ভারতের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠক শেষ হয়েছে কোনও যৌথ ঘোষণা ছাড়াই। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে চলমান উত্তেজনা নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে মতভেদ থাকায় ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে নয়াদিল্লি।
শুক্রবার বৈঠক শেষে ভারতের প্রকাশিত “চেয়ারস স্টেটমেন্ট অ্যান্ড আউটকাম ডকুমেন্ট”-এ বলা হয়, সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজ নিজ জাতীয় অবস্থান তুলে ধরেছে এবং চলমান সংকট দ্রুত সমাধানের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে। পাশাপাশি নিরাপদ সামুদ্রিক বাণিজ্য, জ্বালানি অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং বেসামরিক মানুষের সুরক্ষার বিষয়ও আলোচনায় উঠে আসে।
ব্রিকস জোটে বর্তমানে ভারত, ব্রাজিল, রাশিয়া, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইথিওপিয়া, মিসর ও ইন্দোনেশিয়া রয়েছে। ২০২৪ সালে ইরান ও আমিরাত এই জোটে যোগ দেয়।
মধ্যপ্রাচ্য উত্তেজনায় বৈঠকে চাপ
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর বৈঠকে বলেন, বিশ্ব এখন “অভূতপূর্ব ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার” মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, চলমান সংঘাত, সমুদ্রপথে ঝুঁকি এবং জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার আশঙ্কা বৈশ্বিক পরিস্থিতির ভঙ্গুরতাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
এই বৈঠকেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের বরাতে বলা হয়, তিনি অভিযোগ করেন যে আমিরাত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সহযোগিতা করেছে এবং নিজেদের ঘাঁটি, আকাশসীমা ও বিভিন্ন সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ দিয়েছে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগেই আবুধাবি এক বিবৃতিতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর গোপন সফরের খবর অস্বীকার করেছিল। তবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় দাবি করে, নেতানিয়াহু গোপনে আমিরাত সফর করেছেন এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।

ইরানের কড়া অবস্থান
ব্রিকস বৈঠকে দেওয়া পৃথক বক্তব্যে আরাঘচি বলেন, “ইরান সম্পর্কিত কোনও সমস্যার সামরিক সমাধান নেই।” তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ব্রিকস দেশগুলোর প্রতি এসব কর্মকাণ্ডের স্পষ্ট নিন্দা জানানোর আহ্বান জানান।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের কারণে এবারের ব্রিকস বৈঠক আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দিল্লিভিত্তিক জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শ্রীকান্ত কন্দাপল্লি বলেন, মূল প্রশ্ন ছিল—এত বিভক্ত অবস্থানের মধ্যেও জোটটি কোনও যৌথ অবস্থানে পৌঁছাতে পারে কি না।
তিনি উল্লেখ করেন, সৌদি আরবও ব্রিকসে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছে, যদিও এখনও আনুষ্ঠানিক সদস্য হয়নি। তাঁর মতে, সৌদি আরব যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে, কারণ ইরান সাম্প্রতিক সংঘাতে আমিরাত ও সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র হিসেবে দেখছে।
ভারতের কূটনৈতিক ভারসাম্য
বিশ্লেষক অমিত রঞ্জন বলেন, ভারতের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল এমন অবস্থান নেওয়া, যা একদিকে তার নিজস্ব অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করবে, অন্যদিকে গ্লোবাল সাউথের নেতৃত্বের দাবিও বজায় রাখবে।
বৈঠক শেষে প্রকাশিত নথিতে গাজা পরিস্থিতি এবং লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দাব প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা নিয়ে কিছু অনুচ্ছেদে “এক সদস্যের আপত্তি” থাকার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও সেই সদস্য দেশের নাম প্রকাশ করা হয়নি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















