বাংলাদেশে ১২ ফেব্রুয়ারি যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে বলে এখনও ধরে নেওয়া হয়েছে বা হবেই। এই নির্বাচনে বাংলাদেশের রাজনীতির ন্যাচারাল আলাই জামায়াত ও বিএনপি দুই ভাগে ভাগ হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। দৃশ্যত নির্বাচনটি দুই পক্ষের মধ্যে মনে হলেও বাস্তবে নির্বাচনটি নিজেদের মধ্যে। তাই এখানে যেই জয়লাভ করুক না কেন, কোনো পার্থক্য নেই।
তবে এই নির্বাচনে একটি সম্মানজনক ভোটার উপস্থিতি ও ভোট পাওয়ার জন্য উভয় পক্ষই আওয়ামী লীগের ভোটারদের তোষামোদ করছে। যোগাযোগ করছেন আওয়ামী লীগের নানানভাবে লুকিয়ে থাকা নেতাদের সঙ্গে। এমনকি দীর্ঘকাল যারা কট্টর আওয়ামী লীগ বিরোধী “টকার” ছিল তারা এখন সবক দিচ্ছে আওয়ামী লীগের ভোটারদের কাদের ভোট দেওয়া উচিত।
আবার যারা ওই অর্থে কোনো টকার বা সাংবাদিক ছিল না কিন্তু হঠাৎই মুহাম্মদ ইউনূস ক্ষমতায় আসার পরে সাহসী হয়ে ওঠে। এবং তারা কয়েকদিন শেখ হাসিনার বিরোধিতা করে ধীরে ধীরে ইউনূস সরকারের বিরোধিতায় নেমে যায়। সিমপ্যাথি পায় বোকা আওয়ামী লীগারদের। এখন সেই বোকা আওয়ামী লীগারদের বিভ্রান্ত করার জন্য তারা বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে—আওয়ামী লীগ কেন জামায়াত–বিএনপির কোন পক্ষকে ভোট দেবে—তা কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে—ইত্যাদি ইত্যাদি। অর্থাৎ তারাও মেটিকুলাস ডিজাইনের অংশ আওয়ামী বিরোধিতায়।

শুধু আওয়ামী লীগের ভোটার দিয়ে টানাটানি নয়, ইতোমধ্যে “সব থেকে মিডিয়া বান্ধব সরকার” পাওয়া মিডিয়াতে যুক্তিপূর্ণ লেখা ছাপা হচ্ছে—আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে এই একই মায়ের পেটের যমজ ভাই ভাইয়ে নির্বাচন কেন বৈধ হবে তার স্বপক্ষে। আওয়ামী লীগ কেন নির্বাচন করতে পারবে না তার পক্ষে কড়া যুক্তি তুলে ধরা হচ্ছে।
তাদের যুক্তি হলো ব্রিটিশ লেবার নেতা স্টারমারের বিরুদ্ধে যদি মানুষ রাস্তায় নামত এবং স্টারমার যদি ভলকারের হিসাব মতো ১৪০০ মানুষ গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দিতেন। এবং এক পর্যায়ে আর্মি যদি গুলি করতে অস্বীকার করত। সর্বোপরি স্টারমার যদি ওই গণঅভ্যুত্থানের ফলে ফ্রান্সে পালিয়ে যেতেন তাহলে কি লেবাররা নির্বাচনের সুযোগ পেত ব্রিটেনে?
বাস্তবে খুবই সঠিক যুক্তি। এটাকে সরাসরি মুদ্রার একটি পিঠ হিসেবে বাংলাদেশে বসিয়ে দেওয়া যায়। এবং সেখানে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে নির্বাচন করার যুক্তিতে অনেক বৈধতা থাকে।
কিন্তু ব্রিটেনে যেহেতু ঘটনাটি ঘটেনি। এটা শুধুমাত্র “এক্স ইকুয়াল” ধরে একটা অঙ্ক করা হয়েছে। তাই এ অঙ্ক বা উদাহরণের মুদ্রার অপর পিঠটি নেই। কিন্তু বাংলাদেশের ঘটনায় তো অপর পিঠ আছে। বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকার উৎখাতের আন্দোলনকে প্রথমে বলা হয়েছিল “কোটা বিরোধী” আন্দোলন। আর আন্দোলন শেষ হলে, প্রথমে “দ্বিতীয় স্বাধীনতা”, এর পরে “বিপ্লব”, সর্বশেষ হাসিনা সরকার উৎখাতের মূল নায়ক হিসেবে যাকে ক্ষমতায় বসানো হলো—সেই মুহাম্মদ ইউনূস বললেন, এটা একটি মেটিকুলাস ডিজাইনড প্ল্যানের ফল। এবং তিনি সর্বশেষ বলেছেন, সেনাবাহিনী থেকে তিনি সমর্থন না পেলে এই প্ল্যান বাস্তবায়ন করা সম্ভব হতো না।

পাশাপাশি এই আন্দোলনে থাকা সিরাজগঞ্জ বিএনপি নেতা দাবি করেছেন, তার নেতৃত্বে সিরাজগঞ্জ থানা আক্রমন করে পুলিশ হত্যা করা হয়। উল্লেখ্য সেখানে একজন গর্ভবতী মহিলা পুলিশ তার গর্ভের শিশুটিকে রক্ষা করার জন্য প্রাণভিক্ষা চেয়েও বাঁচতে পারেননি। আর সিরাজগঞ্জের ওই বিএনপি নেতা দাবি করেন, তারা ওইভাবে পুলিশ হত্যা না করলে হাসিনা সরকারকে উৎখাত করা সম্ভব হতো না। আন্দোলনের তথাকথিত সমন্বয়করা টিভি পর্দায় এসে দাবি করেছে তারা যদি পুলিশ হত্যা না করত, সেতু ভবন, মেট্রোরেল, পদ্মা সেতু ও টেলিভিশন সেন্টারে আগুন না দিত—তাহলে শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করতে পারত না।
সরকারি হিসাবে পুলিশ হত্যা করা হয়েছে তিন শতের কিছু বেশি। বেসরকারি অনেক মাধ্যম বলেছে এ তিন হাজারেরও বেশি হবে। র্যাব সদস্যও হত্যা করা হয়েছে। র্যাবে থাকা সেনাবাহিনীর সদস্যও হত্যা করা হয়েছে। আর এদের সবাইকে হত্যা করেছে আন্দোলনকারীরা।
হত্যা যে আন্দোলনকারীরা করেছে তার আইনগত প্রমাণও কিন্তু মুহাম্মদ ইউনূস সরকার তৈরি করেছেন। কারণ, পুলিশ, র্যাব, সেনাবাহিনীর সদস্য যাদেরকে আন্দোলনকারীরা হত্যা করেছে—এরা কোনো বিচার পাবে না এই মর্মে ইউনূস সরকার হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দিয়েছে। যখন কোনো আন্দোলনকারীর কর্মকাণ্ডের জন্য ইনডেমনিটি দেওয়া হয়—তখন ইনডেমনিটির মাধ্যমে তারা যেমন আইনের হাত থেকে বিচারের বাইরে থাকে, তেমনি বাস্তবতায় ও ইতিহাসে তারা যে গণআন্দোলনকারী নয়—সেটাও প্রমাণিত হয়। কারণ, গণআন্দোলনে বিজয় মানে গোটা জাতির বিজয়; সেখানে কোনো ইনডেমনিটি লাগে না। তাই সরকারের ইনডেমনিটি প্রমাণ করে দিয়েছে মুহাম্মদ ইউনূস সত্য বলেছেন—শেখ হাসিনার সরকার উৎখাত হয়েছে একটি মেটিকুলাস ডিজাইনড প্ল্যানের মাধ্যমে।

আর যখন কোনো মেটিকুলাস ডিজাইন প্ল্যানের কাছে কোনো বৈধ রাজনৈতিক দল হেরে যায়—তখন ওই রাজনৈতিক দল কৌশলের কাছে পরাজিত হয়, রাজনীতির কাছে পরাজিত হয় না। পৃথিবীর ইতিহাসে এর ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। এবং এটাও সত্য ওই রাজনৈতিক দলের রাজনীতিও শেষ হয়ে যায় না। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে।
যে কারণে একদিকে যেমন সবাই ভোটের জন্য আওয়ামী লীগের ভোটার ও নেতাদের কাছে যাচ্ছে। যার মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার মতো পর্যাপ্ত ভোটের অধিকারী আওয়ামী লীগ।
আর যেহেতু মেটিকুলাস ডিজাইনে আওয়ামী লীগকে উৎখাত ও নির্বাচনের বাইরে রাখা হয়েছে তাই সারাক্ষণ চেষ্টা চলছে, যুক্তি হাজির করা হচ্ছে—একপক্ষীয় এই নির্বাচনের বৈধতার স্বপক্ষে। যার ভেতর দিয়ে প্রমাণিত হচ্ছে আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে তার বৈধতায় ভঙ্গুর অবস্থান রয়ে গেছে।


লেখক: সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 
























