যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরে বোয়িংয়ের জন্য নতুন উড়োজাহাজ অর্ডারের সম্ভাবনা তৈরি হলেও, বিশ্লেষকদের মতে এটি মার্কিন বিমান নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি সংকট কাটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। বরং প্রত্যাশার তুলনায় ছোট আকারের সম্ভাব্য এই চুক্তি দেখাচ্ছে যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতিতে বোয়িং এখনও কঠিন বাস্তবতার মুখে দাঁড়িয়ে আছে।
দুই দিনের বেইজিং সফর শেষে ট্রাম্প জানান, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছেন। ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “২০০টি বড় বোয়িং উড়োজাহাজ, এটি অনেক কর্মসংস্থান তৈরি করবে।”
তবে ট্রাম্প নিজেই পরে বলেন, এটি “এক ধরনের প্রতিশ্রুতি” বা “ঘোষণার মতো” হতে পারে। ফলে চুক্তির প্রকৃতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। বেইজিং থেকেও এখনও আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ আসেনি।
সম্ভাব্য এই অর্ডারের খবর প্রকাশের পর যুক্তরাষ্ট্রে বোয়িংয়ের শেয়ারদর ৪ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যায়। পরে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে ট্রাম্প বলেন, ২০০ উড়োজাহাজ সরবরাহের পর বোয়িং “ভালো কাজ করলে” আরও ৭৫০টি উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রুতিও রয়েছে। তিনি জানান, এসব উড়োজাহাজে জেনারেল ইলেকট্রিক ইঞ্জিন সরবরাহ করবে।
চীনের বাজারে পিছিয়ে বোয়িং
গত এক দশকে চীনের বাজারে বোয়িং ক্রমাগত চাপে পড়েছে। ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী এয়ারবাস সেখানে নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে। একই সঙ্গে চীনের নিজস্ব নির্মাতা কোম্যাকও দ্রুত এগিয়ে আসছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০ উড়োজাহাজের সম্ভাব্য অর্ডার বোয়িংয়ের জন্য প্রতীকী গুরুত্ব রাখলেও বাজারে তাদের হারানো অবস্থান ফিরিয়ে আনতে এটি যথেষ্ট নয়।
বিমান বিশ্লেষণা প্রতিষ্ঠান সিরিয়ামের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে চীনে ১ হাজার ৮৩০টি বোয়িং উড়োজাহাজ চালু রয়েছে। বিপরীতে এয়ারবাসের উড়োজাহাজের সংখ্যা ২ হাজার ২১৯। এছাড়া বোয়িংয়ের আরও ১৮০টি উড়োজাহাজ সরবরাহের অপেক্ষায় আছে।
অন্যদিকে কোম্যাকের ১ হাজার ১৭৯টি উড়োজাহাজ অর্ডার অবস্থায় রয়েছে, যা সরবরাহ শুরু হলে চীনা কোম্পানিটি বোয়িংয়ের সঙ্গে ব্যবধান আরও কমিয়ে আনতে পারবে।
২০১৭ সালে ট্রাম্পের আগের চীন সফরে বেইজিং ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ৩০০টি বোয়িং উড়োজাহাজ অর্ডার করেছিল। সেটিই ছিল চীনের পক্ষ থেকে বোয়িংয়ের জন্য সর্বশেষ বড় অর্ডার। এরপর থেকেই দেশটিতে এয়ারবাসের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে।

কোম্যাকের উত্থান
বিশ্লেষক শুকোর ইউসুফ বলেন, কোম্যাকের সি৯১৯ উড়োজাহাজ এখন চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে ক্রমেই বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। এটি বিদেশি উড়োজাহাজের প্রতি চীনের আগ্রহ কমার ইঙ্গিত দেয়।
তার মতে, অনেকেই ধারণা করেছিলেন ট্রাম্পের সফরে বোয়িং বড় ধরনের সাফল্য পাবে। কিন্তু বাস্তবে চীন অত্যন্ত হিসাব করে দরকষাকষি করছে।
সিঙ্গাপুরভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ডেজান শিরা অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের পরিচালক ডেভিড স্টেপাট বলেন, “২০০ উড়োজাহাজের অর্ডার আলোচনা আবার শুরু করতে পারে, কিন্তু এটি বোয়িংয়ের বাজার অংশীদারিত্ব পুনর্গঠন করতে পারবে না।”
প্রযুক্তি ও চিপ নিয়ন্ত্রণই মূল ইস্যু
চীন সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে একদল মার্কিন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা গেলেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তি প্রকাশ পায়নি। তবে খবর এসেছে, কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের কাছে উন্নত এনভিডিয়া চিপ বিক্রির অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
ট্রাম্প ফেরার পথে বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্র থেকে “বিলিয়ন ডলারের” সয়াবিনও কিনবে।
বিশ্লেষকদের মতে, উড়োজাহাজ, সয়াবিন ও গরুর মাংসের মতো পণ্য চীনের জন্য গ্রহণ করা সহজ হলেও, বেইজিংয়ের মূল লক্ষ্য হচ্ছে উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চিপ রপ্তানিতে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা।
ডেভিড স্টেপাটের ভাষায়, এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াংয়ের শেষ মুহূর্তে প্রতিনিধি দলে যোগ দেওয়াই দেখিয়ে দেয় আসল আলোচনা কোন খাতকে ঘিরে চলছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















