মাত্র কয়েকদিন আগে বাগেরহাট থেকে নয় মাস বয়সী সন্তানের লাশ পৌঁছেছিল যশোর কারাগারে, বন্দি পিতা ছাত্রলীগ নেতা সাদ্দামের কাছে। সেই শোক এখনও শুকোয়নি। তারই মধ্যে আরেক হৃদয়বিদারক দৃশ্য—এবার সন্তানের সামনে এলো পিতার মরদেহ। শোক, বেদনা আর অসহায়তার ভারে নুয়ে পড়া এই মুহূর্ত যেন কারাগারের দেয়াল ভেদ করে ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে।
বাবার জানাজায় অংশ নিতে প্যারোলে মুক্তির আবেদন করেছিল কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে বন্দি আওয়ামী লীগের কর্মী মিলন মিয়ার পরিবার। কিন্তু সেই আবেদন নামঞ্জুর হয়। শেষ পর্যন্ত বাবার মরদেহই নিয়ে আসা হয় কারাগারের ফটকে, যাতে অন্তত শেষবারের মতো বাবাকে দেখতে পারেন তিনি। বুধবার দুপুরে কারাফটকে দাঁড়িয়ে বাবার নিথর দেহ দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন মিলন মিয়া।
মিলন মিয়া (৪৫) কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার পানাউল্লার চর এলাকার বাসিন্দা। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় করা একটি মামলায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। ওই মামলায় জামিন পেলেও সম্প্রতি বিশেষ ক্ষমতা আইনের আরেক মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। তারা আরও দাবি করেন, মিলন মিয়া আওয়ামী লীগের কোনও পদ-পদবির সঙ্গে যুক্ত নন।

স্বজন ও আইনজীবীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মিলনের বাবা ফুল মিয়া (৭০) দীর্ঘদিন ক্যানসারে ভুগছিলেন। মঙ্গলবার দুপুরে ভৈরবের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। মৃত্যুর পর বাবার জানাজায় অংশ নেওয়ার সুযোগ চেয়ে পরিবারের পক্ষ থেকে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করা হলেও তা নাকচ করা হয়। পরিবর্তে মরদেহ কারা ফটকে এনে দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়।
মিলনের চাচা মতিউর রহমান বলেন, কারাগারের ভেতরে বাবার মরদেহ দেখে মিলন কান্নায় ভেঙে পড়ে। প্যারোলে মুক্তির জন্য অনেক চেষ্টা করা হলেও শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হতে হয়েছে। তাই মরদেহ কারাগারে আনতে বাধ্য হন তারা।
তিনি আরও জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ভৈরব থানা পুলিশ মিলনকে গ্রেফতার করে। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি একটি মামলায় জামিন পেলেও বিশেষ ক্ষমতা আইনের আরেক মামলায় তাকে আবার গ্রেফতার দেখানো হয়। তাকে দেখতে কারাগারে প্রবেশের অনুমতি মিললেও অন্য স্বজনরা কেবল সাধারণ সাক্ষাতের সুযোগ পান। প্রায় ৬০ কিলোমিটার দূর থেকে মরদেহ কারাগারে আনতে হয়েছে—যে সময়ে পরিবারের সবার থাকার কথা ছিল দাফন-কাফনে।

আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল মোমেন ভূঁইয়া বলেন, মিলনের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনও অভিযোগ নেই। একটি মামলায় জামিন পাওয়ার পর নতুন মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। তিনি কোনও রাজনৈতিক দলের পদে নেই এবং কোনও মামলার এজাহারনামীয় আসামিও নন। সন্দেহের ভিত্তিতেই তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
কিশোরগঞ্জ কারাগারের জেল সুপার রিতেশ চাকমা জানান, জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কার্যালয় থেকে পাঠানো নির্দেশনা অনুযায়ী কারাগারের ফটকে মরদেহ দেখার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















