ডিজিটাল যুগে সত্যের লড়াই এখন কেবল তথ্যের নয়, ভাষারও। সিঙ্গাপুরে দেখা যাচ্ছে, তথ্য যাচাইয়ের বেশিরভাগ কাজ ইংরেজিতে হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে প্রধানত মাতৃভাষায়। ফলে সমাজের ভিন্ন ভাষাভিত্তিক অংশ ভিন্ন বাস্তবতায় বিশ্বাস করতে শুরু করলে জাতীয় ঐকমত্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
ডিজিটাল অদৃশ্য যুদ্ধ
যারা নিয়মিত ইংরেজি ভাষায় সংবাদ ও বিনোদন অনুসরণ করেন, তারা হয়তো টেরই পাচ্ছেন না যে ডিজিটাল অঙ্গনে সত্যকে ঘিরে এক অদৃশ্য লড়াই চলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে চীনা ভাষায় তৈরি একাধিক চটকদার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব ভিডিওতে দাবি করা হচ্ছে, সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নাকি ‘অস্থিরতা’ ও ‘অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে’ জর্জরিত।
‘সিঙ্গাপুর রক্তাক্ত হতে শুরু করেছে’ কিংবা ‘সিঙ্গাপুরে বিশৃঙ্খলা’—এ ধরনের শিরোনাম ব্যবহার করে তৈরি এসব ভিডিও কেবল দর্শক টানার কৌশল নয়; এগুলো জনআস্থা ক্ষুণ্ন করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অর্থনীতির ওপর সন্দেহ তৈরি করতে পারে, যা শেষ পর্যন্ত জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়।

কম খরচে ভুয়া কনটেন্ট কারখানা
গবেষকেরা জানিয়েছেন, অত্যন্ত কম খরচে একটি সংগঠিত প্রক্রিয়ায় এসব ভিডিও তৈরি হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে স্ক্রিপ্ট লেখা, ভয়েসওভার তৈরি এবং স্বয়ংক্রিয় ভিডিও সম্পাদনা—সবই করা হচ্ছে কয়েক ডলারের মধ্যে। মাত্র ২০ মিনিটের একটি ভিডিও তৈরিতে খরচ হচ্ছে অতি সামান্য অর্থ।
এই প্রযুক্তির কারণে ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে অল্প সময়ের মধ্যেই শত শত ভিডিও আপলোড করা সম্ভব হচ্ছে। অধিকাংশ ভিডিওতেই আঞ্চলিক রাজনীতি নিয়ে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য পরিবেশন করা হচ্ছে।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, এসব চ্যানেলের ধরন ভিন্ন হলেও কিছু মিল রয়েছে। কেউ পুরোনো টেলিভিশন ফুটেজ বা স্টক ভিডিও ব্যবহার করছে দ্রুতগতির ভয়েসওভার ও ক্যাপশনসহ। আবার কেউ সরাসরি ক্যামেরার সামনে কথা বলছে। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, ভিন্ন ভিন্ন চ্যানেলে একই স্ক্রিপ্ট হুবহু ব্যবহার করা হচ্ছে।
এসব কনটেন্ট সরাসরি বেআইনি নয়, তাই নিয়ন্ত্রণ এড়াতে সক্ষম হচ্ছে। তবে তা বিভ্রান্তিকর ও উত্তেজনাপূর্ণ। এর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য, বিজ্ঞাপন আয়ের লোভ কিংবা ভবিষ্যতে আর্থিক প্রতারণার জন্য অনুসারী গড়ে তোলার কৌশল কাজ করতে পারে।
ভাষাগত অন্ধ স্পট

সিঙ্গাপুরের মতো বহুভাষিক সমাজে একটি বড় দুর্বলতা হলো ভাষাভিত্তিক নজরদারির ঘাটতি। ইংরেজি ভাষার কনটেন্ট তুলনামূলকভাবে বেশি পর্যবেক্ষণ ও যাচাইয়ের আওতায় থাকলেও মান্দারিন, মালয় ও তামিল ভাষার কনটেন্ট ততটা নজরদারিতে নেই।
আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, বিভ্রান্তিকর তথ্য পর্যবেক্ষণ ও খণ্ডনের কাজ মূলত উচ্চ আয়ের পশ্চিমা দেশের ভাষাগুলোতে সীমাবদ্ধ। সিঙ্গাপুরেও একই চিত্র দেখা যায়। ফলে মাতৃভাষাভিত্তিক তথ্য পরিবেশ অনেকটাই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে এই ভাষাগত ফাঁক একটি কাঠামোগত দুর্বলতা। অধিকাংশ বিশেষজ্ঞ যখন প্রধানত ইংরেজি তথ্য পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন, তখন অন্যান্য ভাষাভিত্তিক সম্প্রদায়ে ছড়িয়ে পড়া শত্রুভাবাপন্ন তথ্য প্রচারের প্রাথমিক সংকেত ধরা পড়ে না।
বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর স্বয়ংক্রিয় ফিল্টারও অ-ইংরেজি ভাষার সূক্ষ্মতা, আঞ্চলিক শব্দচয়ন ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট বুঝতে কম কার্যকর। ফলে বৈধ রাজনৈতিক আলোচনার সঙ্গে সমন্বিত ভুয়া প্রচারণার পার্থক্য নির্ধারণে তারা ব্যর্থ হয়।
ভাষা, পরিচয় ও বিভাজন
২০২০ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, প্রায় অর্ধেক বাসিন্দা ঘরে প্রধানত ইংরেজি ব্যবহার করেন। তবে বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, আর্থসামাজিক অবস্থা ও অভিবাসন পটভূমির সঙ্গে মাতৃভাষা ব্যবহারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, ভাষাগত দক্ষতা ব্যক্তির পরিচয় ও সংবাদ গ্রহণের ধরনকে প্রভাবিত করে। যদি মান্দারিন, মালয় বা তামিলভাষী জনগোষ্ঠী যথেষ্ট তথ্য যাচাই সহায়তা না পায়, তাহলে সমাজের ভিন্ন অংশ ভিন্ন ভাষার ডিজিটাল জগতে ভিন্ন বাস্তবতায় বিশ্বাস করতে শুরু করতে পারে। এতে জাতীয় ঐকমত্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ভুয়া তথ্য খণ্ডনে বিচ্ছিন্নতা
কোনো ভুয়া পোস্ট শনাক্ত হলেও তা খণ্ডনের ক্ষেত্রে ভাষাগত ব্যবধান বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণ হিসেবে, চীনা ভাষার একটি ভুয়া ভিডিও ভাইরাল হলে তার জবাব যদি কেবল ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়, তাহলে সেটি সংশ্লিষ্ট দর্শকদের কাছে পৌঁছাবে না।
মনস্তাত্ত্বিকভাবেও একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হয়। একদিকে উত্তেজনাপূর্ণ মাতৃভাষার ভিডিও, অন্যদিকে শুষ্ক ও আনুষ্ঠানিক ইংরেজি বিবৃতি—এই বৈপরীত্য সংশোধনী বার্তাকে দুর্বল করে। এমন পরিস্থিতিতে ভুয়া তথ্য ছড়ানো পক্ষ এটিকে ‘সরকারি দমননীতি’ হিসেবে উপস্থাপন করে ষড়যন্ত্রমূলক বর্ণনা তৈরি করতে পারে।
সমাধানের পথ
সিঙ্গাপুরের ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করতে হলে কেবল ইংরেজিনির্ভর প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বহুভাষিক ও সম্প্রদায়ভিত্তিক কৌশল।

প্রথমত, বহুভাষিক নজরদারি ও তথ্য যাচাই সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বিভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির সূক্ষ্মতা বোঝেন—এমন বিশেষজ্ঞ তৈরি করতে হবে। একই সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাই ব্যবহার করে অ-ইংরেজি কনটেন্টে অতিরঞ্জিত ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য দ্রুত শনাক্ত করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, মাতৃভাষায় দক্ষ ও নিজ নিজ সম্প্রদায়ে বিশ্বস্ত মতামতপ্রভাবকদের সক্রিয় ভূমিকা প্রয়োজন। তারা যে প্ল্যাটফর্মে ভুয়া তথ্য ছড়ায়—যেমন হোয়াটসঅ্যাপ, উইচ্যাট বা টেলিগ্রাম—সেখানেই একই ভাষায় সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে পারেন। পাশাপাশি ভুয়া ভিডিওর উদ্দেশ্য ও কৌশল সম্পর্কে আগাম সচেতনতা তৈরি করলে মানুষ আরও সমালোচনামূলকভাবে তথ্য গ্রহণ করতে পারবে।
সামাজিক স্থিতিশীলতার শর্ত
ডিজিটাল যুগে সিঙ্গাপুরের স্থিতিস্থাপকতা নির্ভর করছে এমন একটি অভিন্ন সত্যবোধের ওপর, যা জাতি, ভাষা, শিক্ষা বা সামাজিক অবস্থানের সীমা ছাড়িয়ে সবার মধ্যে ভাগাভাগি করা হয়। ভিন্ন ভাষাভিত্তিক বিচ্ছিন্ন বাস্তবতা তৈরি হলে তা রাষ্ট্রের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
বহুভাষিক প্রতিরক্ষা জোরদার করা গেলে বৈচিত্র্য আর দুর্বলতা নয়, বরং শক্তিতে পরিণত হবে। তবেই শত্রুভাবাপন্ন গোষ্ঠীগুলো ভাষাগত বিভাজনকে কাজে লাগাতে পারবে না, আর জাতীয় ঐক্যও অটুট থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















