কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনায় সাধারণত সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় সফটওয়্যার প্রকৌশলী, প্রোগ্রামার কিংবা প্রযুক্তি খাতের পেশাজীবীদের নাম। সাম্প্রতিক সময়ে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ছাঁটাই এবং এআই-নির্ভর উৎপাদনশীলতার উত্থান সেই ধারণাকে আরও শক্তিশালী করেছে। কিন্তু এই আলোচনার আড়ালে এমন একটি বৃহৎ কর্মীসমাজ রয়েছে, যাদের ভবিষ্যৎ হয়তো আরও অনিশ্চিত। তারা প্রযুক্তি জগতের আলোচিত মুখ নন; তারা বেতন ব্যবস্থাপনা কর্মী, হিসাবরক্ষণ সহকারী, মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা, গ্রাহকসেবা প্রতিনিধি কিংবা প্রশাসনিক কর্মী। আর এই কর্মক্ষেত্রগুলোর বড় অংশজুড়েই রয়েছেন নারী।
এআই-নির্ভর পরিবর্তনের প্রকৃত অভিঘাত কোথায় পড়তে পারে, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে প্রযুক্তি শিল্পের বাইরেও তাকাতে হবে। কারণ অর্থনীতির বহু গুরুত্বপূর্ণ চাকরি এমন কাজের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা নিয়মিত, তথ্যনির্ভর এবং পুনরাবৃত্তিমূলক। এ ধরনের কাজই বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সবচেয়ে সহজ লক্ষ্য।
মধ্যবিত্তের অদৃশ্য ভিত্তি
অনেকের কাছে অফিসের ‘ব্যাক-অফিস’ কাজগুলো তেমন আকর্ষণীয় মনে নাও হতে পারে। কিন্তু বাস্তবে এই চাকরিগুলোই অসংখ্য পরিবারের আর্থিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। এগুলো এমন পেশা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ ডিগ্রি ছাড়াও একটি সম্মানজনক আয় নিশ্চিত করতে পারে। বহু নারী, বিশেষ করে সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব সামলে যারা ঘরে বসে কাজ করতে চান, তাদের জন্য এসব পেশা দীর্ঘদিন ধরে একটি কার্যকর পথ তৈরি করেছে।
শিল্পায়নের যুগে যেমন কারখানার চাকরি অসংখ্য পুরুষকে মধ্যবিত্ত জীবনের সুযোগ দিয়েছিল, তেমনি প্রশাসনিক ও সহায়ক অফিস-চাকরিগুলো বহু নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার ভিত্তি গড়ে তুলেছে। এখন প্রশ্ন হলো, প্রযুক্তির নতুন ঢেউ কি সেই ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেবে?
ইতিহাসের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা
অর্থনৈতিক ইতিহাসে প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নতুন কিছু নয়। টাইপরাইটারের জায়গায় কম্পিউটার এসেছে, হিসাবের খাতার জায়গায় সফটওয়্যার এসেছে, ট্রাভেল এজেন্টদের জায়গা নিয়েছে অনলাইন বুকিং ব্যবস্থা। কিন্তু এসব পরিবর্তন ধীরে ধীরে ঘটেছিল। কর্মীরা নিজেদের নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সময় পেয়েছিলেন।
এআই-এর ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে। এর বিস্তার অত্যন্ত দ্রুত, এবং এর সক্ষমতা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে শ্রমবাজারের অভিযোজন ক্ষমতা পরীক্ষার মুখে পড়তে পারে। যে কর্মীরা নতুন দক্ষতা অর্জনের সুযোগ বা সামর্থ্য কম রাখেন, তাদের জন্য এই রূপান্তর বিশেষভাবে কঠিন হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, অতীতের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সময় অনেক নারী উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে নতুন পেশায় প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু আজ যেসব ক্ষেত্রকে নিরাপদ বলে মনে করা হয়েছিল—যেমন হিসাবরক্ষণ, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কিংবা তথ্য প্রক্রিয়াকরণ—সেগুলোর অনেকটাই এখন এআই-এর আওতায় চলে আসছে। ফলে আগের মতো সহজে বিকল্প খুঁজে পাওয়া নাও যেতে পারে।
শুধু চাকরি হারানো নয়, সুযোগ হারানোরও ঝুঁকি
এআই নিয়ে আলোচনায় সাধারণত চাকরি থাকবে কি থাকবে না, সেই প্রশ্নটিই প্রাধান্য পায়। কিন্তু আরও গভীর একটি সমস্যা রয়েছে। কর্মজীবনের অগ্রগতির জন্য অনেক চাকরি ‘সোপান’ হিসেবে কাজ করে। একজন রিসেপশনিস্ট হয়তো পরে গ্রাহকসেবা বিভাগে যান, সেখান থেকে মানবসম্পদ বা ব্যবস্থাপনা পর্যায়ে উন্নীত হন। এই ধারাবাহিকতা কর্মীদের অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা তৈরি করে।
যদি এআই সেই মধ্যবর্তী ধাপগুলোকে সংকুচিত করে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতের কর্মীরা কোথায় অভিজ্ঞতা অর্জন করবেন? প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো দক্ষ ব্যবস্থাপক খুঁজে পাবে না, কারণ সেই দক্ষতা তৈরির পথই আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। শ্রমবাজারের জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি এবং গভীর একটি চ্যালেঞ্জ।
তবু আতঙ্কই শেষ কথা নয়
প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের ইতিহাস একই সঙ্গে সতর্কতা ও আশার গল্প। প্রতিটি বড় প্রযুক্তিগত বিপ্লব কিছু চাকরি বিলুপ্ত করেছে, আবার নতুন ধরনের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষেত্রেও সেই সম্ভাবনা রয়েছে। অনেক কাজ পুরোপুরি প্রতিস্থাপিত না হয়ে বরং আরও উৎপাদনশীল হয়ে উঠতে পারে। কর্মীরা নতুন ভূমিকা পেতে পারেন, যা আজ কল্পনাও করা কঠিন।
তবে আশাবাদী হওয়ার অর্থ এই নয় যে ঝুঁকিকে উপেক্ষা করতে হবে। নীতিনির্ধারকদের এখন থেকেই বুঝতে হবে, প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের বোঝা সবার ওপর সমানভাবে পড়ে না। যেসব কর্মী বয়সে বড়, কম আয়ের, কম শিক্ষিত অথবা নতুন চাকরিতে স্থানান্তরের সুযোগ কম পান, তাদের জন্য বিশেষ সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো শ্রমবাজার ধ্বংস করবে না। কিন্তু এটি শ্রমবাজারের কাঠামো বদলে দিতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য যদি এমন কর্মীরা দেন, যারা এতদিন অর্থনীতির নীরব ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এসেছেন, তাহলে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি সবার জন্য সমান সুফল বয়ে আনবে না। ভবিষ্যতের প্রশ্ন তাই শুধু এআই কতটা শক্তিশালী হবে, তা নয়; বরং আমরা কতটা প্রস্তুত থাকব তার সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলার জন্য।
বেন ক্যাসেলম্যান 


















