২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর কয়েক দশক ধরে ভ্রান্ত হস্তক্ষেপ হিসেবে সমালোচিত শিল্পনীতি আবারও অর্থনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ক্ষেত্রে। তবে এই পুনরাগমনটি মূলত নেতৃত্ব দিচ্ছে সেই উন্নত অর্থনীতিগুলোই, যারা একসময় শিল্পনীতিকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগের জোর এই পরিবর্তনকে আরও ত্বরান্বিত করেছে। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এই নতুন বাস্তবতা সুযোগ তৈরি করলেও, সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হলে তাদের তিনটি বড় সীমাবদ্ধতা দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে। এগুলো হলো সহায়ক পরিবেশের দুর্বলতা, নীতিনির্ধারণে সীমিত স্বায়ত্তশাসন এবং তীব্র আর্থিক সংকট।
শিল্পনীতি বলতে সাধারণত ভর্তুকি বা করছাড়কে বোঝানো হয়। কিন্তু বহু উন্নয়নশীল অর্থনীতির ক্ষেত্রে এর চেয়ে অনেক বেশি কাঠামোগত প্রস্তুতির প্রয়োজন। নির্ভরযোগ্য ডিজিটাল সংযোগ, স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ, বিশ্বাসযোগ্য তথ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর প্রবৃদ্ধির স্বপ্ন কেবল বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। একই সঙ্গে উন্নয়নশীল দেশগুলোর নীতিগত সুযোগও সংকুচিত। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নিয়ম রপ্তানিনির্ভর ভর্তুকি, স্থানীয় উপাদান ব্যবহারের শর্ত কিংবা প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো নীতিগত হাতিয়ার ব্যবহারে সীমা টেনে দিয়েছে, যেগুলো একসময় পূর্ব এশিয়ার শিল্পায়নের সাফল্যের ভিত্তি ছিল।

এর বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও চীন নিজেদের মতো করে বৃহৎ পরিসরে শিল্পনীতি প্রয়োগ করে যাচ্ছে, অনেক সময় অন্যদের জন্য প্রযোজ্য নিয়মকানুন ভেঙে বা শিথিল করে। এই বৈষম্য স্পষ্ট। ২০২৩ সালে বিশ্বজুড়ে প্রণীত দুই হাজার পাঁচ শতাধিক শিল্পনীতি উদ্যোগের প্রায় অর্ধেকই এসেছে এই তিন অর্থনীতি থেকে। একই সঙ্গে আর্থিক চাপ উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। অনেক দেশে সরকারি ব্যয়ের প্রায় ৮০ শতাংশই বেতন ও ঋণ পরিশোধে চলে যায়, ফলে দীর্ঘমেয়াদি শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের সুযোগ খুবই সীমিত থাকে। যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো বিশাল ভর্তুকি প্যাকেজ কিংবা বহু বিলিয়ন ডলারের প্রযুক্তি কর্মসূচি পরিচালনা করার সক্ষমতা এসব দেশের নেই।
এই বাস্তবতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো বিদ্যমান উন্নত ও পরিণত মডেলগুলোকে কাজে লাগানো। পুরোনো অবকাঠামোর বোঝা না থাকায় এসব দেশ অনেক ক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তিতে সরাসরি লাফ দিতে পারে, যেমনটি তারা একসময় স্থলভিত্তিক টেলিফোন বাদ দিয়ে সরাসরি মোবাইল ফোনে চলে গিয়ে করেছিল। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করার খরচ এটি তৈরি করার তুলনায় অনেক কম। ডেটা সেন্টার গড়ে তোলা বা অভিজাত প্রকৌশলী দল ছাড়াই এখন যে কেউ চ্যাটজিপিটির মতো সরঞ্জাম ব্যবহার করতে পারে।

এই ধরনের লক্ষ্যভিত্তিক প্রয়োগ অত্যন্ত পরিবর্তন আনতে সক্ষম। স্বাস্থ্য খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক রোগ নির্ণয় সীমিত চিকিৎসা সক্ষমতার আরও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারে। শিক্ষাক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম দীর্ঘদিনের শিক্ষক সংকট অনেকটাই পুষিয়ে দিতে পারে। কৃষিতে পূর্বাভাসভিত্তিক বিশ্লেষণ জলবায়ু অস্থিরতার মধ্যে কৃষকদের সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে। এসব ব্যবহার প্রযুক্তির সর্বাধুনিক প্রান্তে থাকা মানুষদের চোখে হয়তো খুব আকর্ষণীয় মনে নাও হতে পারে, কিন্তু যেখানে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন সেখানে বাস্তব সুফল দিতে পারে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর সরকারকে প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতেও ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ তেলনির্ভর অর্থনীতি অ্যাঙ্গোলায় শুল্ক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার ফলে উল্লেখযোগ্য রাজস্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। এক বছরে রাজস্ব বেড়েছে ৪৪ শতাংশ এবং পরের বছরে আরও ১৩ শতাংশ, কারণ পুরোনো কাগজভিত্তিক জটিলতা দূর হয়েছিল। ইরাকে ফলাফল ছিল আরও নাটকীয়। প্রধান সীমান্ত পয়েন্টগুলো ডিজিটাল হওয়ার পর এক বছরের মধ্যে শুল্ক আদায় ১২০ শতাংশের বেশি বেড়ে যায়। আর এশিয়ার দ্রুততম বর্ধনশীল উৎপাদন অর্থনীতিগুলোর একটি বাংলাদেশে ধাপে ধাপে ডিজিটাল সংস্কারের ফলে কয়েক বছর ধরে গড়ে প্রায় ১১ শতাংশ হারে বার্ষিক রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, কারণ কর পরিপালন বেড়েছে এবং ফাঁস বন্ধ হয়েছে।

শামিকা সিরিমান্নে ও তাফেরে তেসফাচিউ 



















