দেশের সবচেয়ে বড় সাহিত্য উৎসব অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ নির্ধারিত সময়েই শুরু হচ্ছে। তবে রমজান মাসে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্তকে ঘিরে মূলধারার বিপুল সংখ্যক প্রকাশকের আপত্তি ও বয়কটের হুমকি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। প্রকাশকদের একাংশের আশঙ্কা, রমজানে মেলা হলে শিল্পখাতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হতে পারে।

মেলা শুরু ২০ ফেব্রুয়ারি, প্রস্তুতি শেষ পর্যায়ে
বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, অমর একুশে বইমেলা ২০২৬ আগামী ২০ ফেব্রুয়ারি শুরু হবে। এরই মধ্যে ৩০০-এর বেশি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান সময়সূচি পুনর্বিবেচনা না করলে মেলা বয়কটের ঘোষণা দিয়েছে।
মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব ড. মো. সেলিম রেজা ইউএনবিকে জানান, প্রস্তুতির কাজ জোরেশোরে চলছে। মঙ্গলবার রাতে স্টল ও প্যাভিলিয়ন বরাদ্দের লটারি সম্পন্ন হয়েছে এবং বরাদ্দ চূড়ান্ত করা হয়েছে। এখন প্রকাশকরা নিজেদের নির্ধারিত জায়গা প্রস্তুত করতে পারবেন।
স্টল ও প্যাভিলিয়নের বরাদ্দ নিশ্চিত করতে বাংলা একাডেমি আগেই অর্থ পরিশোধের সময়সীমা ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে বাড়িয়ে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করেছিল।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর মোট ৬৬২টি স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা ২০২৫ সালের তুলনায় ১৩৩টি বেশি। এর মধ্যে ২৪টি নতুন প্রকাশনা সংস্থা স্টল পেয়েছে। মোট প্যাভিলিয়ন ২৩টি—এর মধ্যে ১১টি প্রতিষ্ঠিত এবং ১২টি নতুন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছে।

রমজানে মেলা নিয়ে প্রকাশকদের আপত্তি
তবে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৩ দিনব্যাপী এই মেলা রমজান মাসে আয়োজনের সিদ্ধান্তে প্রকাশকদের বড় অংশের তীব্র আপত্তি দেখা দিয়েছে।
অন্যপ্রকাশের মজহারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, অন্তত ৩২১টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান রমজানের পর মেলা আয়োজনের দাবি জানিয়েছে। সময়সূচি পরিবর্তন না হলে তারা মেলায় অংশ নেবে না বলেও জানিয়েছে।
কয়েকজন প্রকাশক জানান, তারা আগেভাগেই উদ্বেগের কথা জানালেও কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া মেলেনি।
তাদের যুক্তি, রমজান মাসে কর্মঘণ্টা কমে যায় এবং দিনের বেলায় ক্রেতাদের উপস্থিতি ও ব্যয় কম থাকে। এতে বই বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে অংশ নিলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে বলে তারা আশঙ্কা করছেন।

তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা
পরিস্থিতি আরও তীব্র হলে প্রকাশকদের সংগঠন ‘প্রকাশক ঐক্য’ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের চেয়ারম্যান ও সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে খোলা চিঠি পাঠায়।
চিঠিতে বলা হয়, প্রায় ৯০ শতাংশ প্রকাশক মনে করেন রমজানে মেলায় অংশ নেওয়া বাণিজ্যিক আত্মহত্যার শামিল হবে। ইতিমধ্যে ৩০০-এর বেশি মূলধারার প্রকাশক অংশ নিতে অপারগতার কথা জানিয়েছেন।
প্রকাশকরা উল্লেখ করেন, গত দেড় বছর ধরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতায় প্রকাশনা খাত চাপে রয়েছে। কাগজের দাম বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
তারা আরও জানান, গত দুই মাস ধরে নির্বাচনকেন্দ্রিক কাজের চাপে ছাপাখানাগুলো ব্যস্ত থাকায় নতুন বই প্রকাশ কার্যত বন্ধ ছিল। এই প্রেক্ষাপটে বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও বাংলা একাডেমি কেন নির্ধারিত সময়ে মেলা আয়োজনের সিদ্ধান্তে অনড়—সেই প্রশ্নও তোলা হয়েছে।

রমজানের পর আয়োজনের প্রস্তাব
প্রকাশকরা স্পষ্ট করেছেন, তারা বইমেলার বিরোধিতা করছেন না। বরং অমর একুশের চেতনাকে ধারণ করে একটি সফল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক মেলা চান।
রমজান ও নির্বাচন-পরবর্তী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে তারা ঈদের পর মেলা আয়োজনের প্রস্তাব দিয়েছেন।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের কাছে তারা দুটি দাবি তুলে ধরেছেন—প্রথমত, ২০ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত মেলা স্থগিত করা; দ্বিতীয়ত, ঈদের পর উৎসবমুখর ও পূর্ণাঙ্গ আয়োজনে মেলা অনুষ্ঠিত করা।
তাদের আশা, ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিলে প্রকাশনা শিল্প বড় ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পাবে এবং ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবিজড়িত অমর একুশে বইমেলার ঐতিহ্য অক্ষুণ্ণ থাকবে।
তবে আপাতত নির্ধারিত সময়েই মেলা আয়োজনের প্রস্তুতি এগিয়ে চলেছে। ফলে ঐতিহ্য ধরে রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ আয়োজক এবং আর্থিক বাস্তবতা নিয়ে শঙ্কিত প্রকাশকদের মধ্যে টানাপোড়েনের আভাস স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















