জানুয়ারি ২০২৬ মাসে পুলিশ ও সেনা হেফাজত এবং কারাগারে মোট ১৯ জনের মৃত্যু দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। পরিবারগুলোর অভিযোগ, আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের সময় নির্যাতনের ফলেই এসব মৃত্যু ঘটেছে। বিপরীতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অসুস্থতা কিংবা স্বাভাবিক মৃত্যুর দাবি করেছে। ক্রমবর্ধমান এই প্রবণতা হেফাজতে নির্যাতন, চিকিৎসা অবহেলা এবং তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রেক্ষাপট
জাতীয় নির্বাচনপূর্ব রাজনৈতিক উত্তেজনার মধ্যে জানুয়ারি মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। একই সময়ে হেফাজতে মৃত্যু ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশন (এমএসএফ) সংগৃহীত তথ্যে দেখা যায়, শুধু জানুয়ারি মাসেই পুলিশ ও সেনা হেফাজতে দুইজন এবং কারাগারে ১৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে। অভিযানে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত হয়েছে।
পুলিশ ও সেনা হেফাজতে মৃত্যু
জানুয়ারিতে দুটি ঘটনায় পুলিশ ও সেনা হেফাজতে মধ্যবয়সী দুই ব্যক্তির মৃত্যু ঘটে। রংপুরে এক ট্রাকচালককে সাদা পোশাকে আটক করার পর অল্প সময়ের মধ্যে হাসপাতালে মৃত্যুর খবর দেওয়া হয়। পরিবারের ভাষ্য, আটক অবস্থায় নির্যাতনের চিহ্ন ছিল। অন্যদিকে চুয়াডাঙ্গায় এক রাজনৈতিক নেতাকে সেনা সদস্যরা আটক করার পর জিজ্ঞাসাবাদের সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়। পরিবার দাবি করেছে, নির্যাতনের ফলেই তাঁর মৃত্যু হয়েছে। সংশ্লিষ্ট বাহিনী উভয় ক্ষেত্রেই অসুস্থতাজনিত মৃত্যুর কথা জানিয়েছে।
নির্যাতনে মৃত্যুর অভিযোগ
জানুয়ারি মাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্যাতনে দুইজনের মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। লক্ষ্মীপুরে এক রাজনৈতিক কর্মীকে গ্রেপ্তারের পর থানায় নির্যাতনের অভিযোগ ওঠে। পরে কারাগারে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁর মৃত্যু হয়। সাতক্ষীরায় টহলরত সেনা সদস্যদের মারধরে এক যুবকের ঘটনাস্থলেই মৃত্যুর অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। এসব ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে।
কারা হেফাজতে মৃত্যু
এমএসএফের তথ্য অনুযায়ী জানুয়ারি মাসে কারা হেফাজতে ১৫ জন বন্দির মৃত্যু হয়েছে, যা আগের মাসের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। নিহতদের মধ্যে চারজন কয়েদি এবং ১১ জন হাজতি। একাধিক ঘটনায় বন্দিরা হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা গেছেন। বিভিন্ন জেলা ও কেন্দ্রীয় কারাগারে এই মৃত্যুগুলো ঘটেছে, যা কারাগারের ভেতরে চিকিৎসা ব্যবস্থার ঘাটতি ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাকে সামনে এনেছে।
কারাগারে নির্যাতনের অভিযোগ
মেহেরপুর কারাগারে এক কয়েদিকে চোখ বেঁধে একাধিক দফায় মারধরের অভিযোগ উঠেছে। সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের বক্তব্য অনুযায়ী, নির্যাতনের পরও যথাযথ চিকিৎসা দেওয়া হয়নি। কারাগারে শারীরিক নির্যাতনের কোনো আইনি বৈধতা না থাকলেও এমন অভিযোগগুলো কারা ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুতর প্রশ্ন তুলছে।
মানবিকতার সংকটের উদাহরণ
কারা হেফাজতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি ঘটনায় এক বন্দির স্ত্রী ও শিশুপুত্রের মৃত্যুর পর মানবিক কারণে কারাফটকে শেষবারের মতো দেখার সুযোগ দেওয়া হয়। প্যারোলে মুক্তির অনুমোদন না থাকায় কারাফটকেই সেই বিদায় সম্পন্ন হয়, যা কারাবন্দিদের পরিবারগুলোর মানবিক দুর্ভোগের চিত্র তুলে ধরে।
প্রশ্নবিদ্ধ জবাবদিহি
হেফাজতে মৃত্যু ও নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের অভাব বারবার উঠে আসছে। পরিবারগুলোর অভিযোগ সত্ত্বেও অনেক ঘটনায় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন বা তদন্ত অগ্রগতির তথ্য জনসমক্ষে আসেনি। এতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও দৃঢ় হচ্ছে বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা।
সার্বিক মূল্যায়ন
জানুয়ারি ২০২৬ মাসে পুলিশ, সেনা ও কারা হেফাজতে মৃত্যুর সংখ্যা ও অভিযোগ দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতিকে গভীর সংকটে ফেলেছে। আটক অবস্থায় নিরাপত্তা, চিকিৎসা সুবিধা এবং জিজ্ঞাসাবাদের পদ্ধতি নিয়ে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
এমএসএফের দাবি
এমএসএফের মতে, প্রতিটি হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনায় দ্রুত, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে। দোষীদের আইনের আওতায় আনা, হেফাজতে নির্যাতন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া এবং কারাগারে চিকিৎসা ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় হেফাজতে মৃত্যু নাগরিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতার প্রতীক হয়ে থাকবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















