স্বৈরাচার পতনের দেড় বছর পরও রাষ্ট্র সংস্কারের যে স্বপ্ন মানুষ দেখেছিল, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং অর্জনের তুলনায় ঘাটতিই বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বলে জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, জবাবদিহিমূলক ও দুর্নীতিমুক্ত শাসনব্যবস্থা গড়ে তোলার ভিত্তি এই সময়ে শক্ত হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার বিপরীত চিত্রই ফুটে উঠেছে।
স্বৈরাচার পতনের দেড় বছর, প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
ঢাকায় আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি তাদের পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও সরকারি কর্মচারীদের সম্পদ বিবরণী প্রকাশের ঘোষণা দেওয়া হলেও তা বাস্তবে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেনি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিত না হওয়া এবং তথ্য গোপনের প্রবণতা মানুষের তথ্য জানার অধিকারকে দুর্বল করেছে।
ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও সহিংসতার উদ্বেগ

টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এই সময়ে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির প্রভাব ও বিস্তার দৃশ্যমান হয়েছে। সহিংসতা ও বলপ্রয়োগের কারণে অনেক ক্ষেত্রে লিঙ্গ, ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও জাতিগত বৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়েছে, যা বৈষম্যবিরোধী চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সরকারের নিষ্ক্রিয়তা কিংবা তোষণের কারণে কিছু ক্ষেত্রে উগ্র শক্তির ক্ষমতায়ন ঘটেছে বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
রাষ্ট্র সংস্কার ও সুশাসনের ঘাটতি
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমতা, মানব মর্যাদা, ন্যায়বিচার, সমান অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। দেড় বছরে সুশাসন, দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি হয়নি। সংস্কারের নামে নেওয়া উদ্যোগগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে এবং কোথাও কোথাও প্রত্যাশার বিপরীত ফল দিয়েছে।
জুলাই সনদ ও রাজনৈতিক অনীহা
টিআইবির মতে, জুলাই সনদের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের কিছু মৌলিক বিষয়ে রাজনৈতিক ঐকমত্য তৈরি হওয়া গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হলেও জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় ধারাগুলোতে প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার কারণে সংস্কারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। আমলাতন্ত্রের প্রভাবশালী অংশের চাপ ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির কাছে সরকারের নতি স্বীকার সংস্কারকে আরও পিছিয়ে দিয়েছে।

আমলাতন্ত্র ও সিদ্ধান্তহীনতার চিত্র
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে খণ্ডিত ও বেছে নেওয়ার প্রবণতা স্পষ্ট ছিল। অনেক ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দৃঢ়তার অভাব এবং রাষ্ট্রীয় শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা জনমনে অনিরাপত্তা বাড়িয়েছে। প্রশাসনিক সংস্কারের নামে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সরানো হলেও বাস্তবে একক প্রভাবের জায়গায় ত্রিমুখী প্রভাব বিস্তার করেছে।
বিচারব্যবস্থা ও গণমাধ্যমের অবস্থা
প্রতিবেদনে বিচারব্যবস্থার সংস্কারে কিছু অগ্রগতির কথা বলা হলেও বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও প্রক্রিয়াগত দুর্বলতায় ন্যায়বিচার ও প্রতিশোধের সীমারেখা ঝাপসা হয়েছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে টিআইবি গভীরভাবে হতাশাজনক বলে উল্লেখ করেছে। রাষ্ট্রের বাইরের শক্তির চাপ এবং সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়ায় গণমাধ্যম আরও ঝুঁকির মুখে পড়েছে।

সমান অধিকার ও নাগরিক সহাবস্থান
টিআইবির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, লিঙ্গ, ধর্ম, জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্বিশেষে সমান অধিকার ও সহাবস্থান নিশ্চিত করতে সরকার দৃঢ় অবস্থান নেয়নি। নারীর ক্ষমতায়নের বিরোধী শক্তিকে কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
সামগ্রিক মূল্যায়ন
টিআইবির মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নতুন রাজনৈতিক ও সামাজিক বন্দোবস্তের লক্ষ্য অর্জনে অগ্রগতির তুলনায় ব্যর্থতার পাল্লাই ভারী। জুলাই সনদের বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং মানুষের প্রত্যাশা এখনো অপূর্ণ রয়ে গেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















