চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বিশাল অমিল ধরা পড়েছে। সরকারি বাণিজ্য তথ্য বলছে, গত বছরে চীন যে পরিমাণ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর কথা জানিয়েছে এবং মার্কিন কাস্টমস যে পরিমাণ পণ্য বাস্তবে পৌঁছেছে বলে রেকর্ড করেছে—তার মধ্যে ব্যবধান ১১২ বিলিয়ন ডলার। এই বিশাল ফাঁক ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিপুল পরিমাণ পণ্য হয়তো উচ্চ শুল্কের নজর এড়িয়ে আমেরিকায় ঢুকেছে।
এই পরিস্থিতি শুধু রাজনীতি নয়, মার্কিন ব্যবসায়ীদের প্রতিযোগিতার মাঠেও বড় ধাক্কা হয়ে উঠছে।
শুল্কের চেয়ে ভয়ংকর শুল্ক ফাঁকি
আমেরিকান লন মাওয়ার কোম্পানির প্রেসিডেন্ট মাইকেল কার্সি দুই দশক আগে উৎপাদন চীনে সরিয়ে নেন। গত এক বছরে তিনি চীন থেকে পণ্য আনতে গিয়ে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিয়েছেন। কিন্তু তার অভিযোগ, প্রতিদ্বন্দ্বীরা একই পণ্য কম দামে বাজারে বিক্রি করছে—যা সম্ভব হচ্ছে শুল্ক ফাঁকির কারণে।
কার্সির ভাষায়, শুল্ক ব্যবসার খরচের অংশ হতে পারে, কিন্তু শুল্ক ফাঁকি সৎ ব্যবসার জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর। তিনি জানান, হোয়াটসঅ্যাপ ও ইমেইলে নিয়মিত এমন প্রস্তাব আসে যেখানে বলা হয়—চীন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পাঠানো যাবে অস্বাভাবিক কম খরচে, এমনকি প্রতি কেজি মাত্র ০.৭০ ডলারে, সব করসহ। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের প্রস্তাব নিজেই বড় সতর্কসংকেত।

ডিজিটাল লজিস্টিক প্ল্যাটফর্ম ফ্লেক্সপোর্টের প্রধান নির্বাহী রায়ান পিটারসেন বলেন, প্রস্তুত পণ্যের শুল্ক মূল্য অনুযায়ী নির্ধারিত হয়, ওজন অনুযায়ী নয়। তাই কেজি হিসেবে “সব মিলিয়ে” নির্দিষ্ট হার বলাটা স্পষ্ট প্রতারণার ইঙ্গিত।
বাণিজ্য তথ্যের অস্বাভাবিক অমিল
নতুন তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে চীন যে পরিমাণ পণ্য যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানির কথা জানিয়েছে, তার প্রায় এক-চতুর্থাংশ মার্কিন শুল্ক ব্যবস্থার আওতার বাইরে থেকে গেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ থাকলেও বর্তমান ব্যবধান আগের তুলনায় অনেক বড়।
ফেডারেল রিজার্ভের আগের গবেষণায় দেখা গিয়েছিল, এমন অমিলের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই শুল্ক ফাঁকির ফল। যদিও চীনের কর-রেয়াত নীতির মতো অন্যান্য কারণও ভুল তথ্য প্রদানের পেছনে ভূমিকা রাখে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক হার শতাব্দীর মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানোয় এখন এক ধরনের গোপন পরিবহন অর্থনীতি তৈরি হয়েছে, যেখানে নানা কৌশলে শুল্ক এড়িয়ে পণ্য ঢোকানো হচ্ছে। এতে প্রশ্ন উঠছে, দেশীয় উৎপাদন পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে।
ডেলিভার্ড ডিউটি পেইড পদ্ধতির অপব্যবহার

শুল্ক এড়ানোর একটি উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে ডেলিভার্ড ডিউটি পেইড পদ্ধতি। এ ব্যবস্থায় বিদেশি বিক্রেতা পরিবহন, কাস্টমস ছাড়পত্র এবং শুল্ক পরিশোধসহ সব দায়িত্ব নেয়। পদ্ধতিটি নিজে অবৈধ নয়, তবে সমস্যার শুরু হয় যখন পণ্যের মূল্য কম দেখানো বা ভিন্ন শ্রেণিতে দেখিয়ে কম শুল্ক আরোপ করানো হয়।
অনেক ক্ষেত্রে ক্রেতারা জানতেও পারেন না যে আইন ভঙ্গ হয়েছে। শুল্ক ঝুঁকি “ভাগাভাগি” করার প্রলোভন দেখিয়ে কিছু প্রতিষ্ঠান ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত খরচ কমানোর দাবি করে। এর ফলে বাজারে ১০ থেকে ২০ শতাংশ কম দামে পণ্য বিক্রি সম্ভব হচ্ছে, যা নিয়ম মেনে চলা প্রতিষ্ঠানগুলোর বাজার অংশীদারিত্ব কমিয়ে দিচ্ছে।
ভুয়া আমদানিকারক ও খোলস কোম্পানির জাল
শুল্ক ফাঁকির আরেক কৌশল হলো খোলস কোম্পানি বা অ-আবাসিক প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক আমদানিকারক হিসেবে দেখানো। পরে কর্তৃপক্ষ তদন্তে গেলে দেখা যায়, ঠিকানা বা ফোন নম্বর ভুয়া, আর প্রতিষ্ঠানটি ইতিমধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে।
সাবেক হোমল্যান্ড সিকিউরিটি কর্মকর্তা ক্যারি ওয়েন্স বলেন, কেউ যদি প্রতারণা করতে চায়, তাহলে দায় খোলস কোম্পানির ওপর চাপিয়ে সহজেই গা-ঢাকা দিতে পারে এবং নতুন নামে আবার ব্যবসা শুরু করতে পারে। তার মতে, এই ধরনের প্রতিষ্ঠান খুব দ্রুত গড়ে ওঠে এবং সাধারণ দেশীয় প্রতিষ্ঠানের মতোই দেখায়, ফলে শনাক্ত করা কঠিন হয়।
সম্পদের সীমাবদ্ধতা ও আইনি জটিলতা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে প্রায় একমাত্র, যেখানে বিদেশি অ-আবাসিক প্রতিষ্ঠানকে আনুষ্ঠানিক আমদানিকারক হিসেবে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হয়, এমনকি তাদের দেশে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি না থাকলেও।
যদিও ওয়াশিংটন বিষয়টি সম্পর্কে অবগত। বিদেশি আমদানিকারকদের কাছ থেকে সম্ভাব্য শুল্ক দায় মেটাতে পর্যাপ্ত সম্পদ রাখার বাধ্যবাধকতা বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে, কিন্তু তা এখনও আইনে পরিণত হয়নি। আরেকটি প্রস্তাবে “ফার্স্ট সেল” নিয়ম বাতিলের কথা বলা হয়েছে, যা সমালোচকদের মতে পণ্যের মূল্য কম দেখানোর সুযোগ তৈরি করে।
২০২৫ সালের আগস্টে ট্রাম্প প্রশাসন আন্তঃসংস্থাগত বাণিজ্য জালিয়াতি টাস্কফোর্স গঠন করে এবং হুইসেলব্লোয়ার কর্মসূচি চালু করে। একই সঙ্গে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করেছে, যাতে বন্দর ছাড়পত্রের আগেই সন্দেহজনক চালান শনাক্ত করা যায়।
তবে বাস্তবে সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। রাতারাতি উধাও হয়ে যাওয়া খোলস কোম্পানি বা চীনে অবস্থানরত অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। ফলে অনেক সময় শাস্তির ভার পড়ছে মার্কিন প্রতিষ্ঠানের ওপরই, যারা নিয়ম লঙ্ঘনের অভিযোগে জরিমানার মুখে পড়ছে।
দীর্ঘ তদন্ত প্রক্রিয়া
বর্তমানে ব্যবসায়ীদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে কাস্টমসের অভিযোগ পোর্টালে তথ্য জমা দিতে। এতে কর্তৃপক্ষ তদন্ত বা পণ্য জব্দ করতে পারে। তবে একটি সাম্প্রতিক ওয়েবিনারে কাস্টমস কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, তদন্ত ও প্রশাসনিক বা আইনি প্রক্রিয়া শেষ হতে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
অর্থাৎ, শুল্ক ফাঁকি রোধে পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, দ্রুত সমাধানের আশা করা যাচ্ছে না। এদিকে সৎ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কায় উদ্বিগ্ন। চীনের বিপুল রপ্তানি ফাঁক শুধু পরিসংখ্যান নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির কার্যকারিতা ও ন্যায্য প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















