২০০৪ সালের একুশে আগস্ট বাসায় ফিরতে ফিরতে ২২ আগস্ট হয়ে যায়। রাত একটারও বেশ পরে অফিসের কাজ সেরে বাসায় ফিরি। বাসায় ফিরতেই চিত্রা জানান, তোমার মোবাইল ফোন বন্ধ পেয়ে অনেকেই বাসায় ফোন করেছে। তোমাকে অফিসেও পাওয়া যায়নি।
অফিসে ফিরতে দেরি হয়েছিলো। অফিসের টেলিফোন অপারেটর সেকসনকে বলে রেখেছিলাম, কেউ ফোন করলে বলবে আমি অফিসে নেই। কারণ, ঘণ্টা তিনেকের মধ্যে দুটো লেখা শেষ করতে হয়েছিলো।
যাক সে কথা, যারা ফোন করেছিলেন তাদের লিস্ট দেখে মনে মনে হিসাব করি, এঁদের ভেতর এই রাত দুটোয় একমাত্র আতাউস সামাদ ভাই জেগে আছেন। তাই ফ্রেশ না হয়েই তাঁকেই আগে ফোন করি।
দেখলাম সামাদ ভাই বেশ উৎকণ্ঠিত, ওই দিনের ঘটনার আমি কোথায় কতটুকু নিজ চোখে দেখেছি তা তিনি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞাসা করেন। যথাসম্ভব উত্তর দেবার পরে, তিনি বলেন, “দেখ আমার কাছে তো শেখ হাসিনার নাম্বার আছে, কিন্তু এখন তার পলিটিকাল অ্যাসিস্ট্যান্টের দায়িত্ব পালন যিনি করেন তার নাম্বারও নেই, নামও নেই। তুমি কি কাল সকালে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে, আমার জন্যে একটা সময় বের করে দিতে পারবে? কাল অনেক মানুষ আসবেন। আমার সেখানে গিয়ে কিছু সময় বা যতটা সময় লাগে বসে থাকতেও কোন অসুবিধা নেই।”

আমি বলি, আজ আমরা সাংবাদিকরা যা দেখে এলাম তাতে কালও তো অনেক ভীড় থাকবে। আপনি যাবেন এর ভেতর?
আমার এ ধরনের কথায় আতাউস সামাদ ভাই একটু বিরক্ত হলেন। সে বিরক্তি অবশ্য স্বরে নয়, অতি ভদ্র ভাষার লাইন বিট্যুইন। তিনি বলেন,
“শেখ সাহেবের মেয়েকে হত্যা চেষ্টা হয়েছে। ভদ্র মহিলা ভাগ্যগুণে বেঁচে আছেন। ভীড় বলে তাকে দেখতে যাবো না! আমার তো রাতে যাওয়াই উচিত ছিলো।”
আতাউস সামাদ ভাই ও তাদের আগের জেনারেশন অর্থাৎ আমাদের পিতা ও পিতৃব্যদের জেনারেশন বঙ্গবন্ধুকে “শেখ সাহেব” বলেই সম্বোধন করতেন। বাস্তবে এই বেঙ্গলে অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে দুজন মানুষকে একটা সময়ে শিক্ষিত, অশিক্ষিত, ধনী-দরিদ্র সকলেই শুধু নামের একটি অংশের সঙ্গে “সাহেব” শব্দ জুড়ে দিলে চিনতেন। একজন “হক সাহেব” অর্থাৎ শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, আর তার পরে “শেখ সাহেব” অর্থাৎ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তাছাড়া বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাংবাদিক হিসেবেও আতাউস সামাদ অনেক বড় বড় ঘটনার সঙ্গে জড়িত। যেমন ১৯৭১ সালে তখন ২৫ মার্চের শেষ প্রহর গড়িয়ে যাচ্ছে—ঘড়ি ২৬ মার্চে পড়তে যাচ্ছে। তাজউদ্দিন আহমদ, ড. কামাল হোসেন ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামকে বঙ্গবন্ধু বারান্দা অবধি এসে চলে যেতে বলেন। এ সময়ে তিনি দেয়ালের গায়ে একটা ছায়া দেখতে পান, বঙ্গবন্ধু সেদিকে এগিয়ে যেতেই আতাউস সামাদ বের হয়ে আসেন। এরপরের অংশ আতাউস সামাদ বিভিন্ন সময়ে বলেছেন ও লিখেছেন। তিনি দেয়ালের গায়ে ওভাবে লেপটে দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাজউদ্দিন আহমদ ও ড. কামাল হোসেনদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর মিটিং শেষ হলে তিনি তাঁর কাছ থেকে কোন কমেন্টস বা কোন এক্সক্লুসিভ পান কিনা এজন্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাঁর দিকে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে বলেন, এই খোকন (আতাউস সামাদের ডাক নাম) তুই আর এক মুহূর্ত এখানে থাকিস না। ওই দেখ পাশের বাড়ির ছাঁদে, গাছে ওরা (পাকিস্তানি আর্মি) অবস্থান নিয়েছে। এর পরে এখান থেকে বের হতে গেলে তোকে গুলি করবে। ওরা আমাকেও মেরে ফেলতে পারে। বঙ্গবন্ধুর কথার মাঝখানেই আতাউস সামাদ বলতে যান, আপনি—কিন্তু বঙ্গবন্ধু তাকে কথা বলতে না দিয়ে বলেন, শীঘ্রই চলে যা, “আর আমি তোদের স্বাধীনতা দিয়ে দিলাম। তোরা তা রক্ষা করিস।”
আতাউস সামাদ ভাইয়ের এ ঘটনা নিয়ে একটা গর্বও ছিলো। তার কয়েক মুহূর্ত পরে বঙ্গবন্ধু যে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন—ওই স্বাধীনতার কথা তিনিই প্রথম সাংবাদিক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর মুখ দিয়ে শুনেছিলেন। এবং তিনি গোটা বাঙালি জাতির কাছে এই বার্তা তাঁর মাধ্যমে পৌঁছে দিয়েছিলেন, যুগে যুগে এই স্বাধীনতা রক্ষার দায়িত্ব দেশবাসীর।
যাহোক, এ প্রসঙ্গ ভিন্ন। পরদিন সকালে বার কয়েক ফোন করেও সে সময়ের শেখ হাসিনার পলিটিকাল সেক্রেটারীর নাম্বার ব্যস্ত পাই। পরে মনে করি, ওখানে চলে যাই। সামাদ ভাইয়ের জন্য অ্যাপয়েন্টমেন্টও করে আসি—পাশাপাশি সেখানে গেলে নতুন কিছু নিউজ বা তথ্য তো পাবো।
আজকের বাংলাদেশে বসে ভাবা যায় না, সেদিন ওই ভয়ংকর ঘটনার পরেও শেখ হাসিনার ওখানে সাংবাদিক ও নেতা-কর্মীদের যাতায়ত ছিলো অবারিত। কোন আর্মি বা শক্ত পুলিশ বা র্যাব প্রহরা বসেনি।
শেখ হাসিনার পলিটিক্যাল সেক্রেটারি মমতাজ আহমদের খোঁজে দোতালায় উঠতে যাই। সিঁড়িতে পা দিতেই দেখি, এম আর আখতার মুকুল (চরম পত্র খ্যাত), কলিম শরাফী (বিশিষ্ট নাট্য ও রবীন্দ্র সঙ্গীত শিল্পী, গণনাট্যের শম্ভূ মিত্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু)। মুকুল ভাই আমাকে দেখে বলেন, প্রকৃত মৃত্যু ও আহতের তথ্য কি পেয়েছো? আইভি রহমান কি বেঁচে আছেন? আমি কোন উত্তর না দিয়ে বলি, ভাই বিকেলে অফিসে থেকে আপনার সাগর পাবলিশার্সে যাবো। বলে সিঁড়ির পাশে দাঁড়াতেই দেখি ফজলে হাসান আবেদ উঠছেন। তাকে ওঠার জন্যে পথ করে দিয়ে তার পিছে পিছে এগোতে থাকি। দোতালায় গিয়ে দেখি শেখ হাসিনা গতকালের থেকে কিছুটা সুস্থ অবস্থায় বসে আছেন। দুজন ডাক্তার বের হয়ে যাচ্ছেন। ভেতরে ডাঃ এস এ মালেক বসে আছেন। আরো বেশ কয়েকজন। রুমের ভেতর দাঁড়িয়ে আছেন শেখ হাসিনার পলিটিক্যাল সহকারী। এর ভেতর ফজলে হাসান আবেদ গিয়ে শেখ হাসিনার পাশের সোফায় বসলেন।

অন্যদিকে ডাঃ এস এ মালেক আমাকে হাতের ইশারায় ডাকলেন। একটু ইতস্তত করছি—ঢুকবো কিনা? কিন্তু ডা. এস এ মালেক আবার ডাক দিতেই ঢুকতে হলো।
ওই সময়ে আমি সার্বক্ষণিক রিপোর্টার ছিলাম না। তবে উপসম্পাদকীয় বা বিশেষ লেখা লেখার জন্যে তথ্যের খোঁজে সময় পেলেই ঘুরতাম।
যাহোক, ওনার সুধা সদনের ওই ড্রয়িং রুমে ঢুকতেই দেখি ফজলে হাসান আবেদ সোফা থেকে উঠতে যাচ্ছেন এবং তিনি একটা ব্যাগ ওই সোফার পাশে রাখার চেষ্টা করছেন আর বলছেন, তিনি দ্রুত চলে এসেছেন। এখানে মাত্র ২৫ (২৫ লাখ) আছে, তিনি পরে আরো পাঠাবেন।
শেখ হাসিনা তাকে বাধা দিচ্ছেন। আর বলছেন, কোন দরকার নেই। অন্যদিকে ফজলে হাসান আবেদ বলছেন, আপনার এখন অনেক খরচ। আপনার অনেক দরিদ্র কর্মী আহত হয়েছেন, অনেক পরিবার তার স্বজন হারিয়েছে। সবাইকে সাহায্য করতে হবে।
এর ভেতর শেখ হাসিনার পলিটিকাল অ্যাসিস্ট্যান্ট মমতাজ আহমদ রুম থেকে বের হতেই তার কাছে গিয়ে আতাউস সামাদ ভাইয়ের জন্যে সময়ের কথা বলতেই তিনি সঙ্গে সঙ্গে, “ও সামাদ ভাই”—এই শব্দ দুটো উচ্চারণ করে আতাউস সামাদকে ফোন করেন।
তিনি যখন ফোন করছেন তখন পাশ ফিরে তাকিয়ে দেখি ফজলে হাসান আবেদ নেমে যাচ্ছেন।
ফজলে হাসান আবেদ এমনটি করবেন, এটা স্বাভাবিক। কারণ, তাঁর রক্তধারা, বংশগতি, ১৯৭১ মুক্তিযুদ্ধের প্রতি তার কমিটমেন্ট—সব কিছু মিলে এই মানবিকতা ও ভদ্রতা তাঁর জন্যে স্বাভাবিক।

কিন্তু সাংবাদিক হিসেবে ওই সময়ে মনে হয়েছিলো, আচ্ছা দেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেত্রী, সর্বোপরি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার এই হত্যাচেষ্টার পরে দেশের অন্য বড় এনজিও নেতা ড. ইউনূস শেখ হাসিনাকে সহমর্মিতা জানাতে আসেন কিনা? তাছাড়া ক্ষমতায় থাকতে শেখ হাসিনা তাকে গ্রামীণ ফোন-এর মতো লাভজনক ব্যবসাও দিয়েছেন।
কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত ওই বাসার নানান লোকের কাছে খোঁজ নিয়েছিলাম। জানতে পারি তিনি আসেননি। অনেক পরে মতিয়া চৌধুরীর কাছে বলি, তিনি যদি কোন গল্পচ্ছলে শেখ হাসিনার কাছ থেকে জেনে দেন যে ড. ইউনূস তাকে সহমর্মিতা জানিয়ে ফোন করেছিলেন কিনা।
মতিয়া চৌধুরিও আমাকে পাল্টা প্রশ্ন করেছিলেন, তোমার এ কৌতূহল কেন? তার কাছে সত্য বলেছিলাম, ১৯৯১ সালের ইলেকশান রিপোর্টিং করতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় দেখেছি, গ্রামীণ ব্যাংকের কর্মীদের প্রতি নির্দেশ পাঠানো হয়েছে, আওয়ামী লীগের নৌকা মার্কায় ভোট না দেওয়ার জন্যে।
মতিয়া চৌধুরি তখন হেসে উত্তর দিয়েছিলেন, এ প্রশ্ন তারও ছিলো। এবং তিনি তাঁর নেতার (শেখ হাসিনা) কাছে জেনেছেন—ড. ইউনূস কোন ফোন করেননি।
লেখকঃ সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিক, সম্পাদক, সারাক্ষণ, The Present World।
স্বদেশ রায় 


















