১১:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬
চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রে শুদ্ধি অভিযান বিশ্ব রাজনীতির নতুন অস্থির সংকেত বিশ্বচাপের যুগে কানাডার কঠিন পরীক্ষায়, মার্ক কার্নির সামনে টিকে থাকার রাজনীতি সংখ্যালঘু ও মব সহিংসতা: জানুয়ারি ২০২৬-এ আতঙ্ক, ভাঙচুর আর বিচারহীনতার ছায়া জানুয়ারিতে হেফাজতে ও কারাগারে ১৯ প্রাণহানি খসড়া মিডিয়া অধ্যাদেশকে ‘স্বাধীন গণমাধ্যমের উপহাস’ বলে আখ্যা দিল টিআইবি বিশ্বকাপ অনিশ্চয়তায় জার্সি উন্মোচন স্থগিত করল পিসিবি কোটা বাতিলের দাবিতে গাজীপুরে রেললাইন ও সড়ক অবরোধ করলেন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরা নির্বাচনের ফল ঘোষণায় ১২ ঘণ্টার বেশি দেরি মানেই অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত: মির্জা আব্বাস শিরোনাম: ৫৪ বছর ধরে বাংলাদেশ লুটপাটের শিকার, এবার নির্বাচনে জামায়াতকে সুযোগ দেওয়ার আহ্বান: মিয়া গোলাম পরওয়ার চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি ইজারা পরিকল্পনার প্রতিবাদে অচল কার্যক্রম

সংখ্যালঘু ও মব সহিংসতা: জানুয়ারি ২০২৬-এ আতঙ্ক, ভাঙচুর আর বিচারহীনতার ছায়া

জানুয়ারি ২০২৬ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা এবং ক্রমবর্ধমান গণপিটুনি বা মব সহিংসতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিত হামলা, ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং সন্দেহভাজন অপরাধের অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বেড়ে যায়। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাবোধ, পাশাপাশি ভেঙে পড়ছে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও ভাঙচুর
জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একাধিক সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যায়। মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর, চুরি, দানবাক্স লুট এবং পূজার সামগ্রী নষ্ট করার মতো ঘটনা শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতেই আঘাত করেনি, বরং সংখ্যালঘুদের দৈনন্দিন নিরাপত্তাকে গুরুতর হুমকির মুখে ফেলেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে একটি ইসকন মন্দির থেকে একাধিক প্রতিমা ও দানবাক্স চুরির ঘটনা ঘটে। খুলনা ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা ভাঙচুরের পাশাপাশি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে হিন্দু পাড়ায় একাধিক স্থানে মন্দির ও বসতবাড়ির পাশে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় শতবর্ষ পুরোনো কালীমন্দির, শীতলামন্দির ও দোলমন্দিরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।

কিছু ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হওয়ায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এর ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ওপর অনাস্থা আরও গভীর হচ্ছে।

সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড
এই মাসে কয়েকটি ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা সরাসরি প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছেন। নরসিংদীর পলাশে মুদি ব্যবসায়ী মনি চক্রবর্তীকে দুর্বৃত্তরা অতর্কিতে হত্যা করে। নরসিংদীতে একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে ঘুমন্ত অবস্থায় চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিককে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। যশোরের মনিরামপুরে বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।

নির্বাচনের আগে এ ধরনের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি করেছে যে, এসব হামলার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।

গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিস্তার
জানুয়ারি ২০২৬ মাসে গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঘটনা ভয়াবহ মাত্রা নেয়। বিভিন্ন স্থানে সন্দেহভাজন চোর, ছিনতাইকারী কিংবা কথিত অপরাধের অভিযোগে মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই মাসে অন্তত ২৯টি গণপিটুনির ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ২৬ জন গুরুতর আহত হন। আহতদের একটি অংশকে পরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

গণপিটুনিতে নিহতদের মধ্যে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, পরকীয়া, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি কিংবা বাকবিতণ্ডার অভিযোগ ছিল। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগের কোনো আইনি যাচাই হয়নি। ফলে অপরাধ প্রমাণের আগেই মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যা সরাসরি আইনের শাসনের পরিপন্থী।

আইনের শাসন ও সামাজিক সংকট
গণপিটুনি ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয় যে, সমাজের একটি অংশ ক্রমেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। অপরদিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এতে শুধু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে না, বরং সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি আরও গভীরভাবে প্রোথিত হচ্ছে।

বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠী এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে। বিচারহীনতা ও ধীরগতির আইনি প্রক্রিয়া অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

জানুয়ারি ২০২৬ মাসের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং মব সহিংসতা এখন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। অন্যথায় ভয়, আতঙ্ক ও সহিংসতার এই চক্র আরও বিস্তৃত হবে, যা সমাজ ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই অশনিসংকেত।

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের ক্ষমতার কেন্দ্রে শুদ্ধি অভিযান বিশ্ব রাজনীতির নতুন অস্থির সংকেত

সংখ্যালঘু ও মব সহিংসতা: জানুয়ারি ২০২৬-এ আতঙ্ক, ভাঙচুর আর বিচারহীনতার ছায়া

০৯:২০:৩৫ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ জানুয়ারী ২০২৬

জানুয়ারি ২০২৬ মাসে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম উদ্বেগজনক দিক ছিল সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সহিংসতা এবং ক্রমবর্ধমান গণপিটুনি বা মব সহিংসতা। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলার দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় পরিকল্পিত হামলা, ধর্মীয় স্থাপনায় ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং সন্দেহভাজন অপরাধের অভিযোগে মানুষকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনা বেড়ে যায়। এসব ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তাবোধ, পাশাপাশি ভেঙে পড়ছে আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা।

হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা ও ভাঙচুর
জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে একাধিক সহিংস ঘটনার খবর পাওয়া যায়। মন্দিরে প্রতিমা ভাঙচুর, চুরি, দানবাক্স লুট এবং পূজার সামগ্রী নষ্ট করার মতো ঘটনা শুধু ধর্মীয় অনুভূতিতেই আঘাত করেনি, বরং সংখ্যালঘুদের দৈনন্দিন নিরাপত্তাকে গুরুতর হুমকির মুখে ফেলেছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে একটি ইসকন মন্দির থেকে একাধিক প্রতিমা ও দানবাক্স চুরির ঘটনা ঘটে। খুলনা ও টাঙ্গাইলের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিমা ভাঙচুরের পাশাপাশি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে হিন্দু পাড়ায় একাধিক স্থানে মন্দির ও বসতবাড়ির পাশে অগ্নিসংযোগ করা হয়। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় শতবর্ষ পুরোনো কালীমন্দির, শীতলামন্দির ও দোলমন্দিরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়। এসব ঘটনায় স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেক পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।

কিছু ঘটনায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করা হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিচার প্রক্রিয়া দৃশ্যমান না হওয়ায় একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এর ফলে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষোভ, অসন্তোষ এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ওপর অনাস্থা আরও গভীর হচ্ছে।

সংখ্যালঘুদের লক্ষ্য করে হত্যাকাণ্ড
এই মাসে কয়েকটি ঘটনায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যরা সরাসরি প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছেন। নরসিংদীর পলাশে মুদি ব্যবসায়ী মনি চক্রবর্তীকে দুর্বৃত্তরা অতর্কিতে হত্যা করে। নরসিংদীতে একটি গাড়ির ওয়ার্কশপে ঘুমন্ত অবস্থায় চঞ্চল চন্দ্র ভৌমিককে পুড়িয়ে হত্যার অভিযোগ ওঠে। যশোরের মনিরামপুরে বরফকল ব্যবসায়ী রানা প্রতাপ বৈরাগীকে ডেকে নিয়ে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়।

নির্বাচনের আগে এ ধরনের ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি করেছে যে, এসব হামলার মাধ্যমে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির চেষ্টা চলছে।

গণপিটুনি ও মব সহিংসতার বিস্তার
জানুয়ারি ২০২৬ মাসে গণপিটুনি বা মব সহিংসতার ঘটনা ভয়াবহ মাত্রা নেয়। বিভিন্ন স্থানে সন্দেহভাজন চোর, ছিনতাইকারী কিংবা কথিত অপরাধের অভিযোগে মানুষকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। এই মাসে অন্তত ২৯টি গণপিটুনির ঘটনায় ২১ জন নিহত এবং ২৬ জন গুরুতর আহত হন। আহতদের একটি অংশকে পরে পুলিশে সোপর্দ করা হয়।

গণপিটুনিতে নিহতদের মধ্যে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, পরকীয়া, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি কিংবা বাকবিতণ্ডার অভিযোগ ছিল। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব অভিযোগের কোনো আইনি যাচাই হয়নি। ফলে অপরাধ প্রমাণের আগেই মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যা সরাসরি আইনের শাসনের পরিপন্থী।

আইনের শাসন ও সামাজিক সংকট
গণপিটুনি ও সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনাগুলো দেখিয়ে দেয় যে, সমাজের একটি অংশ ক্রমেই আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। অপরদিকে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না থাকায় এই প্রবণতা দিন দিন বাড়ছে। এতে শুধু নিরীহ মানুষের প্রাণহানি ঘটছে না, বরং সমাজে সহিংসতার সংস্কৃতি আরও গভীরভাবে প্রোথিত হচ্ছে।

বিশেষ করে সংখ্যালঘু ও দুর্বল জনগোষ্ঠী এই সহিংসতার সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে। বিচারহীনতা ও ধীরগতির আইনি প্রক্রিয়া অপরাধীদের আরও সাহসী করে তুলছে।

জানুয়ারি ২০২৬ মাসের অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা এবং মব সহিংসতা এখন বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এসব ঘটনার বিরুদ্ধে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং সংখ্যালঘুদের সুরক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। অন্যথায় ভয়, আতঙ্ক ও সহিংসতার এই চক্র আরও বিস্তৃত হবে, যা সমাজ ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই অশনিসংকেত।