০৮:২৭ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১১ এপ্রিল ২০২৬
বর্তমান প্রেক্ষাপটে হিলারি ক্লিনটনের কলাম: মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে পরিবার নিয়ে ভাবতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় নতুন দৌড়: ভিডিও মডেলে এগিয়ে আলিবাবা, প্রতিদ্বন্দ্বিতায় উত্তাপ এআই-চালিত আয়ে শক্ত বার্তা দিল অ্যামাজন, চিপ ব্যবসাও ২০ বিলিয়ন ডলারের পথে সিডনির আলো-ছায়ায় রোজি হান্টিংটন-হোয়াইটলি, নতুন প্রচ্ছদে নজরকাড়া উপস্থিতি চার বছরের বিরতির পর মঞ্চে বিটিএস, দক্ষিণ কোরিয়া থেকে শুরু বিশাল বিশ্ব সফর এআই চাহিদায় তেজি টিএসএমসি, প্রথম প্রান্তিকে আয় বেড়েছে ৩৫ শতাংশ ক্যাটসআই: পর্দার বাইরে গড়া এক উন্মাদনা, নতুন যুগের মেয়েদের দলে ভক্তির নতুন ভাষা হলিউডের ভাটা, বিশ্ব সিনেমার জোর—কান উৎসব ২০২৬-এ আর্টহাউস ঝলক এনভিডিয়ার বাইরে নতুন পথ? নিজস্ব এআই চিপ ভাবনায় অ্যানথ্রপিক চার রাজ্য, চার মুখ্যমন্ত্রী—২০২৬ সালের নির্বাচনে ‘মুখ’ই শেষ কথা

উদ্ধারের মুখোশে লুটপাটের নীলনকশা: কিউবা থেকে ইরান, একই আমেরিকান গল্প

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র যখনই ‘উদ্ধার’-এর কথা বলে, ইতিহাস তখনই অন্য এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। কিউবাকে ঘিরে সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই পুরোনো চিত্রই আবার সামনে এনেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, কিউবার সরকার পরিবর্তনের নানা কৌশল নতুন করে বিবেচনায় নিচ্ছে ওয়াশিংটন। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো, জ্বালানি অবরোধের মতো কঠোর পদক্ষেপের কথাও আলোচনায় রয়েছে। এই চাপের লক্ষ্য রাষ্ট্র নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকেরা।

এই খবর আলাদা করে পড়লে এটি হয়তো একটি সাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখলে স্পষ্ট হয়, কিউবা কোনো বিচ্ছিন্ন লক্ষ্য নয়। ‘উদ্ধার’ নামের এই নীতির পরিণতি সবসময়ই লুটপাট, অবরোধ আর অস্থিরতা।

Congress Passes American Rescue Plan Act Following Biden Proposal, Delivers  Comprehensive Relief for IATSE Members - IATSE

লাতিন আমেরিকা: হস্তক্ষেপের পরীক্ষাগার

লাতিন আমেরিকা বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। চিলিতে গণভোটে নির্বাচিত সালভাদোর আলেন্দে যখন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তখন গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান নয়, বরং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর সামরিক অভ্যুত্থানের পথ বেছে নেয় ওয়াশিংটন। এর ফল ছিল দীর্ঘ স্বৈরশাসন, দমনপীড়ন আর রক্তপাত।

গুয়াতেমালায় ভূমি সংস্কারের কারণে উৎখাত হন নির্বাচিত নেতা। নিকারাগুয়ায় সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়। পানামায় সামরিক হস্তক্ষেপের নামে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় শহর। ভেনেজুয়েলায় আজও চলছে নিষেধাজ্ঞা, অভ্যুত্থানচেষ্টা আর রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই।

The Masks Are Falling Off - by Tyler Sage

পশ্চিম এশিয়া: ‘উদ্ধার’-এর ভয়াবহ মূল্য

পশ্চিম এশিয়ায় এই নীতির মূল্য আরও ভয়াবহ। ইরানে তেল জাতীয়করণের পর নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বৈরিতার সূচনা। ইরাকে স্বাধীনতার অজুহাতে আগ্রাসন দেশটিকে ঠেলে দেয় বিশৃঙ্খলা আর সন্ত্রাসে। আফগানিস্তানে দুই দশকের দখলদারির পরও সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। লিবিয়ায় বেসামরিক সুরক্ষার নামে হস্তক্ষেপ দেশটিকে খণ্ডিত করেছে।

নিষেধাজ্ঞা: মানুষের বিরুদ্ধে নীরব অস্ত্র

এই নীতির স্থায়ী হাতিয়ার নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা সরকার বদলায় না, বরং আঘাত হানে সাধারণ মানুষের জীবনে। ইরাকে শিশু মৃত্যুর ইতিহাস, ইরানে ওষুধ সংকট, ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক বিপর্যয়—সবই এর উদাহরণ। এখন কিউবার সামনে জ্বালানি অবরোধের আশঙ্কা, যার অর্থ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যোগাযোগ অচল হয়ে পড়া আর গভীর অর্থনৈতিক সংকট।

যে নিষেধাজ্ঞা ইরাককে পঙ্গু করে দিয়েছিল

এই ইতিহাস নিয়ে কীভাবে ‘উদ্ধারক’ দাবি করা যায়

প্রশ্নটা এখানেই। অভ্যুত্থান, যুদ্ধ আর নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ ইতিহাস থাকা একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিজেকে অন্য দেশের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে। চিলি, ইরাক, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতার পরও ইরানের জন্য ‘উদ্ধার’-এর প্রতিশ্রুতি কি বিশ্বাসযোগ্য।

ইরানের প্রতি বৈরিতার কাঠামোগত কারণ

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আবেগের নয়, কাঠামোগত। কয়েক দশক ধরে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বাইরে স্বাধীন অবস্থান ধরে রেখেছে। সম্পদ হস্তান্তরে অস্বীকৃতি আর প্রতিরোধের এই মডেলই ওয়াশিংটনের অস্বস্তির মূল কারণ। তাই ‘উদ্ধার’-এর ভাষা আসলে প্রতিরোধ ভাঙতে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।

Why the United States Is Not Truly Seeking the Collapse of Iran's Regime -  Hasht-e Subh

একই পথ, ভিন্ন ভাষা

রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালেও নীতি বদলায়নি। সর্বোচ্চ চাপ, নিষেধাজ্ঞা আর হুমকির পর আসে ‘উদ্ধার’-এর প্রতিশ্রুতি। এই উদ্ধার মানে আত্মসমর্পণ। যে দেশ তা মানে না, তাকে দিতে হয় কঠিন মূল্য।

অতীত আর বর্তমানের যোগসূত্র

কিউবা নিয়ে আজকের আলোচনা, ইরান ঘিরে চাপ—সবই একটি দীর্ঘ প্রকল্পের অংশ। এর লক্ষ্য গণতন্ত্র নয়, বরং লুটপাটনির্ভর এক বৈশ্বিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। ইতিহাস দেখায়, প্রকৃত উদ্ধার হলে এত দেশ একই অভিজ্ঞতা বহন করত না। ইরানের বিরুদ্ধে ক্রমাগত চাপ তাই একটাই বার্তা দেয়—প্রতিরোধ সম্ভব, তবে তার মূল্য আছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বর্তমান প্রেক্ষাপটে হিলারি ক্লিনটনের কলাম: মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রে পরিবার নিয়ে ভাবতে হবে

উদ্ধারের মুখোশে লুটপাটের নীলনকশা: কিউবা থেকে ইরান, একই আমেরিকান গল্প

০৩:০০:৩৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬

বিশ্ব রাজনীতির মঞ্চে যুক্তরাষ্ট্র যখনই ‘উদ্ধার’-এর কথা বলে, ইতিহাস তখনই অন্য এক বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে। কিউবাকে ঘিরে সাম্প্রতিক তৎপরতা সেই পুরোনো চিত্রই আবার সামনে এনেছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যাচ্ছে, কিউবার সরকার পরিবর্তনের নানা কৌশল নতুন করে বিবেচনায় নিচ্ছে ওয়াশিংটন। অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো, জ্বালানি অবরোধের মতো কঠোর পদক্ষেপের কথাও আলোচনায় রয়েছে। এই চাপের লক্ষ্য রাষ্ট্র নয়, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা—এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকেরা।

এই খবর আলাদা করে পড়লে এটি হয়তো একটি সাময়িক রাজনৈতিক ঘটনা মনে হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় দেখলে স্পষ্ট হয়, কিউবা কোনো বিচ্ছিন্ন লক্ষ্য নয়। ‘উদ্ধার’ নামের এই নীতির পরিণতি সবসময়ই লুটপাট, অবরোধ আর অস্থিরতা।

Congress Passes American Rescue Plan Act Following Biden Proposal, Delivers  Comprehensive Relief for IATSE Members - IATSE

লাতিন আমেরিকা: হস্তক্ষেপের পরীক্ষাগার

লাতিন আমেরিকা বহু দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির পরীক্ষাগার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। চিলিতে গণভোটে নির্বাচিত সালভাদোর আলেন্দে যখন দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর জাতীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, তখন গণতন্ত্রের প্রতি সম্মান নয়, বরং অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা আর সামরিক অভ্যুত্থানের পথ বেছে নেয় ওয়াশিংটন। এর ফল ছিল দীর্ঘ স্বৈরশাসন, দমনপীড়ন আর রক্তপাত।

গুয়াতেমালায় ভূমি সংস্কারের কারণে উৎখাত হন নির্বাচিত নেতা। নিকারাগুয়ায় সহিংসতা উসকে দেওয়া হয়। পানামায় সামরিক হস্তক্ষেপের নামে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় শহর। ভেনেজুয়েলায় আজও চলছে নিষেধাজ্ঞা, অভ্যুত্থানচেষ্টা আর রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার লড়াই।

The Masks Are Falling Off - by Tyler Sage

পশ্চিম এশিয়া: ‘উদ্ধার’-এর ভয়াবহ মূল্য

পশ্চিম এশিয়ায় এই নীতির মূল্য আরও ভয়াবহ। ইরানে তেল জাতীয়করণের পর নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি বৈরিতার সূচনা। ইরাকে স্বাধীনতার অজুহাতে আগ্রাসন দেশটিকে ঠেলে দেয় বিশৃঙ্খলা আর সন্ত্রাসে। আফগানিস্তানে দুই দশকের দখলদারির পরও সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলায়নি। লিবিয়ায় বেসামরিক সুরক্ষার নামে হস্তক্ষেপ দেশটিকে খণ্ডিত করেছে।

নিষেধাজ্ঞা: মানুষের বিরুদ্ধে নীরব অস্ত্র

এই নীতির স্থায়ী হাতিয়ার নিষেধাজ্ঞা। নিষেধাজ্ঞা সরকার বদলায় না, বরং আঘাত হানে সাধারণ মানুষের জীবনে। ইরাকে শিশু মৃত্যুর ইতিহাস, ইরানে ওষুধ সংকট, ভেনেজুয়েলার অর্থনৈতিক বিপর্যয়—সবই এর উদাহরণ। এখন কিউবার সামনে জ্বালানি অবরোধের আশঙ্কা, যার অর্থ বিদ্যুৎ বিভ্রাট, যোগাযোগ অচল হয়ে পড়া আর গভীর অর্থনৈতিক সংকট।

যে নিষেধাজ্ঞা ইরাককে পঙ্গু করে দিয়েছিল

এই ইতিহাস নিয়ে কীভাবে ‘উদ্ধারক’ দাবি করা যায়

প্রশ্নটা এখানেই। অভ্যুত্থান, যুদ্ধ আর নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ ইতিহাস থাকা একটি রাষ্ট্র কীভাবে নিজেকে অন্য দেশের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুলে ধরে। চিলি, ইরাক, লিবিয়া, ভেনেজুয়েলার অভিজ্ঞতার পরও ইরানের জন্য ‘উদ্ধার’-এর প্রতিশ্রুতি কি বিশ্বাসযোগ্য।

ইরানের প্রতি বৈরিতার কাঠামোগত কারণ

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ আবেগের নয়, কাঠামোগত। কয়েক দশক ধরে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী ব্যবস্থার বাইরে স্বাধীন অবস্থান ধরে রেখেছে। সম্পদ হস্তান্তরে অস্বীকৃতি আর প্রতিরোধের এই মডেলই ওয়াশিংটনের অস্বস্তির মূল কারণ। তাই ‘উদ্ধার’-এর ভাষা আসলে প্রতিরোধ ভাঙতে ব্যর্থতার স্বীকারোক্তি।

Why the United States Is Not Truly Seeking the Collapse of Iran's Regime -  Hasht-e Subh

একই পথ, ভিন্ন ভাষা

রাজনৈতিক নেতৃত্ব বদলালেও নীতি বদলায়নি। সর্বোচ্চ চাপ, নিষেধাজ্ঞা আর হুমকির পর আসে ‘উদ্ধার’-এর প্রতিশ্রুতি। এই উদ্ধার মানে আত্মসমর্পণ। যে দেশ তা মানে না, তাকে দিতে হয় কঠিন মূল্য।

অতীত আর বর্তমানের যোগসূত্র

কিউবা নিয়ে আজকের আলোচনা, ইরান ঘিরে চাপ—সবই একটি দীর্ঘ প্রকল্পের অংশ। এর লক্ষ্য গণতন্ত্র নয়, বরং লুটপাটনির্ভর এক বৈশ্বিক ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা। ইতিহাস দেখায়, প্রকৃত উদ্ধার হলে এত দেশ একই অভিজ্ঞতা বহন করত না। ইরানের বিরুদ্ধে ক্রমাগত চাপ তাই একটাই বার্তা দেয়—প্রতিরোধ সম্ভব, তবে তার মূল্য আছে।