হান্না এলিস-পিটারসেন
বাংলাদেশে তারা এখন অপরাধী ও পলাতক হিসেবে চিহ্নিত। তাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধ, হত্যা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও আত্মসাতের অভিযোগ ঝুলছে। অথচ কলকাতার শপিং মলের ভিড়ঠাসা ফুড কোর্টে, কালো কফি আর ভারতীয় ফাস্টফুডের টেবিলে বসে নির্বাসিত আওয়ামী লীগ নেতারা নির্ভার ভঙ্গিতে নিজেদের রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা আঁকছেন।
প্রায় ১৬ মাস আগে বাংলাদেশের স্বৈরশাসক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হওয়া এক গণঅভ্যুত্থান তাকে নাটকীয়ভাবে দেশ ছাড়তে বাধ্য করে। ক্ষুব্ধ বিক্ষোভকারীরা তার বাসভবনের দিকে অগ্রসর হলে তিনি হেলিকপ্টারে করে ভারতে পালিয়ে যান। তিনি যে রক্তাক্ত রাজপথ রেখে গিয়েছিলেন, সেখানে জুলাই মাসের আন্দোলন দমনে তার সরকারের শেষ দফার অভিযানে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহত হয়েছিলেন প্রায় ১,৪০০ মানুষ।
এরপর তার দলের হাজারো নেতাকর্মীও দেশ ছেড়ে পালান। শাসনামলের অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে মামলা ও জনরোষের মুখে পড়তে হয়। কলকাতায় আশ্রয় নেন আওয়ামী লীগের অন্তত ৬০০ নেতা, যারা তখন থেকেই সেখানেই আত্মগোপনে রয়েছেন।
ভারত তাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জীবনরেখা হয়ে উঠেছে। এর মাধ্যমে দলীয় কর্মকাণ্ড ও সংগঠন টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে। গত বছরের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার জনচাপের মুখে আওয়ামী লীগকে স্থগিত ঘোষণা করে এবং দলটির সব কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। একই সঙ্গে হত্যা ও দুর্নীতিসহ নানা অভিযোগে শীর্ষ নেতাদের তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনা হয়। শেখ হাসিনার পতনের পর ১২ ফেব্রুয়ারিতে যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে, সেখানে অংশগ্রহণ বা প্রচারণা চালানো থেকেও দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
গত বছরের শেষ দিকে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়।
তবে নিজের রাজনৈতিক জীবনের ইতি টানার বিষয়টি তিনি মানতে নারাজ। রায়কে তিনি ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়ে ভারত থেকেই প্রত্যাবর্তনের ছক কষছেন। এর অংশ হিসেবে আসন্ন নির্বাচন বানচাল করতে হাজারো সমর্থককে সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে।
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে একটি গোপন ও কড়া নিরাপত্তায় ঘেরা আশ্রয়ে থেকে শেখ হাসিনা প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দলীয় বৈঠক ও বাংলাদেশে থাকা নেতাকর্মীদের সঙ্গে ফোনালাপ চালাচ্ছেন। ভারত সরকার—যারা ক্ষমতায় থাকার সময় তার ঘনিষ্ঠ মিত্র ছিল—এর নজরদারির মধ্যেই এসব কর্মকাণ্ড চলছে। বাংলাদেশ বারবার প্রত্যর্পণের অনুরোধ জানালেও ভারত তা উপেক্ষা করে আসছে।
গত এক বছরে কলকাতা থেকে সাবেক সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীসহ শীর্ষ নেতাদের নিয়মিত দিল্লিতে ডেকে পাঠানো হয়েছে দলীয় কৌশল নির্ধারণের জন্য। তাদের মধ্যে ছিলেন আওয়ামী লীগের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনা বাংলাদেশে থাকা দলীয় কর্মী, নেতা, তৃণমূল নেতৃত্ব ও বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখছেন। আসন্ন লড়াইয়ের জন্য দলকে প্রস্তুত করতে তিনি দিনরাত কাজ করছেন। ছাত্রলীগকে অন্তর্বর্তী সরকার ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের একাধিক মামলা রয়েছে, যা তিনি অস্বীকার করেছেন।
তিনি আরও বলেন, অনেক দিনই শেখ হাসিনা ১৫ থেকে ১৬ ঘণ্টা বৈঠক ও ফোনে ব্যস্ত থাকেন। তাদের বিশ্বাস, তিনি নায়ক হিসেবে দেশে ফিরবেন।
শেখ হাসিনার অধীনে হওয়া সর্বশেষ দুটি নির্বাচন ব্যাপক কারচুপির অভিযোগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে এক দশকের বেশি সময় পর দেশের প্রথম অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট।
তবে আওয়ামী লীগের দাবি, তাদের নির্বাচন থেকে বাদ দেওয়া মানেই গণতান্ত্রিক বৈধতার সব দাবি ভেঙে পড়া। তারা ইউনূসকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধপরায়ণ বলে অভিযুক্ত করেছে, যা তিনি নাকচ করেছেন।
শেখ হাসিনার সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেন, তারা তাদের কর্মীদের নির্বাচন বর্জন, প্রচারণা ও ভোটে অংশ না নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধেও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, যা তিনি অস্বীকার করেন।
বাংলাদেশে যারা আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকে স্বৈরাচারী ও লুটেরা হিসেবে দেখেছেন, তাদের কাছে দলটির হঠাৎ গণতন্ত্র, মানবাধিকার, স্বচ্ছতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলা গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের নথিতে বছরের পর বছর ধরে উঠে এসেছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে ভিন্নমত দমন করা হয়েছে। হাজারো মানুষ গুম, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালায় হত্যার শিকার হন। তার পতনের পরই অনেকের খোঁজ মেলে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও বিচার বিভাগের স্বায়ত্তশাসন ভেঙে পড়ে, আর নির্বাচন পরিণত হয় প্রহসনে।

তবে নতুন গণতান্ত্রিক পথে দেশকে ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও ইউনূসের সরকারও সমালোচনার মুখে পড়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতা এবং আইনশৃঙ্খলার অবনতির অভিযোগ উঠেছে। শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া ট্রাইব্যুনালও আন্তর্জাতিক মান না মানার অভিযোগে সমালোচিত হয়েছে।
দেশজুড়ে প্রতিশোধের নামে সহিংসতার ঢেউয়ে আওয়ামী লীগের অভিযোগ, তাদের শত শত কর্মী হামলার শিকার, নিহত বা বিনা জামিনে কারাবন্দি হয়েছেন। অনেকে এখনও আত্মগোপনে। সাদ্দাম হোসেন বলেন, তারা কারাভয়ের কারণে কলকাতায় নেই; দেশে ফিরলে হত্যার শিকার হবেন বলেই তারা এখানে।
ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন
কলকাতা ও দিল্লিতে আওয়ামী লীগের সক্রিয় উপস্থিতি ভারতকে অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। স্থগিত ঘোষিত একটি দলকে ভারতীয় ভূখণ্ডে কার্যক্রম চালাতে দেওয়া এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে খোঁজকরা রাজনৈতিক পলাতকদের আশ্রয় দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। শেখ হাসিনার পতনের পর দুই দেশের সম্পর্ক অবনতি হয়েছে, তবে কলকাতায় থাকা আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, ভারত তাদের ফেরত পাঠাবে—এ নিয়ে তাদের কোনো শঙ্কা নেই।
গত সপ্তাহে উত্তেজনা চরমে ওঠে, যখন দিল্লিতে এক জনসমাবেশে শেখ হাসিনা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে বক্তব্য দেন। গোপন আশ্রয়স্থল থেকে রেকর্ড করা ওই ভাষণে তিনি নির্বাচনকে নিন্দা করেন এবং ইউনূসকে জোর করে ক্ষমতা দখলের অভিযোগ এনে বাংলাদেশকে ‘রক্তে ভেজা দেশ’ বানানোর কথা বলেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ক্ষোভ প্রকাশ করে জানায়, দিল্লিতে এ ধরনের অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া এবং কথিত গণহত্যাকারী শেখ হাসিনাকে প্রকাশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি স্পষ্ট অবমাননা। ভারত সরকার এ বিষয়ে কোনো জবাব দেয়নি।
কলকাতার আরামদায়ক আবাসনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাদের মধ্যে নিজেদের শাসনামলে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ নিয়ে অনুশোচনা খুব একটা দেখা যায়নি। অধিকাংশই গণঅভ্যুত্থানকে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলন মানতে নারাজ। তাদের দাবি, এটি ছিল একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।

আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য এ এফ এম বাহাউদ্দিন নাসিম বলেন, এটি কোনো স্বাভাবিক বিপ্লব নয়, বরং তাদের গণতান্ত্রিক সরকার উৎখাতে সন্ত্রাসী দখল।
নিজের বিরুদ্ধে হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি হেসে বলেন, সবই ভুয়া।
নির্বাসিত নেতাদের প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা অনেকটাই নির্ভর করছে আসন্ন নির্বাচন ব্যর্থ হওয়ার ওপর। তাদের বিশ্বাস, এই নির্বাচন দেশে স্থিতিশীলতা আনবে না এবং শেষ পর্যন্ত মানুষ আবার আওয়ামী লীগের দিকেই ফিরবে।

কলকাতায় বসবাসরত সাবেক সংসদ সদস্য তানভীর শাকিল জয় ছিলেন হাতে গোনা কয়েকজনের একজন, যিনি অতীতের কিছু ‘ভুল’ স্বীকার করেন। তিনি বলেন, তারা সাধু ছিলেন না, কর্তৃত্ববাদী ছিলেন এবং পুরোপুরি গণতান্ত্রিক ছিলেন না। ২০১৮ সালের নির্বাচন পুরোপুরি কার্যকর ছিল না বলেও তিনি স্বীকার করেন।
দুর্নীতি ও লুটপাটের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, অনিয়ম ছিল এবং কিছু আর্থিক বিষয় ঘটেছে, যার দায় নিতে হবে। তবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে রাষ্ট্রকোষ থেকে আনুমানিক ২০০ বিলিয়ন ডলার পাচারের অভিযোগ তিনি অস্বীকার করেন।
কলকাতায় থাকা অনেকের মতো তিনিও মনে করেন, তার নির্বাসন দীর্ঘস্থায়ী হবে না, যদিও দেশে ফিরলে কারাবাসের সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি বলেন, এখন তাদের সময় অন্ধকার, কিন্তু তা চিরস্থায়ী হবে না।
Sarakhon Report 



















