দীর্ঘদিন ধরে নিজেদের চীনা পরিচয় আড়াল করে বৈশ্বিক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিতি গড়ে তুলেছিল দ্রুত ফ্যাশন জায়ান্ট শেইন। প্রধান কার্যালয় সিঙ্গাপুরে স্থানান্তর, প্রতিষ্ঠাতার প্রকাশ্য উপস্থিতি এড়িয়ে চলা—সব মিলিয়ে কোম্পানিটি নিজেকে একটি আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই তুলে ধরতে চেয়েছে।
কিন্তু এবার সেই অবস্থান থেকে দৃশ্যত সরে এসেছে শেইন। প্রতিষ্ঠাতা শু ইয়াংতিয়ান বিরল এক জনসমক্ষে উপস্থিত হয়ে জোর দিয়ে বলেছেন, গুয়াংডং-ই শেইনের শিকড় এবং এখান থেকেই তাদের পথচলা শুরু।
গুয়াংজু সম্মেলনে বার্তা
২৪ ফেব্রুয়ারি গুয়াংজুতে প্রাদেশিক সরকারের আয়োজিত এক সম্মেলনে শু ইয়াংতিয়ান শত শত অংশগ্রহণকারী ও শীর্ষ প্রাদেশিক নেতাদের সামনে বক্তব্য রাখেন। সরাসরি সম্প্রচারিত সেই অনুষ্ঠানে তিনি জানান, গুয়াংডং প্রদেশে সরবরাহ শৃঙ্খল আরও শক্তিশালী ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে শেইন ১০ বিলিয়ন ইউয়ানের বেশি বিনিয়োগ করবে।

তিনি বলেন, প্রদেশের উৎপাদন খাতের উচ্চমানের উন্নয়নে সহায়তা করা শেইনের মূল লক্ষ্য। কোম্পানির এই ঘোষণাকে কেবল বিনিয়োগ পরিকল্পনা নয়, বরং একটি কৌশলগত বার্তা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
পরিচয় বদলের নাটকীয় মোড়
হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান মার্কাম এশিয়ার সহ-প্রতিষ্ঠাতা ড্রু বার্নস্টাইনের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শেইন নিজেকে চীনা শিকড় থেকে দূরে সরিয়ে সিঙ্গাপুর-ভিত্তিক বহুজাতিক সরবরাহ নেটওয়ার্কের কোম্পানি হিসেবে তুলে ধরেছিল। সেই অবস্থান থেকে হঠাৎ এই প্রত্যাবর্তন এক নাটকীয় পরিবর্তন।
বৈশ্বিক পুঁজিবাজারে প্রবেশের চেষ্টায় শেইন বারবার বাধার মুখে পড়েছে। বিশেষ করে সরবরাহ শৃঙ্খলে জোরপূর্বক উইঘুর শ্রম ব্যবহারের অভিযোগ কোম্পানির ভাবমূর্তিতে প্রভাব ফেলেছে। ২০২১ সালে প্রধান কার্যালয় সিঙ্গাপুরে সরালেও নিউ ইয়র্কে প্রাথমিক শেয়ার ইস্যুর প্রচেষ্টা নানা কারণে সফল হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা ভেস্তে গেলে কোম্পানিটি লন্ডনের দিকে ঝুঁকে পড়ে। কিন্তু সেখানেও জটিলতা দেখা দেয়। কারণ, যেখানেই তালিকাভুক্তির চেষ্টা হোক না কেন, চীনে বিস্তৃত সরবরাহ নেটওয়ার্কের কারণে বেইজিংয়ের অনুমোদন অপরিহার্য হয়ে ওঠে।
হংকং আইপিও ও বেইজিংয়ের বার্তা
বর্তমানে শেইন হংকংয়ে তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত আগস্টে ব্লুমবার্গ জানায়, বেইজিংয়ের সবুজ সংকেত পেতে কোম্পানিটি চীনে পুনরায় ঘনিষ্ঠ অবস্থান নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
এই প্রেক্ষাপটে গুয়াংজু সম্মেলনে শু ইয়াংতিয়ানের উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। বিশ্লেষকদের মতে, এটি চীনের ডিজিটালায়ন ও আধুনিকায়ন নীতির সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্যপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরার একটি বুদ্ধিদীপ্ত পদক্ষেপ। একই সঙ্গে হংকংয়ের সক্রিয় আইপিও বাজারে প্রবেশের আগে নিজেদের দায়িত্বশীল করপোরেট নাগরিক হিসেবে উপস্থাপনের প্রচেষ্টাও এতে স্পষ্ট।
গুয়াংডংয়ে অবদান ও কর্মসংস্থান
বক্তৃতায় শু ইয়াংতিয়ান গুয়াংডংয়ে শেইনের অবদান তুলে ধরেন। এই প্রদেশেই কোম্পানির সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রধান কেন্দ্র। আশপাশের এলাকাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ছোট ছোট পোশাক কারখানাগুলো থেকেই তৈরি হয় সস্তা ব্লাউজ ও স্কার্ট, যা বিদেশি ক্রেতাদের চাহিদা মেটায়।

তার দাবি, গুয়াংজুতে প্রায় ১০ হাজার সরবরাহকারীর সঙ্গে কাজ করছে শেইন এবং এর মাধ্যমে ৬ লাখের বেশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। আগামী তিন বছরে একটি সীমান্তপার ই-কমার্স পরীক্ষামূলক প্রকল্পে যুক্ত হয়ে ছোট কারখানাগুলোকে সহায়তা করবে কোম্পানিটি।
স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, প্রাদেশিক নেতা থেকে শুরু করে বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের দিকনির্দেশনা ও সহায়তা ছাড়া শেইনের সাফল্য সম্ভব হতো না।
সিঙ্গাপুর-যুক্তরাষ্ট্র প্রসঙ্গ এড়িয়ে চলা
দুই বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রের এক থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক অনুষ্ঠানে শেইনের নির্বাহী চেয়ারম্যান ডোনাল্ড ট্যাং বলেছিলেন, সরবরাহ শৃঙ্খল ও কর্মীদের কারণে প্রতিষ্ঠানটি চীনা, সদর দপ্তরের কারণে সিঙ্গাপুরীয় এবং মূল্যবোধের দিক থেকে আমেরিকান।
কিন্তু এবার শু ইয়াংতিয়ানের বক্তব্যে সিঙ্গাপুর বা যুক্তরাষ্ট্রের কোনো উল্লেখ ছিল না। বরং তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানান, শেইন গুয়াংডংয়ে শিকড় গেড়ে ভবিষ্যতেও এখানেই বিকশিত হবে।
সব মিলিয়ে শেইনের এই অবস্থান পরিবর্তনকে হংকংয়ে সম্ভাব্য আইপিওর আগে বেইজিংয়ের সমর্থন নিশ্চিত করার কৌশল হিসেবেই দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















