ডাভোস থেকে আত্মবিশ্বাস নিয়ে ফিরেছিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। বৈশ্বিক নিয়ম ভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে জোরালো বক্তব্য আর মধ্যম শক্তির দেশগুলোর টিকে থাকার কৌশল তুলে ধরে তিনি আন্তর্জাতিক অভিজাতদের মন জয় করেন। সেই ভাষণের পর করা জনমত জরিপে দেখা যায়, কানাডার ভেতরেও তার প্রতি সমর্থন বাড়ছে। তবে এই রাজনৈতিক পুঁজি খুব দ্রুতই পরীক্ষার মুখে পড়ে।
ওয়াশিংটনের নতুন বাস্তবতা
ডাভোসের সাফল্যের পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আক্রমণাত্মক সুরে কানাডাকে নিশানা করেন। চীনের সঙ্গে কোনো সমঝোতা হলে কানাডার সব রপ্তানিতে শতভাগ শুল্ক আরোপের হুমকি দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট আলবার্টার বিচ্ছিন্নতাবাদী মনোভাবকে উসকে দিয়ে প্রদেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। জানুয়ারির শেষ দিকে ট্রাম্পের সঙ্গে দীর্ঘ ফোনালাপে কার্নির উপলব্ধি আরও স্পষ্ট হয়, যুক্তরাষ্ট্র আর আগের মতো নেই, স্বাভাবিকতার ধারণা ভেঙে পড়েছে।
অর্থনীতি ও জীবিকার চাপ
কানাডার সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদারের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই দেশের ভেতরে বাড়ছে উদ্বেগ। গত বছর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সামান্য এক শতাংশের একটু বেশি ছিল। ইস্পাত, গাড়ি ও অ্যালুমিনিয়াম শিল্পে শুল্কের ধাক্কায় হাজার হাজার মানুষ কাজ হারিয়েছে। খাদ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় খাদ্য সহায়তা কেন্দ্রগুলোতে মানুষের ভিড় রেকর্ড ছুঁয়েছে। মন্ত্রিসভার এক বৈঠকের পর এক মন্ত্রীর মন্তব্যে এই বাস্তবতা ধরা পড়ে, মাসের শেষটুকু টিকিয়ে রাখার দুশ্চিন্তার সঙ্গে ভবিষ্যৎ সংকটও একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে।
করছাড় ও চীনের সঙ্গে সমঝোতা
এই চাপ মোকাবেলায় নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য পাঁচ বছরে করছাড়ের ঘোষণা দেন কার্নি। একই সময়ে চীন কানাডার কৃষি পণ্যে শুল্ক কমাতে মনে সম্মত হওয়ায় পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ গুলো স্বস্তি পায়। বিনিময়ে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর কানাডার কঠোর শুল্ক উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো হয়। এতে ভোক্তারা তুলনামূলক সস্তা ও মানসম্মত গাড়ির সুবিধা পেতে পারেন বলে আশা করা হচ্ছে।

বিচ্ছিন্নতার রাজনীতি
দেশটির পূর্ব ও পশ্চিমে বিচ্ছিন্নতাবাদী সুর আবার জোরালো হচ্ছে। কুইবেকে প্রাদেশিক নির্বাচনে বিচ্ছিন্নতাবাদী দল ক্ষমতায় এলে নতুন করে স্বাধীনতা গণভোটের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অতীতে এই প্রদেশ খুব অল্প ব্যবধানে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছিল। পশ্চিমে আলবার্টার ক্ষোভ আরও তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ। তেল ও গ্যাস রপ্তানির অবকাঠামো নিয়ে ফেডারেল বিধিনিষেধে অসন্তোষ জমেছে। যদিও সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, অধিকাংশ আলবার্টা বাসী এখনো কানাডার সঙ্গেই থাকতে চান।
বিনিয়োগ আর ভারসাম্যের লড়াই
আলবার্টার সঙ্গে সমঝোতায় প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে তেল পাইপলাইন দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন কার্নি। তবে পরিবেশগত বিধিনিষেধ নিয়ে বিনিয়োগকারীদের শঙ্কা রয়ে গেছে। এর মধ্যেই উত্তর আমেরিকার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হলে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ টানা কঠিন হয়ে পড়তে পারে। তাই পাশের পরাশক্তির সঙ্গে কোনো না কোনো সমঝোতা খুঁজে বের করাই তার জন্য সবচেয়ে সূক্ষ্ম ভারসাম্যের কাজ।
সংসদীয় অঙ্ক
ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বাড়লেও কার্নির সরকার এখনো সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়। বিরোধী একজন সদস্যকে দলে টানার চেষ্টা চলছে। তা ব্যর্থ হলে জনসমর্থনের জোয়ারে ভর করে আগাম নির্বাচনের পথে হাঁটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















