোষামোদ করার চেষ্টা করলেও তা কাজে আসেনি। বরং তিনি এটিকে দুর্বলতা হিসেবে দেখেছেন এবং ইউরোপের ওপর আরও চাপ বাড়িয়েছেন।
এই বাস্তবতায় ইউরোপীয় দেশগুলো পথ পরিবর্তনে বাধ্য হয়। এখন পাল্টা অবস্থান নেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, যা থেকে স্পষ্ট—ইউরোপ আর যুক্তরাষ্ট্রকে আগের মতো নির্ভরযোগ্য মিত্র ও নিরাপত্তা রক্ষাকর্তা হিসেবে দেখতে পারছে না। নীতিনির্ধারকেরা বিকল্প ভাবনার আগেই ইউরোপীয় জনমত বদলাতে শুরু করে। ইউরোপীয় কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের এক জরিপে দেখা যায়, অধিকাংশ ইউরোপীয় নাগরিক আর যুক্তরাষ্ট্রকে নির্ভরযোগ্য মিত্র মনে করেন না। যদিও ওয়াশিংটনের ওপর সামরিক নির্ভরতা কমানো সহজ নয়, তবু ইউরোপের রাজধানীগুলোতে এখন এটি বড় নীতিগত উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠেছে, একই সঙ্গে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত রাখার চেষ্টাও করছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার বাস্তবতায় আঞ্চলিক শক্তিগুলো নানা ভাবে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার রাখতে চাইলেও একই সঙ্গে বিকল্প পথ খুঁজছে এবং চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াচ্ছে। ইরানের সঙ্গে তাদের সমঝোতা আংশিকভাবে নিরাপত্তা উদ্বেগ মোকাবিলা ও উচ্চাভিলাষী অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজনে, আবার যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি কমে যাওয়ার পূর্বাভাসের কারণেও। কাতার ও তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতের উদ্যোগও একই ধারার অংশ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ছাতার ওপর আস্থা ক্ষয়ে যাওয়া এবং ইসরায়েলের প্রতি ওয়াশিংটনের একতরফা সমর্থনের প্রেক্ষাপটে সৌদি–পাকিস্তান কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি রিয়াদের নিরাপত্তা অংশীদার বৈচিত্র্য করার প্রয়াসকে তুলে ধরে।
পরিবর্তিত ভূরাজনীতিতে মধ্যম শক্তিগুলোর বাড়তি গুরুত্ব আরেকটি বড় দিক। আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় কাঠামোগত পরিবর্তন ও ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ তাদের জন্য প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র–চীন প্রতিযোগিতা দেশগুলোকে সেই দ্বন্দ্ব কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বার্থে স্বাধীন পথ অনুসরণের সুযোগ দিয়েছে। ফিন্যানশিয়াল টাইমস-এ এক মতামত লেখায় অ্যালেক রাসেল যেমন লিখেছিলেন, ‘পশ্চিমা নির্ধারিত সেট মেনুর যুগ শেষ। নতুন মেনুটি যদিও দুই প্রধান শেফের প্রভাবে তৈরি হচ্ছে, তবু তা এখনো লেখা চলছে।’ অর্থাৎ মধ্যম শক্তিগুলো টেবিলে বসার অধিকার দাবি করছে। বাস্তবে এখন দুই পরাশক্তিরই এই বাস্তবতায় মানিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে—মধ্যম শক্তিগুলোর দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়া ও তাদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে।
এই প্রেক্ষাপটে কারনির আহ্বান সময়োচিত—মধ্যম শক্তিগুলোকে একসঙ্গে কাজ করে বড় শক্তিগুলোর মোকাবিলা করতে হবে শক্ত অবস্থান থেকে। বিশেষ করে যখন যুক্তরাষ্ট্রনেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার শেষ প্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছে বিশ্ব।

লেখকঃ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও জাতিসংঘে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত।
মালিহা লোধী 



















