বাংলাদেশে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও নির্বিচার গ্রেপ্তারের সংস্কৃতি আগের সরকারের সময়ে যেমন প্রোথিত ছিল, অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পরও তার ধারাবাহিকতা রয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সংস্থাটির প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ফৌজদারি মামলায় শত শত অজ্ঞাত ব্যক্তিকে সন্দেহভাজন হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রবণতাও অব্যাহত রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা ও সহিংসতার চিত্র
মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে জানানো হয়, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অন্তত চল্লিশজন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে চৌদ্দজন নির্যাতনের ফলে মারা গেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রায় আট হাজার মানুষ আহত এবং একাশি জন নিহত হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও গণগ্রেপ্তার
সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধিত ক্ষমতা ব্যবহার করে মে মাসে আওয়ামী লীগের ওপর সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়, যার আওতায় দলটির পক্ষে সভা, প্রকাশনা ও অনলাইন বক্তব্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের সন্দেহে শত শত নেতা, কর্মী ও সমর্থক বিচার ছাড়াই আটক রয়েছেন এবং নিয়মিত জামিন থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন। ফেব্রুয়ারিতে সংঘর্ষের পর শুরু হওয়া অভিযানে অন্তত আট হাজার ছয়শ গ্রেপ্তারের কথাও প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে।
গণমাধ্যম, মতপ্রকাশ ও সংখ্যালঘু নিরাপত্তা
দুই হাজার পঁচিশ সালে সাংবাদিকদের ওপর বহু হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেগুলোর বেশিরভাগই বেসরকারি গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক কর্মীদের হাতে সংঘটিত হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে লেখকদের বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। একই বছরে রংপুরে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘরে হামলা এবং পার্বত্য অঞ্চলে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
নারী অধিকার ও রোহিঙ্গা সংকট
যৌন ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা ব্যাপক থাকলেও ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ সীমিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে মিয়ানমারের সংঘাত থেকে পালিয়ে দুই হাজার চব্বিশ সালের শুরু থেকে এক লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। শিবিরগুলোতে সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতা, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়ছে। বিদেশি সহায়তা কমে যাওয়ায় খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবা সংকুচিত হয়েছে, যা রোগব্যাধি ও অপুষ্টি বৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি করছে।
জবাবদিহি ও সংস্কার প্রক্রিয়ার স্থবিরতা
জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে দুই হাজার চব্বিশ সালের আন্দোলন দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের কথা উঠে এলেও দায়ীদের বিচারে অগ্রগতি সীমিত। পুলিশ সদস্যদের অল্পসংখ্যক গ্রেপ্তার ছাড়া দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। অন্তর্বর্তী সরকার বিচারব্যবস্থা, নির্বাচন ব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কারে একাধিক কমিশন গঠন করলেও রাজনৈতিক ঐকমত্য অভাবে বেশিরভাগ সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি।

নির্বাচন সামনে, অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে
দুই হাজার ছাব্বিশ সালের বারো ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচন নির্ধারিত থাকলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং সংস্কার বাস্তবায়ন নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি। অতীতের গুম ও ভয়ের পরিবেশ কিছুটা কমলেও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের নির্বিচার আটক এবং সহিংস জনতার উত্থান পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে বলে মনে করছে মানবাধিকার সংস্থাটি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















