একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি চেষ্টা করি সবচেয়ে কঠিন স্বজনদের সঙ্গেও কোমল থাকতে।
আমার রোগীর স্ত্রী বিছানার এক পাশ থেকে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রায় অর্ধডজন বন্ধু। মাঝখানে শুয়ে থাকা আমার রোগীর শরীর জন্ডিসে হলুদ হয়ে গিয়েছিল, মুখ শুকিয়ে গিয়েছিল, দীর্ঘদিন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে থাকার কারণে তাঁর হাতে নীলচে দাগ। সেডেশন বন্ধ থাকলেও তিনি তখনও কোমায় ছিলেন।
স্ত্রী ঘরের ভেতর পায়চারি করছিলেন, কথা বলছিলেন চাপা উত্তেজনায় ভরা স্বরে। তিনি জানতে চাইছিলেন, এরপর আমরা কী করতে যাচ্ছি। নিশ্চয়ই আবার রক্ত দিতে হবে, অ্যান্টিবায়োটিক চালু করতে হবে। আমি সেদিনের চিকিৎসা পরিকল্পনা ব্যাখ্যা করলাম, কিন্তু প্রতিদিনের মতোই আবার বললাম—তাঁর স্বামী মারা যাচ্ছেন। লিভারের ক্যানসার আর চিকিৎসাযোগ্য নয়, এবং এখন তা অন্য অঙ্গগুলোকেও অচল করে দিচ্ছে।
তিনি লিভার প্রতিস্থাপনের কথা জিজ্ঞেস করলেন। আমি বললাম, তিনি তার জন্য খুব বেশি অসুস্থ। আমার মনে হচ্ছিল, তিনি যেন তাঁর স্বামীর পরিণতির পুরো দায় নিজের কাঁধে নিয়েছেন—যেন তাঁর জোরালো অবস্থান না থাকলে আমরা তাঁকে মরতে দেব। কিন্তু বাস্তবে, তিনি যাই করুন না কেন, মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী। “আমি এসব শুনতে চাই না। আপনাকে কিছু করতেই হবে,” বলে তিনি মুখ ফিরিয়ে নিলেন। তাঁর বন্ধুরা আমাকে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ইশারা করলেন।
পরে একজন নার্স আমার কাছে এলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “কেমন গেল? তিনি তো বেশ কঠিন একজন।”
এই ‘কঠিন’ শব্দটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করি—রোগী বা তাঁদের স্বজনদের জন্য, যাঁরা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলেন। সম্প্রতি এই শব্দটি নিয়ে আমি অনেক ভাবছি, বিশেষ করে এইচবিও ম্যাক্সের নাটক ‘দ্য পিট’-এর দ্বিতীয় মৌসুম দেখার সময়। অনেক চিকিৎসা-নির্ভর ধারাবাহিকে রোগী ও তাঁদের পরিবারকে করুণ সহানুভূতির প্রতীক হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু ‘দ্য পিট’ দেখায় চিকিৎসক-রোগীর সম্পর্ক যেমন—জটিল, মাঝে মাঝে সুন্দর, আবার তীব্র হতাশা ও দ্বন্দ্বে ভরা। রোগীরা সহিংস হতে পারেন। চিকিৎসা নিতে অস্বীকার করতে পারেন। নিজের পরিণতির জন্য নিজেরাই অনেক সময় দায়ী হন।
এটি একটি সতেজ দৃষ্টিভঙ্গি, কিন্তু পুরো সত্য নয়। স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমরা যাঁদের ‘কঠিন’ বলি, তা প্রায়ই তাঁদের চেয়ে আমাদের বিষয়েই বেশি কিছু বলে—আমরা অস্বস্তি কতটা সহ্য করতে পারি, সে কথা।
যখন আমি অন্য একজন চিকিৎসকের শিফট শেষ হওয়ার পর আইসিইউর দায়িত্ব নেই, আমাদের আলোচনার বড় অংশ জুড়ে থাকে পরিবারগুলো—বিশেষ করে তথাকথিত ‘কঠিন’ পরিবার। আমি শুনি সেই স্বজনের কথা, যিনি এতটাই রাগান্বিত যে আর রেসিডেন্ট চিকিৎসকদের কাছ থেকে দৈনিক আপডেট নেবেন না। শুনি সেই মেয়ের কথা, যিনি খারাপ খবর পাওয়ার পর আর দেখতে আসেন না বা ফোন ধরেন না। শুনি সেই ছেলের কথা, যিনি প্রত্যাশা করেন রাতের চিকিৎসকেরা প্রতিরাতে বারোটার আগে তাঁকে ফোন করবেন।

যাঁরা আমাদের সঙ্গে একমত হন, তাঁদের আমরা কখনও কঠিন বলি না। এই শব্দটি ব্যবহার করা হয় শুধু তাঁদের জন্য, যাঁরা আমাদের পরামর্শকে চ্যালেঞ্জ করেন। কঠিন পরিবার প্রশ্ন করেন অভিযোগের সুরে, আমাদের উত্তর তাঁদের সন্তুষ্ট করে না। তাঁরা এমন ঘন ঘন আপডেট চান, যা আমাদের কাছে বাড়াবাড়ি মনে হয়। তাঁরা নার্সদের জেরা করেন, এমন সিদ্ধান্ত নেন যা আমাদের চোখে গ্রহণযোগ্য নয়। তাঁদের মধ্যে এমন কিছু থাকে—উচ্চমাত্রার যত্নপ্রয়োজনীয়, তিক্ত, বা কেবলই অস্বস্তিকর—যা তাঁদের পাশে থাকা কঠিন করে তোলে। তাঁদের অযৌক্তিক বলে বিবেচনা করা হয়।
এর বিপরীতে, ‘ভদ্র’ পরিবার জানে কীভাবে অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে পাশে থাকতে হয়। তাঁরা প্রশ্ন করতে পারেন, চিকিৎসা সম্পর্কে জানতেও পারেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমাদের সুপারিশ মেনে নেন। তাঁদের যুক্তিসঙ্গত বলা হয়। কথোপকথন তর্কে গড়ায় না। আমরা প্রয়োজন না থাকলেও তাঁদের সঙ্গে কথা বলতে রোগীর ঘরে থেকে যাই। প্রিয়জন আইসিইউ ছাড়লে আমরা তাঁদের জড়িয়ে ধরি। আইসিইউর পাশে সপ্তাহের পর সপ্তাহ থেকেও ভদ্র থাকা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ—যে পরীক্ষায় আমি নিজেই হয়তো ফেল করতাম।
আমি বিশ্বাস করি না যে ভদ্র বা কঠিন রোগী হলে চিকিৎসার সিদ্ধান্তে পার্থক্য হয়—অস্ত্রোপচার করা হবে কি না, বা কোন অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হবে। বরং কখনও কখনও কঠিন পরিবারের প্রিয়জনকে আমি আরও বেশি মনোযোগ দিই, কারণ আমি জেরার জন্য প্রস্তুত থাকি। তবু এই লেবেলগুলো সহায়ক নয়। কাউকে ‘কঠিন’ বলা হলে, আমি তাঁর সব কাজকর্ম সেই চশমা দিয়েই দেখি। অথচ যাঁকে আমরা অযৌক্তিক বলি, তিনি প্রায়ই এমন এক বাস্তবতার সঙ্গে লড়ছেন যা সহ্য করা অসম্ভব, আর তা সামলানোর মতো মানসিক দক্ষতা তাঁর নেই।
একসময় আমি বলতাম, আইসিইউ আমাকে টানে কারণ সংকটের মুহূর্তে মানুষ কতটা অসাধারণ হতে পারে, তা দেখার সৌভাগ্য এখানে মেলে। কিন্তু আসল সৌভাগ্য হলো মানুষকে ভীত, দুর্বল, রাগান্বিত, এমনকি কুৎসিত অবস্থায় দেখার সুযোগ—যখন তারা কেবল ভালোভাবে চেষ্টা করছে তাদের ভালোবাসার মানুষটির জন্য। আমি এই কথাটি মনে রাখার চেষ্টা করি, আর সবচেয়ে কঠিন পরিবারগুলোর প্রতিও কোমল থাকার চেষ্টা করি। অনেক সময় আসলে আমরাই কঠিন হয়ে উঠি, আর রোগী ও তাঁদের পরিবার কেবল তাঁদের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সবাইকে ভালো লাগবেই এমন নয়, আর যাঁরা আমাদের কম পছন্দের, তাঁদের আচরণ আমাদের কেমন অনুভব করায় তা স্বীকার করা জরুরি—কিন্তু সেই অনুভূতিকে আমাদের প্রতিক্রিয়াকে আচ্ছন্ন করতে দেওয়া উচিত নয়।
দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকল। স্পষ্ট হয়ে গেল, তিনি মারা যাবেন। প্রশ্ন ছিল শুধু এটুকু—তাঁর স্ত্রী কি সেই বাস্তবতাকে মেনে নেবেন, নাকি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এর বিরুদ্ধে এবং আমাদের বিরুদ্ধেই লড়াই চালিয়ে যাবেন। আমরা একটি পারিবারিক বৈঠকের আয়োজন করলাম।
আমি তাঁর স্ত্রীর মুখোমুখি বসলাম। সেদিনই প্রথমবার তাঁদের সন্তানদের দেখেছিলাম। বুঝতে পারিনি, তারা কতটা ছোট, কতটা মিষ্টি। তাঁর ছেলে বাবার ঘরে বসে ব্যাকপ্যাক থেকে নাস্তা খাচ্ছিল। তিনি আমাকে বলছিলেন, স্কুলে তারা কত ভালো করছে, তাদের সাফল্য নিয়ে তাঁর স্বামী কতটা গর্বিত ছিলেন। রোগী ও তাঁর স্ত্রী নিজেরাও তুলনামূলকভাবে তরুণ—আমার চেয়ে খুব বেশি বড় নন। আর কয়েক সপ্তাহ ধরে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার একাই তিনি বহন করছিলেন।
তিনি আবারও পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন করলেন, অপ্রয়োজনীয় আরেকটি রক্ত দেওয়ার দাবি জানালেন। কিন্তু এবার বিরক্ত হওয়ার আগে আমি থামলাম।
আমি বলেছিলাম, “আমি শুধু আপনাকে বলতে চাই, আপনি আপনার স্বামীর জন্য অসাধারণভাবে পাশে দাঁড়িয়েছেন। স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নেওয়া সবচেয়ে কঠিন কাজ। আমরা কেউই কখনও সন্দেহ করিনি, আপনি তাঁকে কতটা ভালোবাসেন বা তাঁকে সুস্থ করতে কতদূর যেতে রাজি ছিলেন—যদি তা সম্ভব হতো।”
তিনি আমার দিকে তাকালেন। আমি ভাবছিলাম, তিনি কী বলবেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বললেন, “আপনারা কখনও আমার কথা শোনেননি।”
এর কিছুক্ষণ পরই বৈঠক শেষ হয়ে গেল। এরপর আর আমাদের কথা হয়নি। তবে পরে আমি জানতে পারি, কয়েক ঘণ্টা পর, আমি রাতের জন্য চলে যাওয়ার পর, তিনি স্বামীর জন্য কেবল আরামদায়ক চিকিৎসায় সম্মতি দিয়েছিলেন। তিনি তাঁর পাশেই ছিলেন, যখন তাঁর মৃত্যু হয়।
ড্যানিয়েলা জে. লামাস 



















