ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন ভাষণ দেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। মঙ্গলবারের ওই ভাষণে তিনি দাবি করেন, তাঁর নেতৃত্বে আমেরিকায় শুরু হয়েছে “সোনালি যুগ”। তবে জনমত জরিপ বলছে, তাঁর জনপ্রিয়তা কমছে এবং আসন্ন নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভোটারদের অসন্তোষ বাড়ছে।
অর্থনীতি নিয়ে আত্মপ্রশংসা
রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ রয়েছে, এ বছর তারা কংগ্রেসে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে। সে প্রেক্ষাপটে ট্রাম্প ভাষণের প্রথম ঘণ্টা জুড়ে অর্থনীতির সাফল্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, তাঁর প্রশাসন মূল্যস্ফীতি কমিয়েছে, শেয়ারবাজারকে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে, বড় আকারের করছাড় দিয়েছে এবং ওষুধের দাম কমিয়েছে।
তবে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ তাঁর এই আশাবাদী বক্তব্যে কতটা সন্তুষ্ট হবেন, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। ট্রাম্প মূল্যবৃদ্ধির জন্য সাবেক প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে দায়ী করলেও জরিপ বলছে, জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে ব্যর্থতার জন্য অনেক ভোটার ট্রাম্পকেই দায়ী করছেন।
ভাষণ বর্জন ও রাজনৈতিক উত্তেজনা
ভাষণ শুরুর সময় কংগ্রেসের রিপাবলিকান সদস্যরা “ইউএসএ” স্লোগানে ট্রাম্পকে স্বাগত জানান। তবে ডেমোক্র্যাট সদস্যদের অনেক আসন ফাঁকা ছিল, কারণ অনেকে ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশে যোগ দিতে ভাষণ বর্জন করেন।
এই ভাষণ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন জরিপে দেখা যাচ্ছে অধিকাংশ আমেরিকান ট্রাম্পের পারফরম্যান্সে অসন্তুষ্ট। একই সময়ে ইরান ইস্যুতে উদ্বেগ বাড়ছে এবং তাঁর শুল্কনীতি বড় ধাক্কা খেয়েছে—কারণ যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বেশিরভাগ আমদানি শুল্ক বাতিল করেছে।
নাটকীয়তা ও রেকর্ড দীর্ঘ ভাষণ
প্রায় ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট স্থায়ী এই ভাষণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে কংগ্রেসে ট্রাম্পের দীর্ঘতম ভাষণের রেকর্ড ভেঙেছে। সাধারণত তাৎক্ষণিক মন্তব্যে পরিচিত ট্রাম্প এদিন তুলনামূলকভাবে লিখিত বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন, যদিও অভিবাসন ইস্যুতে তিনি ডেমোক্র্যাট সদস্যদের সঙ্গে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে জড়িয়ে পড়েন।
ভাষণের একপর্যায়ে তিনি বলেন, তাঁর আমলে যুক্তরাষ্ট্র বারবার “জিতেছে”। এরপর শীতকালীন অলিম্পিকে স্বর্ণপদকজয়ী মার্কিন পুরুষ আইস হকি দলের সদস্যদের কক্ষে আমন্ত্রণ জানানো হয়। গোলরক্ষক কনর হেলেবায়েককে তিনি প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অব ফ্রিডম দেওয়ার ঘোষণা দেন।
অর্থনীতির বাস্তবতা বনাম দাবি
ট্রাম্প দাবি করেন, মূল্যস্ফীতি দ্রুত কমছে। কিন্তু বাস্তবে কয়েক বছর আগের তুলনায় খাদ্য, আবাসন, বীমা ও ইউটিলিটি খরচ এখনও অনেক বেশি। সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক তথ্যে দেখা গেছে, গত প্রান্তিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কমেছে এবং একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বেড়েছে।
রয়টার্স/ইপসোস জরিপ অনুযায়ী, অর্থনীতি পরিচালনায় ট্রাম্পের প্রতি সমর্থন মাত্র ৩৬ শতাংশ। নভেম্বরে প্রতিনিধি পরিষদের সব ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হবে। ডেমোক্র্যাটরা আশা করছেন, তারা উভয় কক্ষেই নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাবেন।
ডেমোক্র্যাটদের পাল্টা বার্তা
ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে ভার্জিনিয়ার গভর্নর অ্যাবিগেইল স্প্যানবার্গার আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি বলেন, প্রেসিডেন্ট কি সত্যিই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা সাশ্রয়ী করতে কাজ করছেন? তাঁর মতে, উত্তর স্পষ্ট—না।
শুল্ক রায় ও সুপ্রিম কোর্ট

শুক্রবারের রায়ের পর ট্রাম্প সুপ্রিম কোর্টের সমালোচনা করলেও মঙ্গলবার তিনি সংযত ছিলেন এবং উপস্থিত বিচারপতিদের সঙ্গে করমর্দন করেন। তিনি রায়কে “দুঃখজনক” বললেও দাবি করেন, এতে তাঁর বাণিজ্যনীতি বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।
কূটনীতি, ইরান ও যুদ্ধের দাবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে তিনি কোনো আলোচনা করেননি, যদিও এই প্রযুক্তি শেয়ারবাজারে প্রভাব ফেলছে এবং চাকরির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। পররাষ্ট্রনীতি নিয়েও তিনি খুব কম কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, তাঁর আমলে আটটি যুদ্ধ শেষ হয়েছে—যা সমালোচকদের মতে অতিরঞ্জিত। ইউক্রেন যুদ্ধের চতুর্থ বার্ষিকী হলেও বিষয়টি প্রায় এড়িয়ে যান। চীন বা গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গেও তিনি কিছু বলেননি।
ইরান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কূটনৈতিকভাবে সমাধান চান, তবে বিশ্বের “সন্ত্রাসে প্রধান পৃষ্ঠপোষক” দেশকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেবেন না।
অভিবাসন নিয়ে উত্তপ্ত মুহূর্ত
অভিবাসন ইস্যুতে ট্রাম্প আগের মতোই কড়া অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, অনথিভুক্ত অভিবাসীদের কারণে সহিংস অপরাধ বেড়েছে—যদিও বিভিন্ন গবেষণায় এর প্রমাণ মেলেনি। ডেমোক্র্যাটদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তাদের লজ্জা হওয়া উচিত।

সাম্প্রতিক এক ঘটনায় মিনিয়াপোলিসে মুখোশধারী ফেডারেল এজেন্টদের গুলিতে দুই মার্কিন নাগরিক নিহত হওয়ার পর অনেকেই মনে করছেন, ট্রাম্পের অভিবাসন অভিযান অতিরিক্ত কঠোর হয়ে গেছে। ভাষণের সময় ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি ইলহান ওমর চিৎকার করে বলেন, “আপনি আমেরিকানদের হত্যা করেছেন।”
নির্বাচন ও বর্ণবাদ বিতর্ক
ট্রাম্প আবারও ভোট জালিয়াতির অভিযোগ তোলেন এবং ভোটার পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার পক্ষে কথা বলেন। ডেমোক্র্যাটরা মনে করেন, এ ধরনের আইন ভোটারদের অযথা চাপের মুখে ফেলবে এবং ভোটার উপস্থিতি কমাবে।
ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি আল গ্রিন “কালো মানুষ বানর নয়” লেখা প্ল্যাকার্ড দেখালে তাঁকে কক্ষ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এটি ট্রাম্পের পোস্ট করা একটি ভিডিওর প্রতিবাদে, যেখানে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও মিশেল ওবামাকে অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। পরে হোয়াইট হাউস ভিডিওটি সরিয়ে নেয়।
অন্যদিকে, প্রতিনিধি জিল টোকুদা সাদা জ্যাকেটে “সাশ্রয়ীতা” ও “স্বাস্থ্যসেবা” লেখা বার্তা প্রদর্শন করেন। কয়েকজন ডেমোক্র্যাট নারী “ফাইল প্রকাশ করুন” লেখা ট্যাগ পরেন, যা দণ্ডিত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনকে ঘিরে বিতর্কের প্রসঙ্গ। তাঁর অভিযোগকারীদের কয়েকজন ডেমোক্র্যাটদের অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















