ইউএনবি
বাংলাদেশে দীর্ঘ দেড় বছরের টালমাটাল রাজনৈতিক রূপান্তরের শেষ ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে আগামী বারো ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন। আন্তর্জাতিক সংকট বিশ্লেষণ কারী সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মতে, এই নির্বাচনই হবে চলমান রাজনৈতিক পরিবর্তনের চূড়ান্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বের পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং দেশ ফিরবে নির্বাচিত সরকারের হাতে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়কাল ও প্রত্যাশা
নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল অনেক বেশি। শুরুতে এই সরকারের প্রতি জনসমর্থন ছিল উল্লেখযোগ্য। তবে সময়ের সঙ্গে সেই উজ্জ্বলতা কিছুটা কমেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবুও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, সেনাবাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে নাজুক হলেও একটি ঐকমত্য ধরে রাখা—এই দুই ক্ষেত্রকে অন্তর্বর্তী সরকারের বড় সাফল্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

সংস্কার উদ্যোগ ও জুলাই সনদ
দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অন্তর্বর্তী সরকার রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের রূপরেখা দেয়। সহিংসতার ঘটনায় দায়ীদের বিচারের উদ্যোগ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন—সবকিছু মিলিয়ে একটি রূপান্তর কালীন কর্মসূচি সামনে আনা হয়। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে ছিল জুলাই সনদ, যা প্রণয়নের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য সংস্কারের একটি নীতিগত ভিত্তি তৈরি করা হয়েছে। সংবিধান, নির্বাচন ব্যবস্থা ও বিচার ব্যবস্থা সহ গুরুত্বপূর্ণ খাতে সংস্কারের প্রস্তাব নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য গড়ে ওঠে, যদিও বাস্তবায়নের ধাপ ও অগ্রাধিকার নিয়ে মতভেদ থেকেই গেছে।
সমালোচনা ও রাজনৈতিক বাস্তবতা
অন্তর্বর্তী সরকারকে ঘিরে সমালোচনাও কম নয়। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক আচরণ, নিরাপত্তা পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা, এবং কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর প্রতি নমনীয়তা—এ ধরনের অভিযোগ উঠেছে। তবুও আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি ন্যূনতম ঐকমত্য ধরে রাখতে পেরেছে সরকার, যা জুলাই সনদে স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে।

নির্বাচনের গুরুত্ব ও ভোটারদের প্রত্যাশা
আগামী বারো ফেব্রুয়ারি প্রায় বারো কোটি সত্তর লাখ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। অনেক তরুণ ভোটারের জন্য এটি জীবনের প্রথম বিশ্বাসযোগ্য জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনী প্রক্রিয়ার পর এই ভোটকে ঘিরে তাই প্রত্যাশা যেমন বেশি, তেমনি উদ্বেগও রয়েছে।
প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রাজনৈতিক সমীকরণ
নির্বাচনে মূল লড়াই হবে দুইটি রাজনৈতিক জোটের মধ্যে। একদিকে রয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোট, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা জোট। বিএনপির সংগঠন শক্তিশালী হলেও চাঁদাবাজির অভিযোগ, প্রার্থী বাছাই নিয়ে অভ্যন্তরীণ বিরোধ এবং আওয়ামী লীগের থেকে আলাদা কিছু করতে না পারার অভিযোগ দলটির ভাবমূর্তিকে চাপে ফেলেছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারেক রহমানের দেশে ফেরা এবং খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জনসমাগম বিএনপিকে কিছুটা বাড়তি আলোচনায় এনেছে, তবে দলের ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী সাম্প্রতিক আন্দোলনের পর নতুন গতি পেয়েছে। শৃঙ্খলাবদ্ধ বিকল্প শক্তি হিসেবে বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে তাদের প্রভাব বাড়ছে। ছাত্র রাজনীতিতে ও দলটি উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। জাতীয় নাগরিক পার্টির সঙ্গে জোট গড়ে তাদের অবস্থান আরও মজবুত হলেও, সেই জোট নিয়ে ভেতরে ভেতরে অসন্তোষ ও দেখা দিয়েছে।
নিরাপত্তা ঝুঁকি ও শেষ চ্যালেঞ্জ
নির্বাচনের আগে ও চলাকালীন নিরাপত্তা পরিস্থিতিই সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতা বেড়ে যাওয়ার নজির রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ও ঘটেছে। ভোটের ফলাফল নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে তা সামাল দেওয়া ই হবে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ এবং সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















